৫০% পর্যন্ত বেড়েছে ওষুধের দাম|166586|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
৫০% পর্যন্ত বেড়েছে ওষুধের দাম
আবুল কাশেম

৫০% পর্যন্ত বেড়েছে ওষুধের দাম

বাজারে বিভিন্ন ওষুধের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই টাকার ট্যাবলেটের দাম এক টাকা বাড়িয়ে তিন টাকা করা হয়েছে। গ্যাস্ট্রাইটিস, অ্যাজমা, হৃদরোগ, বমি, চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের দাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। নতুন বাজেটে ওষুধের ওপর অতিরিক্ত শতকরা ২ টাকা ১৮ পয়সা মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের পর গত মাসে ভ্যাট হিসাবায়নের নতুন পদ্ধতির কথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কোম্পানিগুলোকে জানানো হয়েছে। তারপরই বিভিন্ন ওষুধের দাম বাড়াতে শুরু করে কোম্পানিগুলো। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আগের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। 

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১১৭টি মলিকুলার বা কাঁচামালে উৎপাদিত ওষুধের মূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে তাদের। ওই সময় দেশে উৎপাদিত ওষুধের মলিকুলারের সংখ্যাই ছিল ১১৭টি। গত ২৫ বছরে মলিকুলারের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪০০টির মতো হলেও পুরনো তালিকা হালনাগাদ হয়নি। এখন দেশে ওষুধ উৎপাদনে যত মলিকুলার ব্যবহার হয়, তার মাত্র আট শতাংশ থেকে উৎপাদিত ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে অধিদপ্তর। বাকিগুলোর দাম নির্ধারণ করে কোম্পানিগুলো। নতুন দাম নির্ধারণ করে কোম্পানিগুলো অধিদপ্তরকে অবহিত করে। ফলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজারে মূল্য দেখভালে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।

হঠাৎ করে বিভিন্ন ওষুধের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) রুহুল আমিন গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকে মনে করেন যে, ওষুধ প্রশাসন সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে। এটা ঠিক নয়। ১৯৯৪ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১১৭টি মলিকুলারে (কাঁচামাল) উৎপাদিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দর নির্ধারণের এখতিয়ার অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। এরপর মলিকুলার বেড়ে কম-বেশি ১৪০০ হয়েছে। কিন্তু ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু ওই ১১৭টির দরই নির্ধারণ করতে পারে। বাকি সব মলিকুলারে উৎপাদিত ওষুধের দর কোম্পানিগুলো নিজেরাই নির্ধারণ করে অধিদপ্তরকে শুধু অবহিত করে।  আমাদের নির্ধারণ করা ১১৭টির ওষুধগুলোর দাম নির্ধারিত দরের চেয়ে বাড়াতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে। এগুলোর দর নির্ধারণের এখতিয়ার আমাদের নেই। আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিগুলোর কাছে দাম বাড়ানোর কারণ জানতে চেয়েছি। তারাও অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন যে, শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়েছে; গ্যাস-বিদ্যুৎসহ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সে কারণেই তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দাম বাড়িয়েছে।’

১৯৯৪ সালের পর গত ২৫ বছরে মলিকুলারের সংখ্যা ১১৭ থেকে বেড়ে ১৪০০ হলেও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আওতা না বাড়ার কারণ জানতে চাইলে রুহুল আমিন বলেন, এটি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের বিষয়। 

ওই কর্মকর্তা বলেন, ১০০টির মতো ওষুধের দাম কমেছে, বেড়েছে আটটির। বাকি যেসব ওষুধের দাম বেড়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে

 

 কোনো একটি কোম্পানির একই ওষুধের দাম হয়তো বেশি ছিল। অন্য কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে ওই কোম্পানির ওষুধের দামের সমান করে সমন্বয় করেছে।

কোম্পানিগুলোর হিসাবে, চলতি অর্থবছর ব্যবসায়ী পর্যায়ে ২ দশমিক ৪০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কারণে উৎপাদন পর্যায় থেকে বিক্রি পর্যন্ত ভ্যাট বেড়েছে শতকরা ২ টাকা ১৮ পয়সা। বাড়তি ভ্যাটের ভার ওষুধ শিল্পগুলো বহন করবে না জানিয়ে গত ২৮ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চিঠি লেখেন ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান। তাতে তিনি লিখেন, ‘নতুন পদ্ধতিতে ভ্যাট হিসাবের কারণে ওষুধের বিক্রয় মূল্য বাড়বে। ওষুধ শিল্প দেশের একটি অতীব সংবেদনশীল খাত।  ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে। নতুন আইন অনুযায়ী ভ্যাট হিসাবায়নের পদ্ধতি বহাল থাকলে বিপুলসংখ্যক ওষুধের মূল্য বাড়াতে হবে বলে তাতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগবে।’

গত কয়েক দিন রাজধানীর বিভিন্ন ওষুধের দোকান ঘুরে দেখা যায়, রেনিটিডিন, রাবিপ্লাজল, ইসোমিপ্লাজল, মনটিলুক্যাস্ট, ডোমপেরিডনসহ গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন গ্রুপের ওষুধের দাম ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গ্যাস্ট্রাইটিসের রোগীদের প্রতিদিনই ইসোমিপ্লাজল গ্রুপের ওষুধ সেবন করতে হয়। রেনেটা কোম্পানির এ গ্রুপের ওষুধ ম্যাক্স প্রো ৪০ এমজির (মিলিগ্রাম) প্রতিটির দাম আগে ছিল আট টাকা। এখন হয়েছে ৯ টাকা। ম্যাক্স প্রো ২০ এমজির প্রতিটির দাম পাঁচ থেকে বেড়ে হয়েছে সাত টাকা। একই গ্রুপের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সেকলো ২০ এমজির প্রতিটির দাম পাঁচ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ছয় টাকা। বেক্সিমকো ফার্মার এসিফিক্স ২০ এমজির প্রতি ট্যাবলেটের দাম পাঁচ থেকে হয়েছে সাত টাকা। রাবিপ্লাজল গ্রুপের ফিনিক্স ২০ এমজির প্রতিটির দাম পাঁচ থেকে বাড়িয়ে সাত টাকা করেছে অপসোনিন। রেনিটিডিন গ্রুপের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের নিউটেকের দাম আড়াই টাকা থেকে বেড়ে তিন টাকা হয়েছে। রেনিটিডের প্রতিটিতে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা করেছে অপসোনিন।

রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকার মসজিদ গলির ওষুধ বিক্রেতা মা ফার্মেসির ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে জানান, মনটিলুকাস্ট গ্রুপের অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টের ওষুধ মোনাসের প্রতিটির দাম ১৫ থেকে ১৬ টাকা করেছে একমি। এরিস্টোফার্মার ব্যথানাশক ওষুধ নেসোর প্রতিটি হয়েছে ১০ থেকে ১৩ টাকা।  হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বেক্সিমকো ফার্মার বাইজোরান (৫/২০) প্রতিটি ১০ থেকে ১২ টাকা, বাইজোরান (৫/৪০)-এর প্রতিটির দাম ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকা হয়েছে। এসিআইর হৃদরোগের ওষুধ এবেক্যাপ (৫/২০)-এর দাম এক টাকা বেড়ে হয়েছে ১১ টাকা। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্যামলোসার্ট (৫/২০)-এর প্রতিটির দাম ১০ টাকা থেকে হয়েছে ১২ টাকা। অলমিকারের দাম আট টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা হয়েছে।

তিনি জানান, বমির ওষুধ ডমপেরিডন গ্রুপের ডুমিনের প্রতিটির দাম আড়াই টাকা থেকে তিন টাকা এবং মুটিগার্ডের দাম আড়াই টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চুলকানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টি হিস্টামিন গ্রুপের ওষুধ রুপার প্রতিটির দাম ১০ টাকা থেকে ১২ টাকা করেছে এরিস্টোফার্মা।

এ ছাড়া, টুফেন ট্যাবলেট আড়াই টাকা থেকে তিন টাকা, টুফেন সিরাপ ৫৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৫ টাকা। অলমেছান ২০ এমজির দাম হয়েছে আট থেকে ১০ টাকা। পেসিকেল ২০ এমজি ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৬ টাকা, আলজিন প্রতিটি ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা, এবেটিস ১০ এমজি আট টাকা থেকে বেড়ে ৯ টাকা হয়েছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সেলটন এক গ্রামের দাম ১৯০ থেকে ২৫০ টাকা; দুই গ্রামের দাম ২৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৫০ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ওষুধের উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে ভ্যাট নির্ণয় ও পরিশোধ পদ্ধতি নির্ধারণ করে গত ২৩ জুলাই সাধারণ আদেশ জারি করে এনবিআর। ২৮ জুলাই ওষুধ কোম্পানিগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার কাছে চিঠি পাঠান, যার একটি কপি দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে।

চিঠিতে এস এম শফিউজ্জামান বলেন, ভ্যাট গণনার আগের পদ্ধতিতে উৎপাদন পর্যায়ে কোনো ওষুধের ট্রেড প্রাইস ১০০ টাকা হলে উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হতো। তাতে ভ্যাটসহ ট্রেড প্রাইস হতো ১১৫ টাকা। ট্রেড প্রাইসের ১৬ শতাংশ হারে ১৬ টাকা কমিশন ফার্মেসিগুলোর। তাতে ব্যবসায় পর্যায়ে সংযোজনসহ মূল্য দাঁড়াত ১৩১ টাকা। ফার্মেসি পর্যায়ে যে ১৬ শতাংশ কমিশন দেওয়া হয়, তার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট হিসাবে আসে ২ টাকা ৪০ পয়সা। ভ্যাটসহ সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দাঁড়ায় ১৩৩ টাকা ৪০ পয়সা। নতুন পদ্ধতিতে খুচরা মূল্য ১৩৩ টাকা ৪০ পয়সা রাখতে হলে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পর্যায়ের ট্রেড প্রাইস ধরতে হয় ৯৭ টাকা ৬৫ পয়সা। 

এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল এস এম শফিউজ্জামানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে চিঠিতে এনবিআরকে তার দেওয়া দুটি প্রস্তাবে বলা হয়, যেহেতু উৎপাদন পর্যায়ে সব ধরনের ভ্যাট দেওয়া হয়, তাই ফার্মেসির কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রে ওষুধের ট্রেড প্রাইসের সঙ্গে ফার্মেসির ১৬ শতাংশ কমিশন সংযুক্ত মূল্যকে করযোগ্য সরবরাহ মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যৌক্তিক। যেহেতু ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ওষুধ প্রশাসনের, তাই প্রশাসনের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে এনবিআরের আদেশ সংশোধন করা জরুরি। এতে সরকারের রাজস্ব ও উৎপাদনকারীর পণ্য উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে।