চাঁদা দিতে দিতে যায় শ্রমিকের দিন|154291|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০
চাঁদা দিতে দিতে যায় শ্রমিকের দিন
আশরাফুজ্জামান মণ্ডল

চাঁদা দিতে দিতে যায় শ্রমিকের দিন

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার ইব্রাহিম হোসেন ৬ মাস ধরে ইজিবাইক চালান রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের সেকশন থেকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ স্ট্যান্ড পর্যন্ত। দৈনিক ১৪ ঘণ্টার বেশি পরিশ্রম করেন তিনি। এতে আয় হয় ১২শ থেকে ১৫শ টাকা পর্যন্ত। হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে যখন ঘরে ফেরেন তখন দেখেন আয়ের প্রায় পুরোটাই চলে গেছে অন্যের পকেটে। গভীর রাতে একরাশ হতাশাই যেন ভর করে ইব্রাহিমের চোখে-মুখে। এদিকে এখনো দুই মাসের বাসা ভাড়া বাকি পড়ে আছে তার।

রাজধানীর প্রায় দুই হাজার ইজিবাইক চালকের জীবনের গল্প ইব্রাহিমের জীবনের মতোই। কামরাঙ্গীরচরের সেকশন থেকে লালবাগ, খোলামোড়া, মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেটÑ এই চার রুটে তারা ইজিবাইক চালান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনুমোদন না থাকায় অবৈধভাবে প্রশাসন ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এগুলো সড়কে চলছে। ফলে চালকদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় বিভিন্ন স্তরের চাঁদায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেকশন থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ভাড়া ১৫ টাকা। এটি নির্ধারণ করে দিয়েছে ইজিবাইক মালিক-শ্রমিক কমিটি নামে একটি সংগঠন। কমিটির ভাড়ার তালিকা প্রতিটি বাইকের সামনে লাগানো রয়েছে। এ ছাড়া সংগঠনের নেতাদের ফোন নম্বরও স্টিকার করে লাগানো হয়েছে বাইকের ওপর। রুটের দুই প্রান্তে এ কমিটির আলাদা দুটি সিন্ডিকেট রয়েছে। দিনে এ দুই সিন্ডিকেটকে ৪০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। সাপ্তাহিক চাঁদা আরও ৬০০। চালকদের শতকরা প্রায় ৯০ জনের নিজস্ব ইজিবাইক নেই। ফলে দৈনিক ৫০০ টাকা ভাড়া বাবদ চলে যায় মালিকের পকেটে। দৈনিক বৈদ্যুতিক বিল বাবদ গ্যারেজমালিক পান ২০০ টাকা। এতসব দেওয়ার পর হাতে যা অবশিষ্ট থাকে তাও চলে যায় আনসার ও অন্যদের পকেটে।  চালকরা জানান, এর বাইরে প্রতি সপ্তাহে এক দিন বিআরটিএর মোবাইল কোর্ট বসে। সেখানে ধরা পড়লে রেকার বিল ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে পরিত্রাণ পেতে হয়। পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিন পুলিশ ৮ থেকে ১০টি ইজিবাইক ধরে থানায় নিয়ে যায়। তখন জরিমানা দিয়ে বাইক মুক্ত করতে হয়। এ ছাড়া ইজিবাইক নষ্ট হলে এর খরচও বহন করতে হয় চালকদের। তারা বলছেন, সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও ২০০ টাকার বেশি ঘরে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে জীবন চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।

জাবেদ হাওলাদার নামে একজন চালক বলেন, ‘বাপুরে আমাদের পারশিমন নাই, হেইডা কইয়া হয়রানিতে জানটা শ্যাষ কইরয়া দিল। পুলিশ, লাইনম্যান, আনসার সবাই পিডায়। আমগো কোনো মা ও বাপ নাই!’ মকবুল হোসেন নামে আরেকজন বলেন, ‘কখন পুলিশ ধরবো, কখন মোবাইল কোর্ট বসবোÑ তার ঠিকঠিকানা নাই। যতক্ষণ অটো চালাই ভয়ে কলিজা শুকায় যায়। ধরলেই কাম শ্যাষ। ওইদিন বউবাচ্চার উপোস!’ জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর স্ট্যান্ডের লাইনম্যান শেখ টুটুল চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইজিবাইক অবৈধ, ওপরে অনেক লোকরে ম্যানেজ করতে হয়। এজন্য টাকা না নিয়ে উপায় থাকে না।’ লালবাগ জোনের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. আতিক বলেন, ‘প্রতিদিন ধরি, বউবাচ্চা নিয়ে আসে, কান্নাকাটি করে। জরিমানা করে ছেড়ে দেই। এর সাথে শক্তিশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট জড়িত।’  বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহমুদ-ই-রাব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে যত ইজিবাইক চলছে তার একটাও বৈধ নয়। আমরা এগুলোর অনুমোদন দেই না। যারা সরাসরি আইন প্রয়োগের দায়িত্বে সেই পুলিশ চাইলে চাঁদাবাজি, অবৈধ যানবাহন সবকিছু বন্ধ করা সম্ভব। আমাদের যে লোকবল তাতে সপ্তাহে এক দিন অভিযান পরিচালনা করাই দুষ্কর।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘সড়কে কত পরিবহন চলবে, ক্যাপাসিটি কী এসব দেখে রুট পারমিট দেওয়ার দায়িত্ব বিআরটিএর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সিটি করপোরেশনসহ আরও অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কিছু কিছু পরিবহনের লাইসেন্স দেয়। যার বড় অংশই হয় বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক উপায়ে।’ তিনি বলেন, ‘যথাযথ রেগুলেটরি অথরিটি এ কাজের দায়িত্বে থাকলে সড়কে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও গরিব মানুষের হয়রানি কমে যাবে। একই সঙ্গে যোগাযোগ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।’