আবরারের আরও সব খুনিরা|172823|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
আবরারের আরও সব খুনিরা
ফিরোজ আহমেদ

আবরারের আরও সব খুনিরা

গোটা বাংলাদেশ আজ বিস্ফোরকপূর্ণ এক জনপদ। কোনখানে কখন তা বিস্ফোরিত হবে, কেউ বলতে পারে না। কিংবা নিয়মিতই তা বিস্ফোরিতও হচ্ছে। তবে এদের মাঝেও ব্যতিক্রম নির্বিশেষে শিক্ষাঙ্গনগুলো বলা যায় জ¦লে উঠবার উপযুক্ত শুকনো খড়কুটো, আবার সেখানেই গু-াতন্ত্রও সবচেয়ে শক্তভাবে কায়েম হয়ে আছে।

এই গু-াতন্ত্রের একটা রাষ্ট্রনৈতিক কাঠামো আছে, আছে তার অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবয়ব।

আবরারের মৃত্যুতে সরকারপন্থি মোসাহেবরাও ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। তারাও অবিলম্বে আবরারের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার চান। হাতেগোনা কয়েকজন চরমপন্থি মোসাহেবই কেবল ব্যতিক্রম, কিন্তু তাদের কথা বাদ রাখাই যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই যে, বুয়েট নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি শুধু নয়, যে কোনো মাস, যে কোনো দিন এবং যে কোনো ঘণ্টাতে কি যে কোনো শিক্ষায়তনে কোনো না কোনো আবরার মৃত্যুঝুঁকিতে নেই এই একই দানবের হাতে?

ফলে আজ যারা বিস্ময় প্রকাশ করছেন, নিন্দা করছেন, খুনিদের শাস্তি দাবি করছেন, খুনিদের গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করছেন, সরকারপন্থি সেই বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশই সত্যি সত্যিই এই খুনিদের সাংস্কৃতিক সহযোগী, তারাই নানান সময়ে এই হত্যার মানসিক কাঠামোটি প্রস্তুত করেছেন। এখন তারা যে গুন্ডামির সমালোচনা করছেন, তা এই গুন্ডাতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখে। তারাই এর বড় পৃষ্ঠপোষক।

২. অতীতের বহু দৃষ্টান্তÍ থেকে আমার ধারণা আবরারকে যারা হত্যা করেছে, তারা আবরারকে হয়তো খুন করতে চায়নি, চেয়েছিল ‘সাইজ’ করতে, বিশেষ করে এই কাজটির জন্যই তো ছাত্রলীগকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বসিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে তারা যে কোনো ভিন্নমতকে দমন করে পুরো ছাত্র সমাজকেই সাইজ করে রাখতে পারে। এবং এই সাইজটুকু করে রাখতে গেলে সর্বদা ঠিকঠাক মতোন শারীরতত্ত্ব মেনে পেটানো যায় না, দুয়েকটা ঘা এদিক ওদিক হয়ে আক্রান্ত শিকারটি মৃত্যুবরণও করতে পারে। এমনকি অভিজ্ঞ পুলিশও প্রায়ই এভাবে থানার মাঝে অনিচ্ছাকৃত খুনখারাবি করে ফেলে, ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণহীন পাতিগু-াটি কোন ছার!

কিন্তু আমার প্রশ্ন এখানেই, মাননীয় মোসাহেব, খুন হওয়ার আগ পর্যন্ত কখনো কি প্রতিবাদ করেছেন?  খুঁচিয়ে চোখ নষ্ট করা হয়েছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এহসান রফিকের। সালাম না দেওয়ায় একরাতে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ২২ জনকে, এমন শিরোনামও আমরা দেখেছি। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাড়গোড় সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে রাজশাহীর তরিকুল ইসলামের। এমনকি যথেষ্ট শব্দ করে সালাম না দেওয়ায় একটি ছাত্রাবাসের পাতি নেতার জননাঙ্গে লাথি মেরে বড় নেতা সংবাদ হয়েছেন। নারীদের উত্ত্যক্ত করা, ধর্ষণ করা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলা, টেন্ডারবাজিÑ এমন কোনো অপকর্ম নেই যার সঙ্গে ছাত্রলীগের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না, এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই যা অকুস্থল নয়। আক্রান্ত ব্যক্তি অসম সাহসী না হলে ধর্ষণের ঘটনাও ধামাচাপা দিয়ে ফেলা যায় এদেশে, খুনের বেলায় লাশটা শুধু আড়াল করা কঠিন। এই রকম চরম কিছু ঘটবার আগ পর্যন্ত মোসাহেবরা দেশজুড়ে ছাত্রলীগের এই গু-াতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেন কিছু বলেন না, এই প্রশ্নটি আমাদের তাই তুলতে হবে। রণাঙ্গনগুলো বাদ দিলে আমাদের বিশ^বিদ্যালয়গুলো মোট আহত-নিহতের সংখ্যায় দুনিয়ার মাঝে নজির স্থাপনে সক্ষম। বলা যায়, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন অধিকৃত ভূমি।

খুনি ছেলেগুলোর মাঝে এমন নৃশংস ঘৃণার জন্ম যারা দিয়েছেন, যারা এই নৃশংসতার ‘সীমিত’ চর্চায় নীরব ছিলেন, তারা নিশ্চয়ই খুনি।

৩. প্রতিটি ছাত্রাবাসে হাউজ টিউটর, প্রভোস্ট ইত্যাদি পদধারী ব্যক্তিরা আছেন, আছে প্রক্টরসহ বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধান করাটি কাগজে-কলমে তাদের দায়িত্ব। যদিও প্রতিটি ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীরা থাকেন ছাত্রলীগেরই পাহারায়, কড়া নজরদারি ও হুকুমবন্দি হয়ে।

এখানেও একটা গুরুতর প্রশ্ন আসে, একজন শিক্ষার্থী যখন কয়েক ঘণ্টা জুড়ে ছাত্রলীগের গু-াদের হাতে প্রহারের শিকার হন, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা কী করে তখন সময় কাটান? তিনি কি আদৌ সংবাদ পান না? নাকি শিক্ষার্থীরা তাকে সংবাদ দেওয়ার দরকার মনে করেন না? শিক্ষার্থীরা কি মনে করেন যে, তিনি অসহায়, কিছু করতে পারবেন না? অথবা, হাউজ টিউটর ও প্রভোস্টদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন এই যে, তারা যে প্রক্রিয়ায় এই দায়িত্বগুলো পেয়েছেন, তাতে চলমান গু-াতন্ত্র বিষয়ে তাদের শব্দ করবার নৈতিক সাহস নেই?

বরং এইভাবে বলা যেতে পারে, এই উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রভোস্ট-হাউজ টিউটর পর্যন্ত প্রত্যেকেই অধিকাংশ খুন জখমের ঘটনার এক একজন অংশীদার। হয়তো তারা চাননি ঘটনা এত চরমে পৌঁছাক যে, আবরার খুন হোক, মানিক ধর্ষণ করুক, শুধু নিরাপদ একটা সীমার মাঝে  হাতুড়ি চলুক, চাপাতি-রড ঘুরুক। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, খুনিরাও খুব কম ক্ষেত্রে খুনের উদ্দেশ্য নিয়ে আসে। ফলে খুনের দায় এই দায়িত্বশীল উপাচার্য এবং অন্য কর্তারাও অধিকাংশ সময়ে এড়িয়ে যেতে পারেন না।

এদের হাতেও আবরারের খুনের রক্ত লেগে আছে। এরা প্রাতিষ্ঠানিক খুনি।

৪. কিন্তু আবরারের প্রকৃত খুনি কারা?

হুকুমের আসামিরা। তাদের নাম কেউ লিখতে দেবে না, কারণ নাম বলা হলে এই দেশে চাকরি থাকে না।  তবু আজ আমাদের আবারও ভাবতে বসতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন একচেটিয়া দখলদারিত্ব প্রয়োজন পড়ে?

আবরারের মৃত্যুর কারণটির মাঝেই সেটা অনুসন্ধানের বীজটা নিহিত আছে।

দুনিয়াজুড়েই শিক্ষার্থীদের কাজ হলো রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল

থাকা। তা নিয়ে জনমত গড়ে তোলা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধে সামনের সারিতে অবস্থান করা। এই শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ গড়ে ওঠে, আরেকটি অংশ আসে নানা ট্রেড ইউনিয়ন এবং অন্য সংগঠনসমূহ থেকে। বাংলাদেশে শুধু যে রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না তাই নয়, বরং এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীতিসংক্রান্ত বিষয়েও তাদের মতামতের তোয়াক্কা করা হয় না।

বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, কেননা এই দেশে বিশ^াস করা হয় যে, ছাত্ররাই পাকিস্তানকে হটিয়েছে। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে যারা পাকিস্তানের মতোই জুলুমতন্ত্র কায়েম করতে চায়, তাদের জন্য ছাত্রদের স্বাধীনতা দেওয়া, তাদের মতামত প্রকাশ করতে দেওয়ার চাইতে বিপজ্জনক আর কিছুই হতে পারে না। এই কারণেই যেমন ১৯৭৩ সালে ডাকসুর ব্যালট বাক্স ছিনতাই করা হয়েছিল, সেই একই কারণে আজকেও দেশের সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তারা কবজায় রাখতে চায়। যেন একটা নতুন ধরনের সামন্ততন্ত্র কায়েম হয়েছে দেশে, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাসগুলোকে এক একজন যুদ্ধবাজ সামন্ত লাঠিয়ালের হাতে ইজারা দেওয়া আছে। আগেকার রাজাদের সৈন্য সরবরাহ করার মতোই এই বরকন্দাজদেরও কাজ কর্মসূচিতে লোক সরবরাহ করা, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন টাইট দিয়ে রাখা, তাদের মাঝে যে কোনো প্রতিবাদ যেন অঙ্কুরেই চিহ্নিত ও মূলোৎপাটিত করা যায়, তার বন্দোবস্ত করা। গেস্টরুম, গণরুম, বড় ভাইদের বিশেষ সালাম দেওয়ার প্রথা তার সাংস্কৃতিক আয়োজন মাত্র।

এনএসএফ যেমন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল পাকিস্তান আমলে, আজকে তার তুলনায় বহুগুণ সংগঠিত গু-াতন্ত্র কায়েম হয়েছে। যে গু-াতন্ত্রে নিজ দেশের পানির অধিকার নিয়ে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ নিয়ে কথা বললেও একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা যাবে। গু-ারাও অবগত যে, বিশ^জিতের খুনিদের বেলায় যা ঘটেছিল, তাই ঘটবে, তারা চরমতম পরিস্থিতিতে কিছুদিন ভুগলেও ছাড়া ঠিকই পেয়ে যাবে। আর এই রকম একটি দুটি খারাপ উদাহরণ বাদ দিলে নৃশংসতা এই গু-াতন্ত্রে পদোন্নতির সোপানগুলো ডিঙাতে, বড়ভাইদের চোখে পড়তে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

আবরার এই ব্যবস্থার শিকার।

গুন্ডারা আবরার হত্যার হুকুমের আসামি। প্রকৃত খুনি বলতে যদি কিছু বোঝায়, তাকে খুঁজতে হবে প্রকৃত কারণের মাঝে।

৫. সমাধান কী?

গু-াতন্ত্রের সাফল্য এই যে, অধিকাংশকে সে লোভে হোক, ভয়ে হোক, বশ্যতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের একটি লেখার সামান্য উদ্ধৃত করা যাক : “ কিছুক্ষণ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মা আমার আজকের সকালের স্ট্যাটাসটি পড়ে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছেন। বলছেন ‘আপনি বললেন আমাদের প্রতিবাদী হতে আর আমি প্রতিদিন আমার সন্তানকে বলি মাথা নিচু করে যাবা আবার বাসায় ফিরে আসবা।  কোনো মিছিল, প্রতিবাদ কিংবা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হবা না। প্রতিবাদ করলে তো সন্তানহারা হতে হয় স্যার।’ বলে কাঁদতে লাগলেন। দুই প্রান্তেই কিছুক্ষণ নীরবতা তারপর কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন, ‘আপনার  লেখা প্রতিদিন পড়ি। দুই তিন বার করে পড়ি। সন্তানকেও পড়তে দিই।’ এরপর আর কথা বলতে পারেননি। আমিও ফোন রেখে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছিলাম। আর অশ্রুজলে ভিজেছি। আমাদের এই কান্নাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে।”

গু-াতন্ত্র আসলে টিকে আছে ভীতি আর আতঙ্কের রাজত্ব তৈরির মধ্য দিয়ে। মায়ের এই কান্না যদি সন্তানদের চোখে আগুন আনতে পারে, শিক্ষাঙ্গনগুলো মুক্ত হতে পারবে। শিক্ষাঙ্গনগুলো মুক্ত হলে বাংলাদেশ মুক্ত হবে।

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]