চাপে পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী|151443|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ জুন, ২০১৯ ০৮:৫১
টেলিযোগাযোগ খাতের কর বৃদ্ধি
চাপে পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
নিজস্ব প্রতিবেদক

চাপে পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সেবায় কর বাড়ানোর কারণে মোবাইল ফোন কেনা ও ব্যবহারে মানুষের ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেবে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে পড়বে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। মোবাইল ফোন অপারেটরদের মুনাফাও কমবে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সেবায় কর বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মোবাইল ফোন খাত সংশ্লিষ্টরা।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মুঠোফোন সেবায় সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন। এতে একজন মানুষ ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ২২ টাকা ব্যয় হবে করের পেছনে। এ ছাড়া সিম ট্যাক্স ১০০ টাকা বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্মার্টফোন আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা আগে ১০ শতাংশ ছিল। এ ছাড়া মোবাইল ফোন অপারেটরের ন্যূনতম কর শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হয়। টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন সেবায় কর বাড়ানোর কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চাপের মধ্যে পড়বে। করের বোঝা চাপিয়ে টেলিকম খাতের প্রবৃদ্ধি আটকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজেটে টেলিযোগাযোগ খাতে প্রভাব নিয়ে এ খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক (টিআরএনবি) গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে  টেলিকম খাতের বাস্তবতা শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মেফতাহ উদ্দিন খান, রবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবির, গ্রামীণফোনের রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক হোসেন সাদাত, বাংলালিংকের কর বিভাগের প্রধান সারোয়ার হোসেনসহ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মোবাইল ফোন সেবার ওপর কর আরোপ করা হলে তা সব শ্রেণির মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, ‘সরকারের লোকজন দাবি করে দেশের ফকিরেরাও এখন মুঠোফোন ব্যবহার করে। তাহলে ফকিরের ওপর এত কর কেন আরোপ করা হচ্ছে? এটা কি প্রান্তিক মানুষকে মুঠোফোন ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য?’

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একদিকে আপনারা মুঠোফোন সেবাকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলছেন। অন্যদিকে চড়া হারে কর আরোপ করে তারা যাতে ব্যবহার না করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করছেন। এটা প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা।’ তিনি বলেন, মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম নয় যে তারা জনসেবা করবে। তারা সব করের চাপ মানুষের ওপর চাপাবে।

বাংলালিংকের সারোয়ার হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে আয়করের ওপর জোর দিয়ে শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাটের ওপর চাপ কমানো হচ্ছে। কারণ শুল্ক ও ভ্যাটের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ পড়ে। রাজস্ব বাড়াতে সরকারের উচিত আয়করের দিকে জোর দেওয়া।

রবির মাহতাব উদ্দিন বলেন, টেলিকম খাতের আয়ের ৫০ শতাংশ সরকারের কোষাগারে চলে যায়। এভাবে টিকে থাকা কঠিন। মুঠোফোন সেবার ওপর যে হারে কর আরোপ করা হচ্ছে, তা তামাকজাত পণ্যের মতো হয়ে যাচ্ছে। এটা কি তামাকের মতো ক্ষতিকর?

এনবিআর সদস্য মেফতাহ উদ্দিন খান বলেন, বাজেট শুধু এনবিআর একা করে না। শুরুতে একটি প্রস্তাব তৈরির পর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়। অর্থমন্ত্রীর পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সবকিছু চূড়ান্ত হয়। তিনি বলেন, সিম কর বাড়ানোয় আসল ক্রেতাদের ওপর প্রভাব পড়বে না। একটা দরকার হলেও এখন অনেক মানুষের কাছে ৫-৬টা সিম থাকে। তিনি বলেন, ‘স্মার্টফোনের একটা সামাজিক কুফল দেখা যাচ্ছে। আমার অফিসে দেখি সহকারীরা ফেসবুক, ইউটিউব নিয়ে পড়ে থাকে।’ তিনি প্রশ্ন করেন, এত বেশি স্মার্টফোন কি দরকার আছে? তার মতে, টেলিঘনত্ব বাড়াতে এত বেশি স্মার্টফোনের দরকার নেই, ফিচার ফোনেও তা সম্ভব। তিনি বলেন, সব নীতিমালা ভালো ফল দেবে, তা আশা করা যায় না। আয়কর বাড়াতে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যালয় খোলার পদক্ষেপের কথা জানান এনবিআরের এই সদস্য।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, টেলিটকের মতো প্রতিষ্ঠানকে আমরা রেখেছি বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য। সরকারের কিছু কাজ টেলিটক করে থাকে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হলেও এ প্রতিষ্ঠানকেও কর ও ভ্যাট দিতে হবে। না হলে সরকার চালানো যাবে না।

গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত বলেন, এই খাতের মধ্যে আমরাই প্রথম পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছি। এজন্য করপোরেট ট্যাক্সের ওপর ১০ শতাংশ কর রেয়াত দেওয়া হয়। কিন্তু পুঁজিবাজারে যাওয়ার তিন বছরের মাথায় কর রেয়াত ৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে অন্য কোম্পানি পুঁজিবাজারে যেতে নিরুৎসাহিত হবে।

টি আই এম নুরুল কবির বলেন, একদিকে সরকার সবাইকে টেলিযোগাযোগ সেবার আওতায় আনার কথা বলছে, অন্যদিকে উচ্চহারে কর আরোপ করা হচ্ছে। সরকারে কি দুই ধরনের নীতি প্রণেতা আছেন? তিনি বলেন, মোবাইল ফোন সেবায় সম্পূরক শুল্ক পৃথিবীর কোথাও নেই। এটা কীভাবে আরোপ করা হলো, তার তদন্ত হওয়া উচিত।