বিজেপির মিশন কাশ্মীর|160914|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
বিজেপির মিশন কাশ্মীর
চিররঞ্জন সরকার

বিজেপির মিশন কাশ্মীর

কাশ্মীর নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। ভারতের বিজেপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরের স্বতন্ত্র অবস্থান কেড়ে নিয়েছে। বাতিল করা হয়েছে ৩৫-এর ধারাও। লাদাখকে কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে স্বতন্ত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরকেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে, সেখানে সীমিত অধিকারের বিধানসভা থাকবে।

 

কাশ্মীর ভারতের অংশে পরিণত হওয়ার একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময়ে ৫৮৫টি প্রিন্সলি স্টেট (দেশীয় রাজ্য বা সামন্ত রাজ্য) ছিল। ১৯৫২ সালের মধ্যেই ৫৬৫টি ভারতের সঙ্গে, অবশিষ্টগুলো পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। দেশীয় রাজ্য বলতে বোঝায় ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে থাকা আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম রাজ্য। ব্রিটিশরা সরাসরি এসব রাজ্য শাসন করত না, ব্রিটিশ আধিপত্য মেনে নিয়ে স্থানীয় শাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে ২১টির নিজস্ব সরকার ছিল। দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে কাশ্মীর ছিল অন্যতম বৃহৎ। এই দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘অল ইন্ডিয়া স্টেট পিপলস কনফারেন্স’ গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন জওহরলাল নেহরু এবং সহসভাপতি ছিলেন শেখ আবদুল্লা। ওই সময় কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্সের সভাপতি শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে ‘নয়া কাশ্মীর’ নামে একটি দাবিপত্রের ভিত্তিতে সংগ্রাম চলছিল। মুখ্যত গণতান্ত্রিক অধিকার, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রভৃতি দাবির ভিত্তিতে ওই সংগ্রাম চলছিল। বিদেশি শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতার দাবিও ছিল। শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে ন্যাশনাল কনফারেন্স ক্যাবিনেট মিশনের কাছে যে স্মারকলিপি দেয় তাতে বলা হয়েছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতের প্রদেশগুলোর মতোই ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

এরপর ঘটনাগুলো ঘটল এ রকম : জম্মু ও কাশ্মীরে ডোগরা বংশের তৎকালীন রাজা হরি সিং কর্র্তৃক সামরিক শাসন জারি, নিষ্ঠুর দমননীতি, বহু মানুষ আহত বা নিহত অথবা বন্দি, সেন্সরশিপ চালু, শেখ আবদুল্লার গ্রেপ্তার ও দেশদ্রোহের অভিযোগে তিন বছর কারাদণ্ড। মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাহও সে সময় একে গুণ্ডাদের আন্দোলন বলে অভিহিত করেন। স্বাধীনতার সময় স্থির হয় যে রাজ্যগুলো ভারত বা পাকিস্তানের সীমারেখার মধ্যে পড়বে, সেগুলো ভারত বা পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হয়ে যাবে। কিন্তু যে রাজ্য ভারত বা পাকিস্তানের সীমানায় আছে, তাদের শাসনকর্তা প্রজাদের মতো নিয়ে যেকোনো দেশে যেতে পারে অথবা স্বাধীনও থাকতে পারে। রাজা হরি সিং সিদ্ধান্ত নিলেন কাশ্মীর স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তান এই সুযোগ গ্রহণ করল। তারা কাশ্মীরের দখল প্রতিষ্ঠার জন্য সেনা অভিযান পরিচালনা করতে থাকল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে হরি সিং শেখ আবদুল্লাকে জেল থেকে মুক্তি দেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন এবং পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে কাশ্মীরকে উদ্ধার করতে প্রতিরোধ শুরু করেন। অবশেষে রাজত্ব পাকিস্তান দখল করে নিচ্ছে বুঝতে পেরে হরি সিং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং কাশ্মীরকে শর্তসাপেক্ষে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করতে রাজি হন একটি চুক্তির (ট্রিটি অব অ্যাক্সেশন) ভিত্তিতে। এরই মধ্যে ডোগরা শাসনকালের মেয়াদ শেষে কাশ্মীরের আধিপত্য দখল করেন শেখ আবদুল্লা।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালে কাশ্মীরের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর চুক্তির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয় কাশ্মীর। চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার স্বীকার করে সংবিধানের ৩৭০ ধারা যুক্ত হয়। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং যোগাযোগÑ এই তিনটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে কাশ্মীরকে বাকি ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পরামর্শে ও রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের নির্দেশে সংবিধানে ৩৫-এর ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দাদের বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ধারা অনুযায়ী, রাজ্যের ‘স্থায়ী বাসিন্দা’ কারা এবং তাদের বিশেষ অধিকার কী হবে, তা স্থির করার ক্ষমতা জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভার হাতে তুলে দেওয়া হয়। শুধু স্থায়ী বাসিন্দারাই ওই রাজ্যে সম্পত্তির মালিকানা, সরকারি চাকরি বা স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পান। রাজ্যের কোনো নারী বাসিন্দা রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। তার উত্তরাধিকারীদেরও সম্পত্তির ওপরে অধিকার থাকবে না। উল্লেখ্য, ১৯২৭ ও ১৯৩২ সালে ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’র করদ রাজ্য (প্রিন্সলি স্টেট) জম্মু ও কাশ্মীরে স্থায়ী বাসিন্দা আইন চালু হয়েছিল। কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক মহারাজা হরি সিং ওই আইন চালু করেছিলেন। বলা হয়, পাঞ্জাবিদের ‘অনুপ্রবেশ’ রুখতে কাশ্মীরি পণ্ডিতরাই এই আইন আনার দাবি তুলেছিলেন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, যে শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে ভারতভুক্ত কাশ্মীর রক্ষা পেয়েছিল, দেশদ্রোহী অজুহাত দিয়ে সেই শেখ আবদুল্লাকে গ্রেপ্তার করা হলো এবং ১৪ বছর জেলে রাখা হলো। তারপরই শুরু হলো ৩৭০ ধারায় উল্লিখিত অধিকার একটার পর একটা কেড়ে নেওয়া। সর্বশেষ অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে দেখা গেল সংবিধানের ৩৮৫টি ধারার মধ্যে ২৬০টি জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বাকি যে ১৩৫টা ধারা থাকল, তাতে কিন্তু কাশ্মীরের সংবিধান ও ভারতের সংবিধানের মধ্যে কোনো তফাত থাকল না। ৪৭টি যুগ্ম তালিকার মধ্যে ২৬টি রাজ্যের অধিকারের বাইরে রেখে দেওয়া হলো। কাশ্মীরের জনগণের ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়তে থাকল।

 

ভারত কিন্তু কাশ্মীরকে কখনোই আপন করতে পারেনি। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে কাশ্মীরকে চরমভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়। সেখানে প্রধান কোনো বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প হয়নি। নাগরিক অধিকারকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। যখন-তখন কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে যখন খুশি, যাকে খুশি হত্যা কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে নানা রকম প্রতিকূলতা সয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা সরকারি-বেসরকারি কোনো চাকরিই পান না। এই সুযোগ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। কেউ কেউ বিপথে চালিত হচ্ছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ৩৭০ ধারা বাতিল করার সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করছেন। আসলে এর মধ্য দিয়ে বিজেপির গেরুয়াকরণ রাজনীতি আরও একধাপ এগিয়ে গেল। ভোটের সময় বিজেপি নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ছিল ৩৭০ ধারা রদ করার। কিন্তু এটা রক্তপাত-হানাহানির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে সতর্কতা অবলম্বন করে কাশ্মীরে শান্তি আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সততা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারেনি। বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপে কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে যেন প্রকাশ্যেই ভ-ুল করে দেওয়া হলো। ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির সিদ্ধান্তটি কাশ্মীরের মানুষের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পর ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতি কাশ্মীরিদের আনুগত্য বাড়বে বলে আশা করা কঠিন। এর ফলে কাশ্মীর যদি ‘প্রকৃতার্থেই ভারতের অন্তর্ভুক্ত’ হয়েও ওঠে, সাধারণ মানুষের আনুগত্য কি তাতে প্রতিষ্ঠিত হবে? আর আনুগত্যই যদি না থাকে, তাহলে বিজেপি সরকার সেই ভূখণ্ডকে শাসন করবে কীসের জোরে? শুধুই বন্দুক-বেয়নেটে? শুধু বল প্রয়োগ করে, অধিকারকে অস্বীকার করে মানুষের আনুগত্য পাওয়া যায় না। এর জন্য সবার আগে দরকার উপত্যকার মানুষকে তাদের স্বাভাবিক অধিকারগুলো ফিরিয়ে দেওয়া। জনজীবনকে প্রকৃত অর্থে স্বাভাবিক করে তোলা। তা না হলে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তিকেই হয়তো আমন্ত্রণ জানানো হবে। স্বেচ্ছা-আনুগত্যে ছাড়া জোর করে কখনো কাউকে অনুগত বানানো যায় না। শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে শক্তি প্রয়োগ করে, হিংসার বীজ বুনে পৃথিবীতে কখনো কোনো রাষ্ট্র কোনো জনগোষ্ঠীকে দমন করতে পেরেছেÑ এমন উদাহরণ কিন্তু ইতিহাসে খুব একটা নেই।

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট