লোভ-উসকানিতে ভয়াবহ মহাবনের আগুন|163159|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
লোভ-উসকানিতে ভয়াবহ মহাবনের আগুন
রূপান্তর ডেস্ক

লোভ-উসকানিতে ভয়াবহ  মহাবনের আগুন

মহাবন আমাজন পুড়ছে। ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ পোড়া ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে মহাদেশের আকাশ। ৯টি দেশজুড়ে বিস্তীর্ণ প্রায় পৌনে এক কোটি বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বনের নানা প্রান্তে দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। এ বনের প্রায় ৬০ শতাংশের মালিক ব্রাজিলেই এই আগুনের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। এই মহাবন সংলগ্ন বলিভিয়া, পেরু ও প্যারাগুয়েতেও এরমধ্যে ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে দাবানল এবং আগুন। গত আট মাসে ৭৪ হাজারবারেরও বেশি আগুন লেগেছে বা লাগানো হয়েছে বনটির নানা প্রান্তে।

শুধু আমাজন নয় আগুন জ্বলছে এশিয়া, ইউরোপসহ অনেক এলাকার বনে। কয়েক দিনের ব্যবধানেই গ্রিস, পর্তুগাল, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়ায় বনাঞ্চল পুড়েছে, পুড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উষ্ণতা বৃদ্ধি,

কৃষক ও কৃষিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর জমি বাড়ানোর লোভ এবং খনি ব্যবসায়ী ও কাঠ ব্যবসায়ীদের লালসার শিকার হয়েই বিলীন হচ্ছে পৃথিবীর অক্সিজেন ফ্যাক্টরির বড় অংশ। আর তাতে ইন্ধন দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষমতাসীনরাই।

আমাজনের ব্রাজিল অংশের আগুন নিয়ে পরিবেশবাদীরা সরকারের নীতিকে দায়ী করছেন। কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জার বোলসোনারো বন উজাড়ে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের উৎসাহিত করছেন বলে অভিযোগ তাদের। অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট বোলসোনারো ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য এনজিওকে দায়ী করেছেন। তার ভাষ্য, ক্ষমতায় আসার পর দেশের এনজিও ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তহবিলে বরাদ্দ অনেক কমিয়ে দেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারাই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আমাজন বনে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।

বোলসোনারো বলেন, ‘যা ঘটছে তার সব কিছুই এনজিওর লোকদের আমাজনে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আসার দিকে ইঙ্গিত করছে।’ তবে তিনি তার এই বক্তব্যের পেছনে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। উল্টো ১১৮টি এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা প্রেসিডেন্টকে এই সংক্রান্ত একটি ইশতেহারও জমা দিয়েছে।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম দ্য রিও টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক এনজিও জানিয়েছেÑ তারা দাবানলের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা বন উজাড় করতে কাঠ ব্যবসায়ী, খনি ব্যবসায়ী ও কৃষকদের উসকে দিচ্ছে। প্রলোভন দেখাচ্ছে জমি ও মুনাফা বাড়িয়ে নেওয়ার।

রয়টার্স, বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও ভাষ্য, ১৯৮৮ সালে দেশটিতে সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীদের জন্য বরাদ্দ করা একটি বিশেষ এলাকা থেকেও সম্পদ আহরণের পক্ষে বোলসোনারো। তিনি প্রকাশ্যেই ওই অঞ্চল থেকে সম্পত্তি আহরণের প্রচার চালাচ্ছেন। গত বছর নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এমন আইন করা হবে যেন পরিবেশগত সুরক্ষা এলাকাগুলোয় খনি অনুসন্ধান ও কৃষিবিষয়ক কোম্পানিগুলো কাজের সুযোগ পায়। সে সময় বনাঞ্চলের ক্ষতির জন্য জরিমানা কমানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার ঘোষণাও দিয়েছিল তার সরকার।

গত বৃহস্পতিবারও জার বোলসোনারো স্বীকার করেছেন যে, কৃষকরা জমি বাড়ানোর জন্য বনের বিভিন্ন অংশে আগুন দিচ্ছে। তিনি বলেছেন, কৃষকরা এটা করে থাকতে পারে।

দেশটির পরিবেশ দপ্তরও বলছে, আমাজনের বনে দাবানলের ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। অনেক সময় স্থানীয় কৃষকরা বন পুড়িয়ে চাষের জমি বের করার জন্যও বনে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।

এদিকে আগুনের ব্যাপকতা নিয়ে দেওয়া ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চের (ইনপে) তথ্য বলছে, গত বছরে এই একই সময়ের তুলনায় এই বছরে ৮৩ শতাংশ বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। তবে এই তথ্য অস্বীকার করেছেন বোলসোনারো। উল্টো দাবানল নিয়ে ‘ভুল তথ্য রটানো’র অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে ইনপের শীর্ষ কর্তা রিকার্ডো গ্যালভাওকে।

তবে কারণ যা-ই হোক, এই ভয়াবহ আগুন ক্রমেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ব রাজনীতিকরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই বনাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কার্বন জমা রয়েছে। ২০ শতাংশ করে বিশুদ্ধ পানি ও বায়ু সরবরাহ করা এই বনই বিশ্ব উষ্ণায়নের গতি খানিকটা ধীর রেখেছে। তবে এই বনের ওপরে মানুষের লালসাও নতুন নয়। ফলে এটা কোনো ষড়যন্ত্রের ফলও হতে পারে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিরহরিত বনাঞ্চলের রেকর্ড অগ্নিকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের মধ্যে আমরা অক্সিজেন ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান উৎসের এমন ক্ষতি মেনে নিতে পারি না। আমাজনকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।’

এই অগ্নিকাণ্ডকে ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বিষয়টি জি-৭ সম্মেলনের আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি গতকাল শুক্রবার টুইটারে লিখেছেন, ‘আমাদের ঘর জ্বলছে। আমাজন-যে ফুসফুস আমাদের গ্রহের ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদন করেÑ তা পুড়ছে। চলুন আগামী দুদিন এই জরুরি বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করি।’

তার এ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বোলসোনারো বলেছেন, ম্যাক্রোঁ ‘রাজনৈতিক সুবিধা লাভের’ জন্য আমাজনের অগ্নিকাণ্ডকে ব্যবহার করছেন। জি-৭ সম্মেলনে ব্রাজিল অংশগ্রহণ না করায় সেখানে এ অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ‘ভুল স্থানে উপনিবেশবাদী মানসিকতা’ উন্মোচিত করবে।

তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছর ধরে আমাজনে বনাঞ্চল উজাড়ের হার বেড়েছে। ২০১৮ সালে বনটির ৭৫০০ বর্গকিলোমিটার উজাড় হয়েছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালে বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার এই হার তিন গুণ বেড়ে গেছে। শুধু জুলাই মাসেই ২২০০ কিলোমিটার বনাঞ্চল পুড়ে গেছে, যা গত বছরের জুলাই মাসের তুলনায় ২৮০ শতাংশ হারে বেশি। এর মধ্যে চলতি আগস্ট মাসেই প্রথম ২০ দিনে পুড়ে গেছে রেকর্ড পরিমাণ বন। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, কয়েক লাখ প্রজাতির প্রাণী ও কয়েকশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।