লাখ কোটি টাকা ঢেলেও উন্নতি নেই রেলে|163150|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
লাখ কোটি টাকা ঢেলেও উন্নতি নেই রেলে
মামুন আব্দুল্লাহ

লাখ কোটি টাকা ঢেলেও উন্নতি নেই রেলে

রেল খাতের উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। রেলসেবাকে বিশ^মানে উন্নীত করতে নেওয়া হয়েছে মাস্টারপ্ল্যান। গত ১০ বছরে পরিচালন ব্যয়সহ রেল খাতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। চলমান রয়েছে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প। এসব প্রকল্পে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে উন্নয়ন সহযোগীরাও। লোকসান কমাতে আলোচিত সময়ে দুবার রেলের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। এত কিছুর পরও বাড়েনি রেলের সেবার মান, চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নেও রয়েছে চরম উদাসীনতা।

যার ফলে এই কোরবানি ঈদে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। এমনও হয়েছে শনিবারের ট্রেন ছেড়েছে রবিবার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলসেবার মান বাড়াতে মন্ত্রণালয় বদ্ধপরিকর। কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। তবে পরিকল্পনা বিভাগ বলছে, সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার পরও নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। বছরের প্রথম থেকেই অর্থ ছাড় করায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই। কিন্তু অর্থ ব্যয় না হওয়া দুঃখজনক।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পগুলো মানসম্মতভাবে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রেল খাতের দিকে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেভাবেই কাজ চলছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে বছরের প্রথম থেকে অর্থ ছাড় করা হচ্ছে। টাকা সরাসরি প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এরপরও কাজ না হওয়া দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে ঠিকাদার বা অন্য কোনো দুষ্টপক্ষের হাত থাকলে তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে রেল খাতের অধীনে চলমান রয়েছে ৩৬টি প্রকল্প। এর মধ্যে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ভুক্ত ছাড়াও চীন, জাপান ও ভারতীয় সহায়তানির্ভর প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মন নেই রেলসংশ্লিষ্টদের। চরম উদাসীন বাস্তবায়নের দায়িত্বরতরা। তাই বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসেনি। একই ধারায় রয়েছে চলতি বছরও। এজন্য চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে নামমাত্র অর্থ ব্যয় হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো প্রথম দুয়েক মাস বসে বসে বেতন নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো কাজ করে না। অফিস ও গাড়ির তেল খরচ বাবদ খরচকে প্রকল্প ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়। ফলে প্রথম দিকে বাস্তবায়নে কোনো গতি আসে না।

রেল বিভাগের আওতাধীন প্রকল্পের মধ্যে অগ্রাধিকার তালিকার ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প। এ প্রকল্পের

 

 বাস্তবায়নের গতি হতাশাজনক। প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দ রয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের ২৯.৯১ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যা ১১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। জুলাই মাসে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৬ লাখ টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের সঙ্গে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে ঋণ চুক্তিতে বিলম্ব হওয়ায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্মাণ চুক্তিও অনেক দেরিতে হয়েছে। এজন্য কাজে এখনো গতি আসেনি। ফলে অর্থ ব্যয় কম হচ্ছে।

ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৫২৮ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। এ ধারা এ অর্থবছরও চলমান রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পে এখন চলছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ। দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত অংশের জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের আগে এই অংশের কাজে গতি আসবে কি না তা বলা যাচ্ছে না। এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।

রেল বিভাগে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসিতে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে অবকাঠামো খাতের সবচেয়ে বড় তিন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। গত অর্থবছরের জুন পর্যন্ত এ তিন প্রকল্পে খুব বেশি অর্থ ছাড় হয়নি। একই ধারা চলছে চলতি অর্থবছরেও। এই তিন প্রকল্পের মধ্যে ‘খুলনা থেকে বাগেরহাটের মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে’ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা দেবে ভারত। ২০১০ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা। জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১১.৮৯ শতাংশ। প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৮৫০ কোটি টাকা। কিন্তু জুলাইয়ে ব্যয় হয়েছে মাত্র ০.০১ শতাংশ।

একই অবস্থা ‘ঢাকা-টঙ্গী ডুয়েল গেজ লাইন ও টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশন ডুয়েল গেজ লাইন’ প্রকল্পেও। ২০১২ সালে নেওয়া এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারত দেবে ৯০২ কোটি টাকা। প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত সার্বিক ব্যয় মাত্র ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ। আর একক মাস হিসাবে জুলাইয়ে ব্যয় মোট বরাদ্দের ০.০২ শতাংশ। চলতি বছরের জন্য ৫১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রকল্পে।

কুলাউড়া-শাহবাজপুর ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১৫ সালের ২৬ মে। এর ব্যয় ধরা হয় ৬৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২২ কোটি টাকা দেবে সরকার। বাকি ৫৫৬ কোটি টাকা বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে দেবে ভারত। চলতি অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১০.৬৩ শতাংশ। একক মাস হিসাবে জুলাইয়ে ব্যয় শূন্য। এ বছরের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেলের উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়েছে। সে অনুসারেই এগোচ্ছে আমাদের কার্যক্রম। তিনি বলেন, রেলসেবার মান বাড়াতে সরকার বদ্ধপরিকর। এজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি এসেছে। গেল অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে রেল বিভাগ। এবারও বছর শেষে বরাদ্দের পুরোটা ব্যয় হবে বলে আশা করি।

পদ্মা রেল সংযোগ ছাড়াও চীনা অর্থায়নে আরও দুই প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর থেকে ঈশ^রদী পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৪ হাজার ২২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। অন্যটি হলো আখাউড়া সিলেট সেকশনের মিটার গেজ রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরকরণ প্রকল্প। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।

রেল বিভাগের অধীনে থাকা অন্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রেললাইনের সম্ভাব্য যাচাই কার্যক্রমের প্রকল্প। এর মেয়াদ শেষ হবে আগামী মাসে। কিন্তু জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ৯.২১ শতাংশ।

জাপান সরকারের অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে আরও একটি ডাবল লাইনের সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে। সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। জুলাই পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ২.১৫ শতাংশ। আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেলসংযোগ প্রকল্পের অনুমোদন হয় ২০১৬ সালে। জুলাই পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ১৩.০৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে চাইলে রেল বিভাগকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চলমান প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ করতে পারলে প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, বছরের প্রথম দিকে এডিপি বাস্তবায়ন না হয়ে শেষ দিকে হয়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা অনেক পুরনো এবং চিহ্নিত। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বছরের প্রথম দিকে অর্থ ব্যয় না করে শেষ দিকে করলে প্রকল্পের মান নিশ্চিত হয় না।