আমেরিকার গ্যাং কালচার|167055|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০
আমেরিকার গ্যাং কালচার
পরাগ মাঝি

আমেরিকার গ্যাং কালচার

গ্যাং কালচার এক আতঙ্কের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বেড়ে গেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই সংস্কৃতির শুরু নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক গ্যাং কালচারের অন্যতম এক বিচরণক্ষেত্র আমেরিকা। বিশাল দেশজুড়ে নানা জাতি ও বর্ণের মানুষের অবস্থান এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে হিসপানিকরাই প্রথম আমেরিকার মাটিতে গ্যাং সংস্কৃতির বীজ বোনে। পরে এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ এমনকি এশিয়ানদের মধ্যেও। লিখেছেন পরাগ মাঝি

 

গ্যাং কালচার

গ্যাং বলতে সাধারণত বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটিত কোনো চক্রকে বোঝায়। অনেক সময় কোনো পরিবারের সদস্য কিংবা বন্ধু-বান্ধব নিয়েও নির্দিষ্ট নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি গ্যাং সংগঠিত হতে পারে। তবে বেশিরভাগ গ্যাংই হয় কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক। অনৈতিক কাজ, মাদক পাচার, চুরি-ডাকাতি থেকে শুরু করে খুনোখুনির মতো ঘটনাও তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়। গ্যাংয়ের সদস্যদেরই বলা হয় গ্যাংস্টার বা গ্যাং ব্যাঞ্জার।

নির্মমতা এবং নৃশংসতার মধ্য দিয়ে সারাবিশ্বে আলোড়ন তোলা গ্যাংগুলোর মধ্যে ইতালিয়ান মাফিয়া, গ্রিক মাফিয়া, বসনিয়ান মাফিয়া, রাশিয়ান মাফিয়া, ফ্রেঞ্চ মাফিয়া, আমেরিকান মাফিয়া, মেসিডোনিয়ান মাফিয়া, আইরিশ মব, জুইশ মব, পূর্ব এশিয়ার ক্রাইম সিন্ডিকেট, আফ্রো-আমেরিকান ক্রিপস, ব্লাডস, ব্ল্যাক ডিসিপলস, আমেরিকার ল্যাটিন এমএস-১৩, ল্যাটিন কিংস, ইন্ডিয়ান ঠগ, জাপানিজ ইয়াকুজা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব সংগঠনের মধ্যে কিছু কিছু কয়েকশ বছরের পুরনো।

সপ্তদশ শতকেই লন্ডনে কয়েকটি গ্যাং মাথাচাড়া দিয়েছিল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্যাংগুলো হলোÑ মিমস, হেক্টরস, বিউগলস এবং ডেড বয়েজ। এরা প্রায় সময়ই একে অন্যের সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হতো। তাদের পোশাক-আশাকেও ব্যতিক্রমতা ছিল লক্ষণীয়।

আমেরিকার গ্যাং কালচার

গত শতাব্দীর ২০-এর দশকে (১৯২০) আমেরিকার শিকাগোতে প্রায় এক হাজার গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ছিল। তবে এই দেশটিতে প্রথম গ্যাং কালচারের অস্তিত্ব দেখা যায় ১৭৮৩ সালে। আমেরিকান রেভল্যুশনের সূত্র ধরে এসব গ্যাং আত্মপ্রকাশ করেছিল। আমেরিকার প্রথম স্ট্রিট গ্যাংটি ছিল ‘ফোরটি থিফস’ বা ‘চল্লিশ চোর’। ১৮২০ সালের দিকে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এই গ্যাং মাথাচাড়া দিয়েছিল।

২০০৭ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে সময় আমেরিকায় প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার গ্যাং সদস্যের উপস্থিতি ছিল। ২০১১ সালের হিসেবে আমেরিকায় প্রায় ১৪ লাখ গ্যাং সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। এর মধ্যে ওই বছর প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার গ্যাং সদস্য জেলে বন্দি ছিল। সে সময় দেশটিতে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ছিল।

‘দ্য গ্যাং বুক-২০১২’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি গ্যাংস্টার ছিল শিকাগোতে, প্রায় দেড় লাখ। তবে ঐতিহ্যগতভাবে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টিকেই বলা হয় ‘দ্য গ্যাং ক্যাপিটাল অব আমেরিকা’। বর্তমানে এখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার গ্যাং সদস্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ২০০৭ সালে আমেরিকাজুড়ে অন্তত ৩০ হাজার গ্যাং এবং ৮ লাখ গ্যাংস্টারের অস্তিত্ব ছিল। ১৯৯৯ সালে মার্কিন গ্যাংস্টারদের ৪৭ শতাংশই ছিল হিসপানিক, কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল ৩১ শতাংশ, শ্বেতাঙ্গরা ১৩ শতাংশ আর ৭ শতাংশ ছিল এশিয়ান।

২০০৯ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ ডেকোটার আদিবাসী অঞ্চল ‘পাইন রিজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন’-এ অপরাধ বেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল ওই অঞ্চলে থাকা ৩৯টি গ্যাংয়ের পাঁচ হাজার সদস্য। মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থা এফবিআইয়ের ধারণা অনুযায়ী, ইতালিয়ান সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর অন্তত ২৫ হাজার সদস্য আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

হিসপানিক গ্যাং

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বসবাসকারীদের বলা হয় হিসপানিক। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে (১৯২০) আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় হিসপানিকদের গ্যাংগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দক্ষিণ আমেরিকান ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক নৈকট্যের সূত্র ধরে এই ধরনের গ্যাংগুলো গড়ে উঠেছিল। এসব গ্যাংয়ে সাধারণত ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী ছেলেদেরই বেশি দেখা যেত। আমেরিকায় জাতিগত গ্যাংগুলোর মধ্যে হিসপানিকরাই ছিল সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী। ক্যালিফোর্নিয়া বিচার বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে ওই রাজ্যে দাপিয়ে বেড়ানো হিসপানিক ‘এইটিনথ স্ট্রিট গ্যাং’-এর ২০ হাজার সদস্যের মধ্যে ৬০ শতাংশই ছিল অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। হিসপানিক গ্যাংগুলোর মধ্যে এই গ্যাংটিই ছিল সবচেয়ে বড়। আর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ছিল ‘এমএস-১৩’। এই দুটি গ্যাংই মেক্সিকান মাফিয়াদের দ্বারা জেলের ভেতর থেকে পরিচালিত হতো।

১৯৪০-এর দশকে ‘ল্যাটিন কিংস’ নামে আরেকটি হিসপানিক গ্যাং আমেরিকার শিকাগোতে আত্মপ্রকাশ করেছিল। মূলত এই রাজ্যের উত্তর অংশে কিছু পুয়ের্তোরিকান এবং দক্ষিণের অংশে কিছু মেক্সিকান আত্মরক্ষা ও নিজেদের সমাজের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হলে ‘ল্যাটিন কিংস’ গড়ে ওঠে। এদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে সব দক্ষিণ আমেরিকানকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং বিভিন্ন সমস্যা বিশেষ করে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ও দক্ষিণ আমেরিকান নতুন অভিবাসীদের সাহায্যে একে অন্যের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকায় কাজের সন্ধানে দক্ষিণ আমেরিকানদের ঢল নামে। আমেরিকায় পৌঁছে তারা সাধারণত দরিদ্র মেক্সিকান এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিত। তাদের সংস্পর্শে স্ট্রিট গ্যাংগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। হিসপানিক স্ট্রিট গ্যাংয়ের সদস্যরা ‘জুট স্যুট’ নামে একটি বিশেষ পোশাক পরত। ঢোলা প্যান্ট, লম্বা লুজ ফিটিং কোট এবং পালিশ করা জুতো ছিল এই ‘জুট স্যুট’ ফ্যাশনের বৈশিষ্ট্য। তাদের বেল্ট থেকে একটি লম্বা চেইন ঝুলিয়ে তার অন্য অংশটি প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখা হতো।

১৯৬০, ’৭০ এবং ’৮০-এর দশকে হিসপানিক গ্যাংগুলোর সদস্য সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এক গ্যাং অন্য গ্যাংয়ের শত্রু মনোভাবাপন্ন ছিল। নিজেদের টেরটরি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এক গ্যাং অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত। এসব হানাহানির ফলে প্রায় সময়ই তাদের সম্প্রদায়ের নিরপরাধ মানুষও শিকারে পরিণত হতো।

১৯৮০ সালের মধ্যে হিসপানিক গ্যাংগুলো টাকা কামানোর মেক্সিকান মাফিয়াদের সরবরাহ করা মাদক বিক্রি শুরু করে। এই ব্যবসা এতটাই লাভজনক ছিল যে, অসংখ্য তরুণ হিসপানিক দলে দলে গ্যাংয়ের সদস্য হওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, ১৯৮৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে ৪৫২টি খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে সেখানে ৪৫০টি গ্যাং সক্রিয় ছিল এবং এসব গ্যাংয়ের সম্মিলিত সদস্য ছিল প্রায় ৫০ হাজার। সাত বছর পর ১৯৯৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসেই দেড় হাজার গ্যাং আত্মপ্রকাশ করে এবং সম্মিলিতভাবে এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখে। তবে এসব গ্যাংয়ের মধ্যে আফ্রো-আমেরিকানদের ‘ক্রিপস’ এবং ‘ব্লাড’ও ছিল। বেশিরভাগ গ্যাংই ছিল হিসপানিক। এক পর্যায়ে মেক্সিকান মাফিয়ারা মাদক ব্যবসার মধ্যে কর বসাতে শুরু করে। কারাগারে থাকা মাফিয়া সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য এই করারোপ করা হতো। কিছু স্ট্রিট গ্যাং এই কর দিতে অস্বীকার করে এবং নিজেদের ‘গ্রিন লাইটারস’ বা করমুক্ত দল হিসেবে দাবি করে। এভাবে শিগগিরই ‘গ্রিন লাইটারস’ গ্যাং নামে আরেকটি বৃহৎ গ্যাংয়ের আবির্ভাব ঘটে। ২০০০ সালের দিকে হিসপানিক গ্যাংগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। আমেরিকার বিভিন্ন শহরে এদের প্রভাব ছিল। আমেরিকার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল গ্যাংয়ের মধ্যে হিসপানিকরাই ছিল এগিয়ে।

আফ্রিকান আমেরিকান গ্যাং

১৯২০-এর দশকে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংগুলো আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। শুরুর দিকে তারা খুব বেশি এলাকাভিত্তিক ছিল না। এই গ্যাংগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল দুর্বল এবং তারা খুব কমই আক্রমণাত্মক হতো। দেয়াল অঙ্কন, গ্যাংয়ের বিশেষায়িত নাম কিংবা গ্যাং বৈশিষ্ট্য দিয়ে তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো না। প্রথম দিকের আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংগুলো সাধারণত কোনো পরিবারের সদস্য এবং আশপাশের অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধুদের নিয়ে সংগঠিত হতো, যারা ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকত। মূলত টাকা উপার্জনের জন্য এই গ্যাংগুলো প্রতিষ্ঠিত হতো।

১৯৫৫ থেকে ’৬৫ সালের মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলেসের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চল এবং কম্পটনে বিপুলসংখ্যক সদস্য নিয়ে বেশকিছু আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংয়ের আবির্ভাব ঘটে। কালো চামড়ার আফ্রিকান তরুণরা নিজেদের অন্যান্য গ্যাংয়ের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে আবির্ভাব ঘটে ‘ক্রিপস’ এবং ‘ব্লাড’ নামে খুব আক্রমণাত্মক এবং অপরাধপ্রবণ দুটি গ্যাং। লস অ্যাঞ্জেলেসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ও স্কুলগুলোতে হামলা চালিয়ে এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে ডাকাতির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ক্রিপস। ধীরে ধীরে লস অ্যাঞ্জেলেসের সবচেয়ে হিংস্র ও ভয়ংকর গ্যাং হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ক্রিপস। তবে এ সময়ই ক্রিপসের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য আরও কয়েকটি আফ্রো-আমেরিকান গ্যাং গড়ে ওঠে। এই গ্যাংগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ব্লাডস’। ক্যালিফোর্নিয়ার কম্পটনের পিরু স্ট্রিট এলাকায় এই গ্যাং প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। তাই ব্লাডসের সদস্যদের ‘পিরু গ্যাংস’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে ক্রিপসের ব্লাডসই সবচেয়ে কুখ্যাত আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংয়ের তকমা পায়। ১৯৭০-এর দশকে ক্রিপস এবং ব্লাডস দুই গ্যাংই ছোট ছোট কিছু উপগ্যাংয়ে বিভক্ত ছিল। এই দুই গ্যাং একে অন্যের প্রতি এমনই বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, তারা রক্তারক্তির খেলায় মেতে ওঠে। ১৯৮০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে ক্রিপস এবং ব্লাডসের প্রায় ১৫ হাজার সদস্য ছিল। এ সদস্যদের বেশিরভাগের বয়স ছিল ১৪ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। ধীরে ধীরে দুই প্রধান গ্যাংই নিজেদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্য হাতে উল্কি এবং দেয়াল অঙ্কন করত। নীল রং ছিল ক্রিপসের দখলে আর লাল রং ছিল ব্লাডসের। এই গ্যাংগুলোর সদস্যদের বিভিন্ন কাজে দক্ষতার ভিত্তিতে উপদলে ভাগ করা হতো। এসব উপদলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিলার ডগ, টুয়েলভথ গেজ, কপ কিলার ইত্যাদি।

দেয়াল অঙ্কন বা গ্রাফিত্তির মধ্য দিয়ে দলগুলো তাদের প্রচার চালাত। এছাড়াও তারা হাত এবং আঙুলের সাহায্যে বিশেষ কিছু চিহ্ন ব্যবহার করত। এসব চিহ্ন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এক গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রায় সময়ই অন্য গ্যাংস্টারদের মারামারি করার আহ্বান জানাত। আর নিজেদের বিশেষায়িত রঙের ব্যবহার নিয়ে তাদের আবেগের কোনো সীমা ছিল না। আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংগুলো ছিঁচকে চুরি থেকে শুরু করে ডাকাতি, ছিনতাই, হামলা এবং গাঁজা, হেরোইন ও কোকেন বিক্রি করত। ১৯৮৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে কোকেনের ছড়াছড়ি ছিল। ক্রেক নামে আরেকটি মাদক বিক্রি করত গ্যাংগুলো। এটি মূলত কোকেনেরই আরেকটি সংস্করণ। ১৯৮০ সালের পর আফ্রো-আমেরিকান গ্যাংয়ের সদস্যরা লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আমেরিকার অন্যান্য রাজ্যে অভিবাসন শুরু করে। ফলে ক্র্যাকের মতো ভয়াবহ মাদক সারা আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।

একসময় গ্যাং সদস্যদের বয়স, শারীরিক কাঠামো এবং গ্রেপ্তারের রেকর্ড অনুযায়ী মানমর্যাদা নির্ধারিত হতো। কিন্তু মাদক ব্যবসা শুরু হওয়ার পর এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ রাতারাতি ধনী হয়ে যেত। স্বাভাবিকভাবেই অর্থবিত্ত যেকোনো মানুষের বিশেষ যোগ্যতা ও ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হতো।

১৯৮৭ সালে ক্রিপস গ্যাংয়ের নয়জনের একটি দল লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ওয়াশিংটনে অভিবাসিত হয়। তারা সেখানে ক্র্যাক কোকেনের ব্যবসা শুরু করে। প্রতি সপ্তাহেই লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে তাদের কাছে ক্র্যাক কোকেনের চালান আসত। ১৯৮৮ সালে একটি স্কুলের পাশে ক্র্যাক কোকেন বিক্রি করার সময় একজনকে গ্রেপ্তার ও আদালতে তাকে দোষীসাব্যস্ত করে ২৫ বছরের জেল দেওয়া হয়। কানসাসের একটি জেলে সে এখনো বন্দি।

এশিয়ান গ্যাং

ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়ার অভিবাসীদের হাত ধরে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে সর্বপ্রথম অপরাধপ্রবণ স্ট্রিট গ্যাংগুলোর সূত্রপাত হয়। শুরুটা হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনামের অভিবাসীদের হাত ধরে। তাদের ধারাবাহিকতায় পরের দশকে লাওশিয়ান এবং কম্বোডিয়ানরাও কিছু গ্যাং চালু করে। এসব গ্যাংয়ে ৫ থেকে ২০০ পর্যন্ত সদস্য ছিল। সাধারণত বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডাকাতি, চুরি এবং হামলা করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। মাঝেমধ্যে গোলাগুলির মতো অপরাধেও তারা সিদ্ধহস্ত ছিল। এসব গ্যাংয়ের বেশিরভাগ সদস্যের বয়স হতো ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে এবং যাদের বয়স একটু বেশি তারা সাধারণত নেতৃত্বের জায়গায় থাকত।

প্রথমদিকে এশিয়ান গ্যাংগুলোও এতটা সংগঠিত ছিল না এবং গ্যাং সদস্যদের মধ্যেও ধারাবাহিক যোগাযোগের ঘাটতি ছিল। হিসপানিক এবং আফ্রিকান গ্যাংগুলোর মতো তাদের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যও ছিল না, যেমন ট্যাটু, দেয়াল অঙ্কন, সাইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে। তাদের গ্যাংগুলোর বিশেষ কোনো নামও থাকত না। এসব গ্যাংয়ে গুটিকয়েক নারী সদস্য থাকলেও তাদের আলাদা কোনো দল ছিল না।

১৯৮৫ সালের দিকে এশিয়ান গ্যাংগুলো সংঘবদ্ধভাবে চুরি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ঝনঝনানি, বিভিন্ন বাড়ি আক্রমণ করে ডাকাতি, সাক্ষীদের হুমকি, নিপীড়ন এবং খুনের মতো অপরাধ করতে শুরু করে। আরেকটা ব্যাপার হলোÑ ভিয়েতনামী গ্যাংগুলো তাদের নিজেদের সম্প্রদায় বিশেষ করে ভিয়েতনামিদের বাড়িঘরেই হামলা এবং ডাকাতির মতো ঘটনা ঘটাত। এসব ডাকাতি বেশিরভাগ সময়ই হতো নৃশংস। শুধু তাই নয়, ভিয়েতনামি পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে ভ্রমণ করত। এ ক্ষেত্রে লাওশিয়ান এবং কম্বোডিয়ান গ্যাংগুলো ছিল ব্যতিক্রম। তারা মূলত লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত হতো এবং নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের কর্মকা- সীমাবদ্ধ রাখত।

শ্বেতাঙ্গ গ্যাং

গত কয়েক দশকজুড়ে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ গ্যাংয়ের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রথম দিকের শ্বেতাঙ্গ গ্যাংগুলো ছিল হেলস অ্যাঞ্জেলসের মতো মোটরসাইকেলভিত্তিক স্ট্রিট গ্যাং। তাদের প্রথম আবির্ভাব ঘটে লস অ্যাঞ্জেলেসে। আজকের দিনে যেসব মোটরসাইকেল গ্যাং দেখা যায়, শ্বেতাঙ্গদের গ্যাংগুলো তাদের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। কারণ তারা সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হতো। গত শতাব্দীর আশির দশকে মাথা কামানো শ্বেতাঙ্গ গ্যাংগুলোর কার্যক্রম দেখা যায়। মাথার চুল কামিয়ে রাখা তাদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সবাই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের দর্শনে বিশ্বাসী। বেশিরভাগ সময়ই তাদের মধ্যে দলাদলি এবং অসংঘটিত মনোভব দেখা যায়।

মাথা ন্যাড়া শ্বেতাঙ্গ গ্যাংগুলোর মধ্যে বর্ণবাদই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। তাদের কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক ছিল না, এমনকি তারা অর্থ উপার্জনের জন্য খুব বেশি নিবেদিত ছিল না। তবে বর্বরোচিত নিপীড়নের মাধ্যমে তারা খুনের ঘটনাও ঘটাত। অশ্বেতাঙ্গ, ইহুদি, গৃহহীন এবং সমকামীরাই ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু। এসব গ্যাংয়ের সদস্যের বয়স সাধারণত ২০-এর কোঠায় থাকত এবং ছেলেদের মতো অসংখ্য মেয়েও ছিল এসব গ্যাংয়ে। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বেসবল ব্যাট, চাকু। এছাড়াও তাদের জুতোর মধ্যে স্টিলের তৈরি ধারালো বস্তু থাকত।

শ্বেতাঙ্গ গ্যাংগুলোও তাদের পরিচিতিমূলক দেয়াল অঙ্কন বা গ্রাফিত্তি ব্যবহার করে। আলাদা সাংকেতিক চিহ্ন এবং ট্যাটুর ব্যবহারও করে তারা। তাদের অন্যতম একটি গ্রাফিত্তি ছিল নাৎসিদের কুখ্যাত

স্বস্তিকা চিহ্ন এবং বিদ্যুৎ ঝলক। আর হস্ত-সংকেতের মধ্যে আছে নাৎসি স্যালুটসহ ‘ডাব্লিউ’ ও ‘পি’ চিহ্নের ব্যবহার। এই দুটি অক্ষরের মাধ্যমে তারা ‘হোয়াইট পাওয়ার’কে নির্দেশ করে। এছাড়াও হুডি জাতীয় পোশাকের মাধ্যমে কেউ কেউ বর্ণবাদী কু ক্লাক্স ক্লেন ভাবধারাও প্রকাশ করে। তাদের লস অ্যাঞ্জেলেসের বাইরে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে কু ক্লাক্স ক্লেন সম্মেলনেও যোগ দিতে দেখা যায়।

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে পোর্টল্যান্ড, ওরেগনের মতো আমেরিকান অঙ্গরাজ্যগুলোতে শ্বেতাঙ্গ গ্যাংয়ের প্রভাব লক্ষণীয়। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে পোর্টল্যান্ডে একটি শ্বেতাঙ্গ গ্যাংয়ের এক মাথা ন্যাড়া সদস্য ইথিওপিয়ান এক অভিবাসীকে বেসবল দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর আবারও শ্বেতাঙ্গ গ্যাংগুলো মাথাচাড়া দিয়েছে।