বঙ্গবন্ধু মোশতাককে সবসময় সন্দেহ করতেন|161382|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০৯:০৯
বঙ্গবন্ধু মোশতাককে সবসময় সন্দেহ করতেন

বঙ্গবন্ধু মোশতাককে সবসময় সন্দেহ করতেন

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্ধকারতম দিন, ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির ৪৪ বছর পার হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ও খ্যাতিমান আইনজীবী ড. কামাল হোসেন ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছেন। বর্তমানে গণফোরামের সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন বলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে, এতিম হয়ে গেছে জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা হত্যা করেছে তারা বাঙালি নয়; তারা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পাভেল হায়দার চৌধুরী

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৪৪ বছর পার হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আপনার কাছে নতুন কোনো তথ্য আছে?
ড. কামাল হোসেন : না, নতুন কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি এর সঙ্গে জড়িত আরও অনেকে আছে, যারা বাংলাদেশেই রাজনীতি করছে। আশ্রয় প্রশ্রয় পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকর হলেও এখনো বিচারের বাইরে কেউ কেউ রয়ে গেছেন। আরও ভালো করে তদন্ত করলে হয়তো তাদের চিহ্নিত করা যাবে। বঙ্গবন্ধু বিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রকাশ্যেই আছে; সকলেই তাদের চিনতে পারি।

দেশ রূপান্তর : তারা কারা?
ড. কামাল হোসেন : না সেটা আমি বলব না। তবে এটুকু বলব আরও অধিক তদন্ত করে তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুকে কেন তার প্রাণপ্রিয় বাঙালির হাতেই মরতে হলো? আপনি কী মনে করেন?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তারা নামকাওয়াস্তে বাঙালি। আসলে আমি মনে করি না কোনো বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর ওপর এভাবে আঘাত মানে বাংলাদেশের ওপর আঘাত করা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে আমরা জাতি হিসেবে এতিম হয়ে গেছি। এটা যে বা যারা করেছে তারা নামে বাঙালি হতে পারে, কিন্তু তারা আমাদের ঘোর শত্রু। তাকে যারা হত্যা করেছে তারা কেবল নামেই বাঙালি। তখন এদেশে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ছিল। হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। কাজেই ‘বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে’ এ কথা বলা একদমই সঠিক না।

দেশ রূপান্তর : বাঙালির এত প্রিয় নেতাকে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় কেন জীবন দিতে হলো? তার হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদই বা কেন হলো না?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে মানুষ জনক হারিয়েছে, এতিম হয়েছে, মানুষ জানে। মানুষ মুখ খুলে প্রতিবাদ করতে পারেনি নানা কারণে। ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি তখন মানুষ। পরিবেশও এর জন্য দায়ী। কিন্তু সকলেই বুঝেছিল সবাই বঞ্চিত হয়েছে। জনমত যাচাই করলে এটা জানা যাবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি তো বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কোন বিষয়টি আপনাকে আকৃষ্ট করে সবচেয়ে বেশি?
ড. কামাল হোসেন : আমি উনার সাহসিকতাকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করি। জাতীয় স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। আমি দেখেছি, বন্দি অবস্থায় আগরতলা মামলার সময় কী অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। ওই সময়ে আমি বঙ্গবন্ধুকে বলি, আপনার সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বসতে চায়। বোঝাপড়া করতে চায়। উনি বললেন, আমি বন্দি অবস্থায় আইয়ুব খানের সঙ্গে বসতে পারি না। আমার সঙ্গে যদি কথা বলতে হয়, জাতীয় নেতা হিসেবে আমাকে মুক্তি দিতে হবে, আমার সঙ্গে যারা বন্দি তাদেরও মুক্তি দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে ভীত করে তুলতে তখন বলা হয়েছিল- কয়েকদিন আগে সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যা করা হয়েছে, আপনার জীবনও তো নিরাপদ নয়। তখন তিনি বলেন, আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নাই, আমি গেলে মুক্ত হয়ে যাব। না হলে যাব না। এটা কত সাহসের ব্যাপার। উনাকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখানো হয়েছে। তারপরও উনি বলেছেন, আলোচনায় বসলে সম্মানের সঙ্গেই যাব, না হলে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার কোন স্মৃতিটি এখনো আপনাকে প্রেরণা দেয়?
ড. কামাল হোসেন : আমি তার সঙ্গে যখন বন্দি অবস্থায় হরিপুর জেলে ছিলাম, তিনি কারা কর্র্তৃপক্ষকে বলে আমাকে তার কাছে নিয়ে এলেন। আমি যখন তার কাছে এলাম, কোলাকুলি করে বললেন, তোমার আসতে এত দেরি হলো কেন? আমি বললাম, আমি একদম দেরি করিনি, বলার সঙ্গে সঙ্গে রেডি হয়ে চলে এসেছি। ওই কোলাকুলিটা আমার কাছে মনে হয়, ওইতো সেদিন!

দেশ রূপান্তর : আপনি তো একজন খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আইনজীবী হিসেবে ছিলেন?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে অনেক বক্তব্য রেখেছি এই জঘন্য অপরাধের বিচার হওয়া উচিত বলে। এগুলো অনেক বলেছি। তবে, ওই ভাবে মামলায় আইনজীবী হিসেবে ছিলাম না।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয় তখন আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অভিযোগ আছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন আপনি?
ড. কামাল হোসেন : ফরেন মিনিস্টার হিসেবে আমি তখন ভূমিকা রাখিনি, এটা কী উদ্দেশ্যে, কারা বলে আমি বুঝতে পারি না। আমি সেই মুহূর্ত থেকেই মন্ত্রিত্ব থেকে সরে আসলাম। মোশতাক সরকার আমাকে বলেছে, আপনাকে তো সরানো হয়নি, আপনি আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারেন। আমি বললাম প্রশ্নই ওঠে না। আমি বললাম এটা কল্পনাই করা যায় না যে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে আমি ওই মন্ত্রিসভায় থাকব। যেই মুহূর্তে উনি মারা গেছেন, সেই মুহূর্তেই আমি সরে গেছি। ওগুলো তো রেকর্ডই আছে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের অনেককে তো তারা টেনে নিল; আমাকে বারবার চেষ্টা করেও নিতে পারেনি। আমাকে অনেক লোভ দেখিয়েছে ওই সরকার। এমনও বলা হয়েছে, আপনাকে আন্তর্জাতিক মামলার ব্যাপারে কাজে লাগানো হবে। আমি বলেছি না। আমি সরাসরি বিরোধিতা করেছি। আমি এক ঘণ্টার জন্যও ওদের সঙ্গে সরকারে ছিলাম না। এবং এর তীব্র নিন্দা করে এসেছি। ওই সময়ের রেকর্ড দেখলে আমার ভূমিকা স্পষ্ট হবে।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কী হয়েছে বলে মনে করেন আপনি?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করা হয়েছে, একই সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী চিন্তাকেও লালন করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এগুলো দুঃখজনক, লজ্জাজনক। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর পরে মূল নেতৃত্ব, জাতীয় নেতৃত্বকেও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যে রাজনীতি উনি থাকলে সম্ভব হতো ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনার রাজনীতি, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার রাজনীতি। উনি থাকলে লালন করা যেত, সেটা থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি।

দেশ রূপান্তর : আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও জড়িত। এবং তার মরণোত্তর বিচারও দাবি করা হয় তাদের পক্ষ থেকে। আপনি কী মনে করেন?
ড. কামাল হোসেন : তথ্যপ্রমাণে যদি জিয়া জড়িত থাকেন তাহলে তারও মরণোত্তর বিচার করা উচিত।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং সাজাপ্রাপ্ত অন্য খুনিদের কেন দেশে ফেরত আনা যাচ্ছে না। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে এতে সরকারের কোনো গাফিলতি আছে?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুর খুনি যারা দেশের বাইরে আছে তাদের কেন দেশে ফেরত আনা যাচ্ছে না সেটা বুঝতে পারছি না আমি। এ ব্যাপারে সরকারের আসলেই কোনো চেষ্টা আছে কি না সেটা খতিয়ে দেখার দরকার রয়েছে।

দেশ রূপন্তর : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মোশতাককে কেন বঙ্গবন্ধু এত পছন্দ করতেন। আপনি কী মনে করেন?
ড. কামাল হোসেন : বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ হতে মোশতাক শুরু থেকেই লেগে ছিলেন। এটা তার ষড়যন্ত্রেরই অংশ ছিল। মোশতাক লেগেই থাকতেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ হতে। এটা ষড়যন্ত্রের একটা দিক। কিন্তু আমার মনে আছে, বঙ্গবন্ধু সবসময় তাকে সন্দেহ করতেন। খুব কাছে থেকে দেখে আমার ধারণা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু খুনি মোশতাককে সন্দেহ করতেন। কিন্তু তিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, এটা হয়তো তিনি ভাবতে পারতেন না।

দেশ রূপান্তর : আপনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ হয়েও কেন আওয়ামী লীগে থাকতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত?
ড. কামাল হোসেন : সেটা সবার জানা। নতুন করে এ ব্যাপারে কিছু বলার আর আগ্রহ নেই।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুর কোন আদর্শ নিজের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করেন?
ড. কামাল হোসেন : জনগণের পক্ষে বঙ্গবন্ধু যে রাজনীতি করতেন, দায়িত্ব নিতেন, সেদিকটা নিজের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করি। জনগণের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন হারাতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। উনার রাজনীতির মূল লক্ষ্যই ছিল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। জাতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধুর বিশেষ কোনো গুণ সম্পর্কে বলেন।
ড. কামাল হোসেন : সবাই ভেবেছিল বাঙালি আর কোনোদিন স্বাধীন হবে না, ঐক্যবদ্ধ হবে না। বঙ্গবন্ধু সেটাই করেছিলেন। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের একটি বৈঠক হয়। কিসিঞ্জার বলল, তুমি কী ধরনের শাসক যে একটা দল তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল? ইয়াহিয়া জবাব দিল, আমাদের ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছিল বাঙালি আর কোনোদিন ঐক্যবদ্ধ হবে না। বঙ্গবন্ধু সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন। বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে এটা কেউ ভাবতেই পারেনি।

দেশ রূপান্তর : বঙ্গবন্ধু যে আপনাকে পছন্দ করতেন, সেটা কীভাবে বুঝতেন?
ড. কামাল হোসেন : উনি আমাকে প্রায়ই ডেকে পাঠাতেন। আগরতলা মামলায় আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, অনেক বড় বড় আইনজীবী আছে, কিন্তু আমি চাই আমার আইনজীবী হয়ে তুমি আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য ল’ ইয়ার হও। এতে আমি খুব গর্ববোধ করি। উনি ওখান থেকে বেরিয়ে মুক্ত হয়ে আমাকে বললেন, তুমি এখনই পার্টিতে জয়েন করো। এবং আইয়ুব খানের সঙ্গে যে বৈঠক হলো, বললেন তুমি ওখানে থাকবে। এগুলোতে বুঝতে পারি বঙ্গবন্ধু আমাকে কতটা পছন্দ করতেন।