মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বাল্যবিয়ে দিলেন এসআই|168692|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:৫৫
মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বাল্যবিয়ে দিলেন এসআই
লালমনিরহাট প্রতিনিধি

মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বাল্যবিয়ে দিলেন এসআই

এসআই এসআই মাইনুল ইসলাম ও শাহিন আলম ।

লালমনিরহাটে ৭ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের মামলা না নিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বাল্যবিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। মামলা না নিয়ে অভিযুক্তের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার অভিযোগটি উঠেছে সদর থানার এসআই মাইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

ঘটনাটি ঘটেছে লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সুভার বাড়ি (রামদাস) গ্রামে।

১৫ সেপ্টেম্বর এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ধর্ষিতার বাবা মকবুল হোসেন পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশের রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়।

অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, ওই ছাত্রীর বাড়ির পাশের বাড়িতে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতেন উমাপতি হর নারায়ণ গ্রামের শাহিন আলম (২৪)।

সেখানে ওই ছাত্রী মাসিক ৪০০ টাকা বেতনে প্রাইভেট পড়ত। কিছুদিন পর প্রাইভেট শিক্ষক শাহিন আলম ওই শিক্ষার্থীকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ওই শিক্ষার্থী রাজি না হলে শিক্ষক শাহিন আলম তার মোবাইলে পূর্বে গোপনে তোলা কয়েকটি ছবি দেখিয়ে হুমকি দেয় যে, যদি তার প্রস্তাবে রাজি না হয় তবে এসব ছবি এডিটিং করে খারাপ ছবি বানিয়ে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে।

আর তার সঙ্গে প্রেম করলে এবং তার কথামতো চললে সে তাকে বিয়ে করবে। এতে ভয়ে ওই শিক্ষার্থী অনেকটা অনিচ্ছা সত্বেও রাজি হলে প্রাইভেট শিক্ষক শাহিন আলম বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। এতে একপর্যায়ে শিক্ষার্থীটি তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে ২৫ জুলাই মেয়েটি স্কুলে যাওয়ার সময় কৌশলে তাকে অটোরিকশায় তুলে লালমনিরহাট শহরের মেরীস্টপ ক্লিনিকে নিয়ে গর্ভপাত করায়।

পরে মেয়েটিকে রেখে পালিয়ে যায় শাহিন আলম। এরপর মেয়েটি এক ভ্যানচালকের সাহায্যে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে মেয়েটি তার বাবা-মাকে প্রাইভেট শিক্ষকের কথা জানায়। মেয়েটির বাবা বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যকে জানালে তারা মেয়েটির বাবাকে থানায় অভিযোগ দেয়ার পরামর্শ দেন।

১১ আগস্ট মকবুল হোসেন বাদী হয়ে সদর থানায় একটি ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ করার পর ওই রাতেই পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা এসআই মাইনুল ইসলাম তদন্তের জন্য মেয়েটির বাড়িতে আসেন। এ সময় এসআই মাইনুল ইসলাম মেয়ে ও তার বাবাকে মামলা করতে নিরুৎসাহিত করেন।

মামলা না করে জরিমানা অথবা অভিযুক্তের সঙ্গে বিয়ে যে কোনো একটি প্রস্তাব মেনে নিতে বলেন এসআই।

তখন ছাত্রীর বাবা বলেন, জরিমানা নিয়ে কী করব যদি অভিযুক্ত শাহিন বিয়ে করতে রাজি থাকে তাহলে সেটিই হবে সম্মানের।

এরপর ছেলে পক্ষকে যৌতুকস্বরূপ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানিয়ে দেন ওই এসআই। 

পরবর্তীকালে এসআই মাইনুলের নির্দেশেই পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন মহেন্দ্রনগরে কাজী অফিসে শহিদুল কাজীর মাধ্যমে বিয়ে হলেও মেয়ের বয়স কম হওয়ার অজুহাতে বিয়ের প্রমাণস্বরূপ কোনো কাবিননামা মেয়ে পক্ষকে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তী সময়ে এই সুযোগে শাহিনের পরিবার বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে।

লিখিত অভিযোগে মেয়েটির বাবা দাবি করেন, যদি তার দেয়া অভিযোগটি সেদিন মামলা হিসেবে নেয়া হতো তাহলে আজ হয়তো তাদের এমন হুমকির মুখে পড়তে হতো না।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় খোঁজ নিতে গেলে গ্রামবাসীর বক্তব্যে ঘটনার হুবহু সত্যতা পাওয়া যায়।

মেয়েটির বাবা বলেন, আমি নদীভাঙ্গা গরিব মানুষ, দুই বছর আগে কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে এসে এখানে বাড়ি করেছি। ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। আমার ভাগ্যে এসব ঘটবে তা জানতাম না।

অভিযুক্ত শিক্ষক শাহিন আলম ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, মাইনুল এসআই স্যার আমাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন, তাই করেছি বলে ফোন কেটে দেয়।

মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের কাজী শহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কেটে দিয়ে বন্ধ করে রাখেন।

এ বিষয়ে এসআই মাইনুল ইসলাম প্রথমে বলেন, রাতে তার সঙ্গে দেখা করতে। 

কিন্তু এখনই তার বক্তব্য দরকার জানালে তিনি বলেন, এমন ঘটনা তিনি জানেন না এবং তিনি এমন কোনো অভিযোগে পাননি বলে দাবি করে ফোন রেখে দেন।

এদিকে ধর্ষক শাহিন আলমকে বৃহস্পতিবার তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে লালমনিরহাট কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আর এসআই মাইনুল ইসলামকে বদলি করে হাতিবান্ধা সার্কেল অফিসে পাঠানো হয়েছে মর্মে লালমনিরহাট সদর থানার ওসি মাহফুজ আলম নিশ্চিত করেন। 

তবে শাহিন আলমকে কোন মামলায় গ্রেফতার ও অভিযুক্ত এসআই বদলি বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।