জীবন কাটে গরিবের সেবায়|159162|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
জীবন কাটে গরিবের সেবায়
নিজস্ব প্রতিবেদক

জীবন কাটে গরিবের সেবায়

জাকাতের টাকায় সাড়ে চারশ গরিব পরিবারকে ‘সক্ষম প্রকল্প’র মাধ্যমে স্বাবলম্বী করেছে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন। তাদের আছে তিনটি স্কুল। দুটি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চলে। একটি নৌকা অ্যাম্বুলেন্স করছেন। লিখেছেন সাকিব হাসান ও তানভীর সিদ্দিক টিপু

২০১০ সাল আহমেদ ইমতিয়াজ জামি পড়েন ঢাকার বিখ্যাত সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের কলেজ শাখায়। ক্লাস শেষে একদিন বাসে বাসায় ফিরছেন। এতটুকু জায়গা নেই শেষ বিকেলের লোকাল বাসটিতে। ঘামে, মানুষের গা ঘেঁষাঘেঁষিতে পাশ ফেরা দায়। এর মধ্যেই ছয়-সাত বছরের একটি ছোট্ট শিশু উঠল। ওর বগলে অনেকগুলো খবরের কাগজ। বাসে মানুষের গায়ের ফাঁকে এগিয়ে চলছে খুব কষ্টে। পা, সিটের কোনা ধরে এগুচ্ছে ও বলছে, ‘স্যার একটি পত্রিকা নেবেন?’ ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট হলো জামির। অভাব এত জেঁকে বসেছে যে একটি হলেও হাতের খবরের কাগজ বিক্রি করতে চায় সে। না এগুতে বললেও শোনে না। পরে নেমে পড়ল মিরপুর ১২ নম্বরে। তার পেছন পেছন নামলেন তিনিও। পড়া ফেলে মিষ্টি শিশুটি কেন পত্রিকা বিক্রিতে নেমেছেÑ জানতে খুব মন চাইছে। পেছন পেছন হাঁটলেন। দেখলেন, চায়ের এক টং দোকানে হাতের পত্রিকা ও হাফপ্যান্টের পকেট থেকে খুচরো কিছু টাকা দিল। কথা শেষে হেঁটে সামনের রাস্তা ধরে চলে গেল। পরে বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে সেই দোকানে গেলেন তিনি। বয়স্ক লোকটির সঙ্গে কথা বলে জানলেন, ছেলেটি তার সন্তান, নাম ‘রাসেল’। ছোট্ট সেই চায়ের দোকানের সামান্য বিক্রিতে তাদের সংসার চলেই না। তাই বই, খাতা-স্কুল না করে ছেলেকে খবরের কাগজ বিক্রিতে পাঠিয়েছেন বাবা। জামি ও তার বন্ধু ইফতি আহমেদ রায়হান, জামিল আযহার শাকিল, মিনহাজ আহমেদ মিঠুর ছেলেটির জন্য মন কেঁদে উঠল। তারা বাড়িতে ফিরে, মা-বাবাকে জানিয়ে আড়াই হাজার টাকা জোগাড় করলেন। টাকা তুলে দিলেন শিশুটির বাবার হাতে। এই টাকায় দোকানে মাল তুলুন, ভালোভাবে ব্যবসা করুন, রাসেলকে স্কুলে পাঠান। তাকে শিশুশ্রমে আর বাধ্য করবেন নাÑ বলে ফিরে এলেন। পরে এলাকার মাজেদুল হক মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলো রাসেল। তাদের নতুন স্বপ্ন শুরু হলো। এক সপ্তাহেই এই কটি টাকায় পরিবার চালাতে সক্ষম হয়ে গেলেন বাবা। নিজেদের টাকায় এক পরিবারকে সক্ষম করে অবাক হয়ে গেলেন জামি ও তার তিন বন্ধু। ফলে তাদের অসামান্য উদ্যোগটি শুরু হলো। পরে সেটি ছড়িয়ে গেল বাংলাদেশের সাত জেলায়। সেখান থেকেই জন্ম দিয়েছে তাদের স্বেচ্ছাসেবার সংগঠন ‘অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন’, জন্মেছে ফাউন্ডেশনের স্বপ্নের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট সক্ষম’।

জামিসহ শিক্ষিত, খবর রাখা মানুষরা জানেন এ দেশের সাড়ে ১৬ কোটির চারভাগ মানে সাড়ে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। তাদের ২ কোটি একেবারে গরিব, মাসিক আয় ১৬শ টাকারও কম। মুসলমানদের এই দেশে ফরজ ইবাদত ‘যাকাত’ আদায় করেন সব গরিব-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। প্রতি রোজার ঈদে সামর্থ্যবানরা তাদের সম্পদের ২.৫ শতাংশ যাকাত দান করেন। সেই টাকার পরিমাণ অনেক! যাকাতের দান শাড়ি, লুঙ্গি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক গরিব পায়ের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। এই যাকাতের টাকা গরিবদের সক্ষম করতে পারে, চিরকালের জন্য তাদের অভাব সহজেই দূর করতে পারে এই ভেবে ২০১৬ সাল থেকে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন ইন্টারনেটে, ফেইসবুকে, যোগাযোগে ও মানুষের কাছে চেয়ে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে খুঁজে যাকাতের টাকায় গরিবদের জন্য বিজনেস মডেল তৈরি করে জীবিকা প্রকল্প চালু করেছে। তাদের মাধ্যমে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের এই পর্যন্ত ঢাকা, বরিশাল, গাজীপুর, রংপুর, খাগড়াছড়ি, কুষ্টিয়া, লালমনিরহাটের বুড়িমারী এই সাত জেলায় সাড়ে ৪শ পরিবারকে নানা ধরনের জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। সেলাই মেশিন, রিকশা, পাওয়ার টিলারসহ যে পরিবারের যা প্রয়োজন তারা দিয়েছেন। প্রতিটি পরিবারের জীবিকার এই ব্যবস্থাকে তারা দেখেন একটি প্রকল্প হিসেবে। যাচাই-বাছাই, সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তারা প্রকল্প হস্তান্তর করেন। এরপর তারা প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি, ঠিক ব্যবস্থাপনা বা ভালোভাবে সেটি চলছে কি না, অসুবিধা হচ্ছে কি না, ফলাফলও নজরে রাখেন। আলাদা করে বোঝার ও বিশ্লেষণের জন্য তাদের সক্ষম কার্ড দেন। তাদের খবর নিয়মিত কম্পিউটারে হালনাগাদ করেন, প্রয়োজনে সাহায্যও করেন। জামি বললেন, ‘আমরা তাদের কয়েকভাবে পরীক্ষা করে প্রকল্প দিই। তাদের ইচ্ছে অনুসারে, যে কাজে তারা ভালো সেই ধরনের কাজের ব্যবস্থা করি। আমরা চাই তিনি একটি স্থায়ী কাজ করে যেন নিজের ভাগ্যকে বদল করতে পারেন।’ সক্ষম প্রকল্পে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের সাফল্যের হার ৯৮ ভাগ! এ বছর রোজা ও কোরবানির ঈদে আরও ৫শ পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে কাজ শুরু করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট ১০ হাজার পরিবারকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবেন। যেকোনো হৃদয়বান, সামর্থ্যবান মানুষকে যাকাতের টাকা দেওয়া ও পরিবারগুলোকে কীভাবে সক্ষম করে তোলা হচ্ছেÑ সেটি তারা দেখতে বলেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে অনুরোধ করেন। সে জন্য তাদের ফোন নম্বর আছে ০১৭১১১০০১৮৮।

সক্ষমের গল্পগুলো অসাধারণ। ঢাকার ধানমন্ডির গরিব মানুষ আলতাফ বেপারি। অভিযাত্রিক তাকে তাদের লোগো কমলা রঙের রিকশা কিনে দিয়েছে। ভালো আছেন তিনি, ভাড়ায় আর রিকশা চালাতে হয় না। রংপুরের কেরানিপাড়ার আনোয়ার হোসেনও আগে ভাড়াটে রিকশাচালক ছিলেন। গরিব সেই এলাকায় কত-ই বা আয়? মহাজনের জমা ছিল রোজ ১শ টাকা। দিন চলত টেনে, মাসে সঞ্চয়ই ছিল না। ২০১৭ সালের ২৪ জুন তাকে নতুন রিকশা দিয়ে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন বলেছে আপনার জীবন উন্নত করুন। তিনি খুব ভালো আছেন। ঢাকার মিরপুরে সোনিয়া বেগমের জীবনও বদলেছেন তারা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কোর্সে সেলাই ও নানা ধরনের ডিজাইন শিখেছিলেন গরিব এই নারী। ২০ জনের মধ্যে প্রথম হয়েছেন। তবে টাকার অভাবে শেখা তার কাজে লাগছিল না। পরে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন অভিযাত্রিকের বন্ধুরা। এখন অর্ডার নিয়ে নিজেই পোশাক সেলাই করেন, ভালো আছেন। আশরাফুল ইসলাম সক্ষম ‘১২৪’ নম্বর কার্ডধারী। কুষ্টিয়া শহরে খুব ভালো মানের ফুচকা গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ান; ফুচকা, চটপটি বিক্রি করেন। আগে তার ছোট ফুচকা ভ্যানগাড়ি ছিল। সেটির বদলে তাকে নতুন, বড় ও ভালো গাড়িটি দেওয়া হয়েছে। তিনি বাড়িতে বানানো ফুচকা, চটপটি, ছোলা ইত্যাদি ভ্যানগাড়িতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছেন। দিনে এখন তার হাজার টাকা আয়। আগে দিন চালাতেই কষ্ট হতো। টাকা জমাচ্ছেন, নতুন কিছু করছেনও। এই জেলারই আরেকজন হান্নান আলী। ‘সক্ষম ১২১’ নম্বর কার্ডধারী। ২০১৮ সালে পেয়েছেন পাওয়ার টিলার। আগে অন্যের জমিতে চাষাবাদ করতেন। এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে ২২০ থেকে ২৩০ বিঘা জমি তার পাওয়ার টিলারে জমি চাষ করেছেন। টিলার চালিয়ে ২৫ হাজার টাকায় একটি গরু কিনেছেন। সেটি ভালোভাবে পেলেছেন, এখন ৬০ হাজার টাকা দাম উঠেছে। তিনি প্রিয় পাওয়ার টিলারকে বলেন ‘গাড়ি’। এটি পেয়ে তার ভালো উন্নতি হচ্ছে, জানালেন। তিনিও অন্যদের মতো সক্ষম হয়েছেন। ঢাকার আমিনুল ইসলাম থাকেন মিরপুর-১-এ। ভালো হাতের লেখা, পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ এবং চেষ্টা থাকার পরেও দরিদ্রতায় পড়তে করতে পারেননি। রিকশা চালিয়েই মেয়েকে লেখাপড়ার আলোয় নিয়ে এসেছেন। আগে ভাড়ায় রিকশা চালাতেন, দিনে বড়জোর ৩-৪শ টাকা থাকত। তার পাশে দাঁড়িয়েছে অভিযাত্রিক। তার মেয়ে এখন রাজশাহীতে সরকারি নার্সিং কলেজে পড়েন। মেয়েকে ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন বাবা। পাস করার পর মেয়েকে ঢাকাতে নিজে রিকশা চালিয়ে বাসায় আনার ইচ্ছে তার। অভিযাত্রিকের সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানা মেইলে  [email protected], www. ovizatrik. fundation।

মানুষের জন্য কাজ করেন বলে তাদের স্বেচ্ছাসেবার সংগঠনে কোনো একক ব্যক্তি মালিক নেই, সবাই মিলে তারা। ২০১০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যার জন্ম, তাদের এখন আছেন সারা দেশের ৩২ জেলায় মোট সাড়ে তিন হাজার কর্মী। কেউ কলেজে পড়েন, কেউ স্কুল ছাত্র বা ছাত্রী, কেউবা চাকরি করেন, কারও পেশা ব্যবসা। শুরুতে তারাও অন্যদের মতো নানা ধরনের ছোটখাটো সাহায্যই করেছেন। কয়েকজনে মিলে আত্মীয়, নিজেদের পরিচিত বা কোনো এলাকায় ঘুরে শীতের সময় শীতের কাপড়, কেউ অসুস্থ হয়ে গেছেন খুব, ওষুধ কেনার টাকাও নেই; তার জন্য চাঁদা জোগাড় করে ওষুধ সাহায্য এনেছেন।

এসব কাজ করতে করতে, গরিবের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তারা দেখলেন লেখাপড়ার আলো দিতে না পারলে, গরিবের এই ভবিষ্যৎদের তৈরি করে দিতে সক্ষম না হলে আসলে দেশের, সমাজের ও সেই পরিবারগুলোর কোনো উন্নতি হবে না। তাই ২০১৩ সালে, আজ থেকে সাত বছর আগে, ঢাকার মিরপুরে একটি স্কুলের বিকেলের এক ঘরে শুরু হলো তাদের ‘অভিযাত্রিক স্কুল’। তারও আগে সরকারি নিয়মে ফাউন্ডেশনের নিবন্ধন করতে ভুল হলো না কোনো। স্কুলটি ছিল ‘ফেইম ইন্টারন্যাশনাল’-এর একটি ঘর। সেখানে চেনা বলে শুরুতেই তাদের ছাত্রছাত্রী ছিল ২৩ জন। ঘুরে ঘুরে, কাজ করে তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল অভিযাত্রিক। ওরা থাকত সবাই মিরপুরের দুয়ারীপাড়া বস্তিতে। তাদের ভালো লেখাপড়া দিতে লাগলেন ঢাকার বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্রছাত্রীরা। আস্তে আস্তে ছাত্রছাত্রী বাড়তে লাগল। মায়া-মমতা তো কোনোদিন পায়নি ওরা, কখনো কেউ আদর করে বসতে বলেনি, ক্ষুধা লাগলে খাওয়ায়নি; পড়ায়ওনি মনোযোগ দিয়ে। বলেনি, মানুষ শিক্ষিত হয় লেখাপড়ায়, বইয়ে আছে অদ্ভুত সুন্দর এক পৃথিবী। সেটির খোঁজে যেতে হবে। তাই ওরা স্কুল ছাড়ল না, বন্ধুদের কাছে, মা-বাবাকে স্কুলের গল্প বলল; ফলে ছাত্রছাত্রীও বাড়ল তাদের স্কুলের। এখানেও তারা সক্ষম করেছেন অনেক মা-বাবাকে। তেমনই একজন আবদুল বারেক। রাস্তার ধারে আলু, পেঁয়াজ সামান্য যখন যা পান বিক্রি করতেন কয়েকশ টাকার মূলধনে। তাতে কি আর বাঁচা যায়? ধুঁকে ধুঁকে চলা মানুষটিকে একটি নতুন দোকানঘর তৈরি করে দিয়েছে ফাউন্ডেশন। পরে তাকে দিয়েছে ১৫ হাজার টাকার জোগান। এখন তিনি ভালো আছেন। তাদের এলাকার স্কুলের পর ছাত্রছাত্রীদের পড়ার উৎসাহে রায়েরবাজারে আরেকটি শাখা খুলতে হলো সেই এলাকার বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াতে। এখানেও তারা সক্ষম করেছেন অনেককে। এরপর আরও একটি স্কুল চালু করতে হলো এক চরে। সেটি পটুয়াখালী, পায়রা বন্দরের উল্টোদিকে, রাঙ্গাবালি উপজেলার চালতাবুনি ইউনিয়নের ছোট্ট চর ‘চর লতা’য়। নদ ভাঙনে নিঃস্ব মানুষগুলোর ঠাঁই হয়েছে চরটিতে। গ্রামটি জামিসহ আরও অনেক সদস্যের গ্রামের বাড়ি। তারা কয়েকবার গিয়েছেনও। বিদুৎ নেই। মাত্র ১০ ভাগ মাটির রাস্তা, বাকিটা কাঁচাপথ। বৃষ্টি, বাদলায় কাদায় ঘর থেকে বের হওয়া দায়। হাতে গোনা কয়েকজন সচ্ছলের সন্তানদেরও নৌকায় চড়ে স্কুলে পড়তে যেতে হয়। সরকারি সেই স্কুলটি আছে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। ফলে চরের গরিবের শিশুদের লেখাপড়া আসলেই দুর্লভ ছিল। এই শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠটুকু দিতে ‘অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন’ ও ‘আইডিএলসি ফিনান্স লিমিটেড’ যৌথভাবে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিল। এক বছরের টানা পরিশ্রমে ১২ কাঠা জমির ওপর স্কুলটি তৈরি হয়েছে। চালু হয়েছে এই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি। ভবন তৈরির টাকা দিয়েছে আইডিএলসি, পরিচালনা করছে অভিযাত্রিক। মূল্যবান জমিটুকু দিয়েছেন মোসাম্মৎ শাফিয়া বেগম। তার হয়ে ছেলে অলি গাজী কেন জমি দিয়েছেন বললেন, ‘চরের অসহায় মানুষরা খুব কষ্ট করে আছে। লেখাপড়ার সুযোগ নেই, ব্যবস্থাও নেই। এই বিষয়ে জামির সঙ্গে কথা বলার পর সে স্কুল দিতে চাইল। তবে বলল, কোথায় জায়গা পাব? অনেকের সঙ্গে কথা বললাম অনেক জায়গায়। কেউ জমি দিতে রাজি হলো না। পরে আমরা স্বেচ্ছায় জায়গা দিলাম।’ স্কুলের পেছনের মানুষ জামি বললেন, ‘চরে নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছানোই আমাদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের ছিল। নৌকায় ইট, বালু, সিমেন্ট নিয়ে এসে, কাদা পেরিয়ে আবার স্কুলের জায়গায় নিতে খুব কষ্ট হয়েছে। গ্রামের মানুষ সাহায্য না করলে পারতামই না। তারা না থাকলে এই স্কুল হতো না। নিজেদের ছেলেমেয়েদের ভালো ভবিষ্যতের জন্য তারা কষ্টগুলো করেছেন।’ আইডিএলসির প্রধান মার্কেটিং অফিসার জানে আলম রোমেল বললেন, ‘আমরা অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে চরের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পেরে খুব আনন্দিত ও গর্বিত।’ স্কুলটি নিয়ে জামি বললেন, ‘স্কুলটিতে আছে মোট চারটি শ্রেণিকক্ষ। তিনটি ক্লাসরুম, একটি অফিস ঘর। পুরো স্কুল চত্বরে আছে খেলার মাঠ, পুকুর এবং ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট।’ শুরুতেই ৯০টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এখন আছে মোট ১২০ জন ছাত্রছাত্রী। স্কুলটির জন্য তিনি সবার শুভকামনা চান সবসময়, যাতে চরের সব শিশু স্কুলে লেখাপড়া করতে পারে। সব স্কুলেই স্কুল শেষে তারা শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করেন। তাই ওরা পড়তে ও স্কুলে আসতে খুব ভালোবাসে। চর লতায়ও অনেককে সক্ষম করেছেন। তেমনই একজন আনসার ফকির। এক সময় সচ্ছল ছিলেন। পরে নদী তার সব গিলে খেয়েছে। আবার ঠাঁই পেয়েছেন তার বুকে, কিন্তু পথের ফকির হয়ে। অভিযাত্রিকের কাছ থেকে পেয়েছেন পাওয়ার টিলার। চরে জমি চাষের সময়ে এক মৌসুমেই ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। ২০ শতক জমি কিনেছেন। তার পরিবারের জীবন রঙিন হয়েছে। আরেকজনকে মোহাম্মদ আলমগীর অন্যের খামারের শ্রমিক ছিলেন। আয় এত কম ছিল যে ভালোভাবে খেয়েপরেই বাঁচতে পারতেন না। তাকে হাঁসের খামার গড়ে দিয়েছে অভিযাত্রিক। প্রথম বছরেই খুব পরিশ্রম করে নিজের খামারে তিনি ফুটিয়েছেন ২শ হাঁসের ছানা। সেগুলোকে লালন-পালন করেছেন তো বটেই, পরে আরও ২শ ছানা উৎপাদন করেছেন। দুই বারে প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। ১০ মাসের মধ্যে লাভের টাকায় বসতভিটা করেছেন, গরু কিনেছেন। চরে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকার অ্যাম্বুলেন্স চালু করতে যাচ্ছে অভিযাত্রিক। যাতে নদী ও পানি পেরিয়ে কোনো প্রসূতি, অসহায় রোগীকে মূল শহরের ও উপজেলার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়। তবে উপজেলা সদরে তো ভালো কোনো হাসপাতাল নেই। নৌকার অ্যাম্বুলেন্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া, জরুরি সেবার জন্য নার্স (সেবিকা) থাকবেন। সেজন্য আইডিএলসি ফিনান্সের সাহায্যে তারা নৌকার অ্যাম্বুলেন্সটি তৈরি করছেন। নাম দিয়েছেন ‘পায়রা’। তাদের ‘অভিযাত্রিক হেলথ কেয়ার’ নামে একটি স্বাস্থ্য সেবাদান কেন্দ্র আছে। প্রতি মাসের প্রথম তিন শুক্রবার তারা ঢাকার ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায়; শেষ শুক্রবার মিরপুরের নানা এলাকায় গরিবের চিকিৎসা দেন। প্রতিবার বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রী ও চিকিৎসকরা বিনা খরচে রোগীদের চিকিৎসা ও পরামর্শ দেন। ঢাকার দুটি ও পটুয়াখালীর একটি স্কুলে তাদের ১০ জন স্নাতক পাস শিক্ষক আছেন। মোট ৪শ ছাত্রছাত্রী আছে। শিশু থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ান তারা। সামনের বছর থেকে পুরনো ক্লাসের ছেলেমেয়েদের নিয়েই সপ্তম শ্রেণি চালু হচ্ছে।  

আর কী কী কাজ করেন? এই প্রশ্ন উঠতে পারে সবার মনে। তারা থাকেন রোজার সাহরির দিনগুলোতে। পথেই যারা থাকেন, পথেই ঘুমান, ভিক্ষা করেন; তাদের জন্য ‘হাংরি নাকি’র সাহায্যে নিয়ে আসেন ‘প্রজেক্ট সাহরির দিন’। গ্রাহকদের অর্ডারের বিপরীতে লাভের টাকার একটি অংশ দিয়ে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে গরিবদের হাতে সাহরি পৌঁছে দেওয়া হয়। তারা থাকেন ফুটপাতে, বস্তিতে, রাস্তায়। তাদের স্কুলে ইফতারির আয়োজন করেন পথশিশুদের নিয়ে। যেকোনো দুর্যোগে মানুষের সাহায্যে ত্রাণ দেন দুর্গত এলাকায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নারী, শিশু ও পুরুষের জন্য আলাদা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করেছেন। শীতে কম্বল বিলি করেন। বৃক্ষরোপণ অভিযান করেন সবাই মিলে। নিয়মিত সভা করেন নিজেরা।

২০১৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ‘বাংলার জয়’ উদযাপন করেন ভিন্নভাবে। রাজধানী, ব্যস্ততম এই শহরটির সবগুলো জেব্রা ক্রসিং ও স্প্রিড ব্রেকারে রং, তুলি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। সেগুলো ট্রাফিক আইন মেনে চলার উপায় হিসেবে রাঙিয়ে দিয়ে আসেন।

২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর রমজানে ‘জয় অফ গিভিং’ ইভেন্ট পালন করতে তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা রাস্তায় নামেন। এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেন। গত রমজানে ৮৪৫টি পরিবারকে একটি ইফতার ব্যাগ উপহার দেওয়া হয়েছে। তাতে রমজানের সামগ্রী বুটডাল, মুড়ি, চিঁড়া, গুড়, দুধ, তেল, চাল, ডাল, সেমাই, বেসন ছিল। যেন তারা কারও কাছে হাত না পেতে পরিবার নিয়ে অন্তত ১০দিন ইফতার করতে পারেন।

যেকোনো উৎসবের সময় কমলা রঙের টি-শার্ট পরা, পেছনে বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা একদল ছেলেমেয়েকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পথে বেরুতে দেখা যায়। তাদের পেছনে ক্লাসের ব্যাগ। মুখে লাজুক হাসি। রাজপথে দাঁড়িয়ে, গাড়ি, রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি থামিয়ে মানুষের দান সংগ্রহ করেন। সেই টাকায় তারা পোশাক কেনেন নানা বয়সের মানুষের জন্য। এই প্রকল্পের নাম ‘প্রজেক্ট স্মাইল’। পরে রঙিন পাঞ্জাবি পরিয়ে দেন তারা কোনো ছোট শিশুর গায়ে, সে পথেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল কোনো নোংরা শার্ট পরে, তার সেই পোশাকটি খুলে নিয়ে গায়ে পরানোর সঙ্গে সঙ্গে পা ধরে সালাম করতে যায় সে। তখন আবার লজ্জায় সরে পড়েন তারা। আবার কোনো রিকশাওয়ালার শক্তিশালী গায়ে দেন বেশ ভালো মানের কোনো টি-শার্ট। তিনি হেসে ওঠেন সরলভাবে। তাদের হেরে যাওয়া শরীরে সাদা পোশাক পরিয়ে দেন মমতার আদরে। সারা দেশেই, রংপুরে, দিনাজপুরে সবখানে ছড়িয়ে পরেন তারা এই সময়গুলোতে। বাদ যান না ফুটপাতের পঙ্গু ভিখারী, নোংরা পোশাকের ছোট বাচ্চাও। ঈদের সময় তাদের এই কর্মকা- রঙিন করে দেয় সবাইকে। খুঁজে খুঁজে বের করেন তারা কে আছেন অসহায়, কার ঘরে উৎসব আসেনি। তার পাশে দাঁড়ান তারা পোশাকের ডালি নিয়ে। নোংরা আবর্জনাতে থেকে তারা পোশাক পরান স্বপ্নহীন মানুষগুলোকে। বাদ যায় না একটি ছেলে অথবা মেয়েও, আড়ালে রাখতে চান না তারা কাউকেই। এইসব মানুষসহ সব মানুষের জীবনই তাদের কাছে অমূল্য। ফেইসবুকে তারা আছেন, OBHIZATRIK Foundatio ।