‘ব্যাট না করলে অনার্স বোর্ডে নাম উঠবে না’|162100|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
‘ব্যাট না করলে অনার্স বোর্ডে নাম উঠবে না’
ক্রীড়া প্রতিবেদক

‘ব্যাট না করলে অনার্স বোর্ডে নাম উঠবে না’

ক্রিকেট দুনিয়ার সবকিছুই যেন এখন স্টিভ স্মিথকে ঘিরে। বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে নিষিদ্ধ সাবেক এই অজি অধিনায়ক অ্যাশেজ দিয়ে টেস্ট আঙিনায় ফিরেই সব আলো নিজের ওপর করে নিয়েছেন। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত দুই সেঞ্চুরি উপহার দিয়ে জয় এনে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজের প্রথম টেস্টে। এজবাস্টনে যেখানে থেমেছিলেন, লর্ডসে সেখান থেকেই যেন শুরু করেন তিনি। পেয়ে যাচ্ছিলেন আরেকটি সেঞ্চুরি। পারেননি ৮ রানের জন্য।

না পারলেও সাহসিকতার নতুন ইতিহাস গড়লেন স্মিথ। যদিও তাবৎ ক্রিকেট বিশ্বকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। আসলে ভয়টা ধরিয়েছিল জফরা আর্চারের দ্রুত গতির ডেলিভারি। ইংল্যান্ডের হয়ে প্রথম টেস্ট খেলতে নামা এই গতিমানব ১৫০ কিমি গতির আশপাশে গোলার মতো বাউন্সার দিচ্ছিলেন স্মিথকে। তেমনই একটি ডেলিভারি এড়াতে গিয়েও পারেননি তখন ৮০ রানে অপরাজিত স্মিথ। বল আঘাত হানে বাঁ কানের নিচে উন্মুক্ত জায়গায়। আঘাতটা যে বেশ মারাত্মক ছিল তা স্মিথের হুমড়ি খেয়ে পড়া দেখেই বোঝা গেছে। পরে উঠে দাঁড়িয়েছেন, চিকিৎসার জন্য মাঠ ছেড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে আউটও হয়েছেন।

আর্চারের সেই বলের আঘাত ২০১৪ সালের এক বেদনাদায়ক ঘটনায় ফিরিয়ে নিয়েছিল সবাইকে। একইভাবে আঘাত পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ফিল হিউজ। শনিবার আঘাত পাওয়ার পর স্মিথ উঠে দাঁড়ালেও অস্ট্রেলিয়া দলের ফিজিও তাকে আরও পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান লর্ডসের মেডিকেল রুমে। সব ধরনের পরীক্ষা শেষে ফিজিও স্মিথ সম্পূর্ণ সুস্থ বলে জানালে আবারও মাঠে নামার কথা বলেন স্মিথ। সে সময়ের কথা সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার, ‘চিকিৎসক জানালেন সে পুরোপুরি ঠিক। ড্রেসিং রুমে ফেরার পর মাঠে নামার জন্য উদগ্রীব ছিল সে। আমি বললাম- তুমি কি ঠিক আছো? ও বলল- আমাকে খেলতে হবে, আমি যদি ব্যাট না করি তাহলে অনার্স বোর্ডে নাম উঠবে না আমার। স্মিথ এরকমই, এমনই ভাবে সে। আত্মপ্রত্যয়ী। তার একটাই চিন্তা ছিল- সামনের পায়ে ডিফেন্স খেলা। কারণ এটা করতে গিয়ে হাতে ব্যথা পাচ্ছিল সে।’  

৪০ মিনিট পর আবার খেলতে নামলেন স্মিথ। এবং এবারও হেলমেটের নিচের অংশে স্টেম গার্ড ছাড়াই। ৯ বলে ১২ রান যোগ করে যেভাবে বল ছেড়ে এলবিডাব্লিউ হয়েছেন, তা দেখে মনে হয়েছে, আঘাতটা মনে দ্বিধার বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছে হয়তো! অ্যাশেজে টানা তৃতীয় সেঞ্চুরিটা হাতছাড়া হলো মাত্র ৮ রানের জন্য। ক্রিস ওকসের বলে এলবিডাব্লিউ আউট হয়ে।

স্মিথকে আঘাত করা সেই বোলার আর্চার পরে জানিয়েছেন সেই ঘটনার সময়কার তার অনুভূতির কথা। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসে তার ক্যাপ্টেন স্মিথের সঙ্গে বল-ব্যাটের লড়াইটা বেশ উত্তেজনাকর পর্যায়ে ছিল। তবে তাকে আউট করাই ছিল লক্ষ্য, আঘাত করা নয়- বলেছেন তিনি। ‘আমি তাকে আউট করার চেষ্ট করছিলাম। শর্ট লেগ, লেগ স্লিপ ছিল। কোমর উচ্চতায় বলগুলো ভালোই খেলছিল সে। অপেক্ষায় ছিলাম একটু বেশি লাফালে শর্ট লেগে বল যাবে’ বলছিলেন আর্চার। লাঞ্চের পর ৮ ওভারের স্পেলটা গতির জন্য মনে থাকবে তার, ‘দর্শকরা সবাই সাহস দিচ্ছিল। নাটকীয় পরিস্থিতি। সতীর্থরা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রিদমটা পেলে একটু বেশি জোরে বল করা যায়।’ আর্চার বলেন, ‘সত্যি বলছি, কাউকে পড়ে যেতে দেখা, স্ট্রেচারে শুয়ে বের হয়ে যেতে দেখা, ম্যাচ থেকে কাউকে বাদ পড়তে দেখা, বিশেষ করে কবছর আগে যা ঘটেছিল, তেমন ঘটনা আবার ঘটতে দেখা...কখনো ভালো লাগে না কারও।’

ফিলিপ হিউজের দুঃখজনক মৃত্যুর পর ব্যাটসম্যানদের নিরাপত্তা বাড়াতে হেলমেটের পেছনে নিচের অংশে ‘স্টেম গার্ড’ ব্যবহার শুরু হয়। বিশ্বের বেশির ভাগ ব্যাটসম্যানই এই গার্ড জুড়ে দেওয়া হেলমেট পরে ব্যাট করে থাকেন। ফোম ও প্লাস্টিকে বানানো এ স্টেম গার্ড মাথার পেছনে নিচের অংশ ও ঘাড়ের ওপরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু স্মিথ এতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না বলে জানিয়েছেন কোচ ল্যাঙ্গার। আর এটি ব্যবহার বাধ্যতামূলকও নয়। তবে ল্যাঙ্গার মনে করেন, শনিবারের ঘটনার পর স্মিথ হয়তো হেলমেটে স্টেম গার্ড ব্যবহার করা শুরু করবেন। আর এটি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হলেও অবাক হবেন না ল্যাঙ্গার। শুধু হেলমেট পরে স্মিথ ব্যাট করতে নামার পেছনে অস্ট্রেলিয়ার এ কোচ নিজেকেও কিছুটা দোষী বলে মনে করেন, ‘আসলে বুঝতে পারিনি...হয়তো আমারই ভুল...বুঝতে পারিনি আজকের আগ পর্যন্ত এটা (স্টেম গার্ড) বাধ্যতামূলক ছিল না। তা ছাড়া স্টিভ তার বইয়েও লিখেছেন এটা পরতে পছন্দ করে না। ঠিক স্বস্তি পায় না। সবারই এমন কিছু নিজস্ব ছোটখাটো পছন্দ-অপছন্দ থাকে। জুতো নোংরা করা যেমন তার অপছন্দ।’

অনার্স বোর্ডে নাম লেখানো হলো না স্টিভ স্মিথের। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বে সাহসিকতার অনন্য এক নজির গড়লেন তিনি। ৫ম দিন সকালে জানানো হয়, লর্ডসে আর খেলানো হবে না তাকে। তার জায়গায় ইতিহাসে প্রথমবার এ ধরনের আঘাতে আহত কারও জায়গায় বদলি খেলোয়াড় নামলেন। তিনি মারনাস লাবুশেং। হেডিংলিতে পরের টেস্টেও স্মিথের খেলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।