টর্চার সেল ও আবরারদের জীবন-মরণ|173027|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০
টর্চার সেল ও আবরারদের জীবন-মরণ
সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

টর্চার সেল ও আবরারদের জীবন-মরণ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দেশজুড়ে চলছে প্রতিবাদ। হত্যায় অভিযুক্ত কয়েকজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যে অপরাধে আবরারকে হত্যা করা হলো তা যে এই দেশে এখন আর অসম্ভব কোনো বিষয় নয় তা সবারই জানা। সেই জানা বিষয়টি বিলোপ করতে যারা এতদিন কার্যকর কোনো প্রতিবাদ করেননি তারাও আজ আবরার হত্যায় আহা উহু করছেন। নিজের ছেলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন আবরারকে। কিন্তু আবরারকে কেন হত্যা করা হলো? কী অভিযোগে হত্যা করা হলো? তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ফেসবুকে বর্তমান সরকার ও প্রতিবেশী দেশ নিয়ে আপত্তিকর স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আবরার লিখেছে :

১. ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ  করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে  উদ্বোধনের আগেই  মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।

২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি  কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।

৩. কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/এ জীবন মন সকলি দাও,/তার মত সুখ কোথাও কি আছে/আপনার কথা ভুলিয়া যাও”

আবরারের এই কথাগুলো কি এদেশের অনেকেরই মনের কথা নয়? অনেকেই এভাবে সাহস, সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে বলেন না হয়তো। আবরার বলেছে। তাতেই তাকে মেরে ফেলতে হবে! বলতে দ্বিধা নেই, আবরারের এই কথাগুলো আমারও মনের কথা। তাই বলে এখন কি আমাকেও কোনো টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হবে? পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে আমাকেও, ঠিক যেভাবে মেরে ফেলা হলো বুয়েটের ছাত্র আবরারকে! আসলে আবরারের অপরাধ অনেক। প্রথম অপরাধ সে এমন একটা দেশে, এমন একটা সমাজে জন্ম নিয়েছে যে দেশটা, যে সমাজটা সবার নয়। দেশটা শুধুই ক্ষমতাবান ও তাদের অনুসারীদের। তার দ্বিতীয় অপরাধ, এ দেশে স্রোতের বিপরীতে সাহস দেখালে তার পরিণতি কী হতে পারে তা মাথায় না রাখা। তার তৃতীয় অপরাধ, এ দেশে থাকতে হলে মূক, বধির ও অন্ধ হয়ে থাকতে হবে। এখানে ক্ষমতাবানদের অপকর্ম দেখতে নেই, শুনতে নেই, বলতে নেই। এই সত্যটাকে অস্বীকার করে আবরার  লিখেছে। এত সব অপরাধ যার, এমন ঔদ্ধত্য যে ছেলে দেখায় তার বেঁচে থাকার অধিকার কি এই দেশে থাকতে পারে! তাই সেই অপরাধ ও ঔদ্ধত্যের সমাপ্তি টানতে এগিয়ে এসেছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা। আসলে মরে গিয়ে এক রকম বেঁচে গেছে আবরার।

এই ‘অক্সিজেন’ শূন্য  মৃত্যুপুরীতে হাঁটাচলা, খাওয়া-দাওয়া, দৈনন্দিন কাজ করা মানেই কি বেঁচে থাকা! এখানে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দ্বিমত করা মানেই এক আতঙ্কের জীবন। এখানে ঘরে আতঙ্ক, বাইরেও আতঙ্ক। এই আতঙ্কময় অনিশ্চিত জীবনযাপন করাকে কি বেঁচে থাকা বলে? এই প্রতিবাদহীন সব সয়ে যাওয়াকে কি বেঁচে থাকা বলে? আমার যারা প্রতিবাদহীন সব সয়ে যাওয়া বেঁচে থাকার দলে নাম লিখিয়েছি তাদের গালে যে চড় কষিয়ে দিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে গেল আবরার, সে চড়ের দাগ কি আমাদের মনে একটুও লেগেছে? এই ঘটনায় অনেকেই ছাত্রলীগকে নিন্দা করছেন। কিন্তু ছাত্রলীগ কি এবারই প্রথম এমন নৃশংস ঘটনার জন্ম দিল? এর আগে তারা কি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল থেকে বিরুদ্ধ মতের শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগের তৈরি টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেনি? তাদের হল থেকে বের করে দেয়নি? যাকেই নির্যাতন করার দরকার পড়ত তাকেই ‘ছাত্রশিবির’ ট্যাগ লাগিয়ে দিলেই যেন নির্যাতন করা বৈধ হয়ে গেল। টর্চার সেলে নিয়ে এতদিন ভিন্ন মতের শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করাকে যারা অপরাধ মনে করেননি বরং ছাত্রশিবির পিটিয়েছে বলে আত্মসন্তুষ্টি লাভ করেছেন তারাই কি আবরার হত্যার প্লট তৈরি করেননি? আজ আবরার হত্যার পরে তাদের এই আহা উহু ভÐামি ছাড়া আর কী হতে পারে! ছাত্রলীগের নৃশংসতার বহু নজির আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে আছে। যাদের একটু ‘ভুলো মন’ তারা চাইলে গুগলে সার্চ দিয়ে আকাশ থেকে নামিয়ে কিছু নমুনা দেখে নিতে পারেন। এই ছাত্রলীগই ধার দেওয়া ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এহসান রফিককে নিজের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন করে। তার একটি চোখের কর্নিয়ায় গুরুতর জখম হয়েছিল। পরের দিকে তিনি চোখের দৃষ্টি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন।

দর্জিকর্মী বিশ্বজিৎ দাসের কথাও এতদিনে নিশ্চয়ই অনেকে ভুলে গেছেন। সেই রক্তাক্ত শার্ট হয়তো এখন আর কারও মনে পড়ে না। জামায়াতের ডাকা হরতালের দিন ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনেদুপুরে অসংখ্য টিভি ক্যামেরার সামনে ছাত্রশিবির সন্দেহে ছাত্রলীগ যাকে উপর্যুপরি কোপানোর সময় যে চিৎকার করে বলেছিল, আমি ছাত্রশিবির না, আমি হিন্দু। আমাকে মারবেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী জুবায়ের হত্যার কথাও হয়তো আমরা ভুলে গেছি। সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের সেই দাউদাউ আগুন আর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অসহায় কান্নাও হয়তো ভুলে গেছি আমরা

গত এগারো বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন কতজন শিক্ষক তার আন্দাজ করাও কঠিন। কোন অপকর্মটি করেনি ছাত্রলীগ? চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হাটের-মাঠের-ঘাটের ইজারা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এমন কোনো অভিযোগ নেই যা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ওঠেনি গত এগারো বছরে। এই সময়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগও শতাধিক। টর্চার সেলে নিয়ে ছাত্রলীগ নির্যাতন করে আবরারকে হত্যা করেছে বলে আজ এই সেলও আলোচনায়। যুবলীগ নেতাকে ধরলে আবিষ্কৃত হয় টর্চার সেল। আওয়ামী লীগ ধরলেও বেরিয়ে আসে তার টর্চার সেলের খবর। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বা অন্য কোনো অঙ্গসংগঠন হোক যাকেই ধরা হচ্ছে বের হচ্ছে টর্চার সেলের খবর। সাম্প্রতিককালে যুবলীগের একটা ইউনিটের ( ঢাকা দক্ষিণ) মধ্যম সারির নেতা খালেদ মাহমুদ ভ‚ইয়ার টর্চার সেলেও পাওয়া যায় টর্চারের হরেক রকম ভয়াবহ সব উপাদান। আর ছাত্রলীগ যে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোতে টর্চার সেল বানিয়ে রেখেছে তাতো বহুল আলোচিত। ছাত্রলীগের নেতাদের এমন টর্চার সেলের অসংখ্য সংবাদ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে বিভিন্ন সময়। ভিন্ন মতের ছাত্র তো বটেই, এমনকি সাধারণ নির্দলীয় ছাত্ররা পর্যন্ত রেহাই পায় না এ নির্যাতন থেকে। নেতাদের আদবের সঙ্গে সালাম না দেওয়ার অপরাধেও টর্চার করার বহু ঘটনা এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। আর তাদের ডাক অগ্রাহ্য করে মিছিলে যাওয়া থেকে বিরত

থাকলে টর্চার সেল থেরাপি অবধারিত। এ কথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী জানে, ছাত্রনেতারা জানেন। সকলেই জানেন। কিন্তু এই টর্চার সেল বন্ধ করতে কেউ উদ্যোগী হয়নি।

আজ শুধু ‘বুয়েটের তিন হলে ৭ টর্চার সেল’ এর বিশদ বিবরণ দেওয়া হচ্ছে (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ৯ অক্টোবর ২০১৯) সেখানে আবরার ফাহাদ নামে একজন ছাত্রকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে বলে। একই কারণে এখন ডেইলি স্টার (৮ অক্টোবর ২০১৯) লিখছে, ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানান, আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মিলনস্থল হিসেবে কক্ষটি ব্যবহার করা হতো। তারা জানান, প্রায় প্রতি রাতেই সে কক্ষে পার্টি চলত। মাতাল শিক্ষার্থীদের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যেত। এতে আশপাশের কক্ষের শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা হলেও, ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পেত না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের এক নেতা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কক্ষটি ছাত্রলীগের ‘পলিটিক্যাল রুম’ হিসেবে পরিচিত ছিল। ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের ধরে সেখানে আনা হতো এবং নির্যাতন করা হতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বুয়েটের অপর এক হলের সহকারী প্রাধ্যক্ষ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে ছাত্রলীগের এমন কক্ষ রয়েছে, যেগুলো ‘টর্চার সেল’ হিসেবে পরিচিত। এটি দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিতে ছিল না, কিন্তু গত পাঁচ বছরে ফিরে এসেছে। প্রতিটি হলেই নির্দিষ্ট কিছু কক্ষ থাকে, যেখানে ছাত্রলীগ সদস্যরা থাকেন। সেখানে তারাই সর্বেসর্বা, অন্য কাউকে সেখানে থাকতে দেওয়া হয় না।’

যে ছাত্রনেতা আজ বলছেন টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করার কথা, যে শিক্ষক আজ জানাচ্ছেন টর্চার সেলে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের মদ্যপ মিলনমেলার খবর তারা নিশ্চয়ই আজই জানেননি এ খবর। আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু বলেননি কিছু। কেন বলেননি তাও কারও অজানা নয়। আমরা সবাই একটা ভয়ের রাজত্বে বসবাস করছি। সে একই কারণে এরা সংবাদ মাধ্যমে নিজের নামটা পর্যন্ত প্রকাশ করতে রাজি হননি। যেই ছেলেগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিটিয়ে, অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে ভেতর-বাহির থেঁতলে দিয়ে মেরেই ফেলল একটা তরতাজা প্রাণ তারাও তো বুয়েটেরই ছাত্র। তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাপকাঠিতে মেধাবী এ ব্যাপারে তো কারও সন্দেহ নেই। একজন দুজন নয়, অন্তত বিশ-বাইশজন বা তারও বেশি ছাত্র মিলে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকজন ছাত্রকে নিজেদের বানানো টর্চার সেলে নিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেই ফেলল! কারও মায়া লাগল না? কারও হাত কাঁপল না? কারও দয়া হলো না? কেউ বলল না, থাক আর নয়। ছেলেটি মরে যাচ্ছে! হঠাৎ রাগের মাথায় নয়, হঠাৎ দেওয়া দুচারটি পিটুনিতে নয়। দীর্ঘ পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলল আবরারকে। এই প্রাতিষ্ঠানিক তথাকথিত মেধাবী কী কাজে আসবে দেশের? এরা যে শুধুই মেধাবী হয়েছে, মানুষ হয়নি তার দায় কে নেবে? পরিবার, সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র, কারও কোনো দায় নেই?

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]