সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারতের রাজকন্যা কোরিয়ার রানি

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:২৭ পিএম

অযোধ্যার কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে দূরপ্রাচ্যের কোরীয় জাতির ইতিহাসেও। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার ফার্স্ট লেডি কিম জুং-সুক এখন ভারতের অযোধ্যায়। অবশ্য তার এ সফর হিন্দু দেবতা রামের জন্মতীর্থ দেখতে নয়, প্রাচীন অযোধ্যার রাজকন্যা সুরিরত্নের স্মারকসৌধ পরিদর্শনে।

কিংবদন্তি মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন অযোধ্যার রাজকন্যা সুরিরত্ন দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে কোরিয়ার গিমহায়ে নগরে যান। সেখানকার রাজা কিম সুরোর সঙ্গে বিয়ে হয় রাজকন্যা সুরিরত্নের। ৪৮ খ্রিস্টাব্দে কিম সুরোর সঙ্গে বিয়ের পর তার নাম হয় হিউ হোয়াং-ওক।

প্রাচীন চীনা ভাষার কিছু লেখায় এ কিংবদন্তির উল্লেখ আছে। তাতে বলা হয়েছে, অযোধ্যার রাজা একদিন স্বপ্ন দেখেন- ঈশ্বর তাকে আদেশ দিচ্ছেন ১৬ বছরের রাজকুমারী সুরিরত্নকে কোরিয়ার গিমাহ শহরে পাঠিয়ে সেখানকার রাজা কিম সুরোর সঙ্গে বিয়ে দিতে।

দক্ষিণ কোরিয়ার লোকগাঁথা ও ঐতিহাসিক কাহিনীর জনপ্রিয় বই ‘সামগুক ইউসা’, কোরীয় ভাষায় এর অর্থ ‘তিন রাজ্যের স্মৃতিগাঁথা’। এই বইয়ের কাহিনী অনুসারে তাদের রানি হিউ হোয়াং-ওক ছিলেন ‘অযুতা’ রাজ্যের রাজকন্যা। রাজা কিম সুরো আর রানি হিউ হোয়াং-ওক ১০ সন্তানের জনক-জননী হয়েছিলেন।  দুজনেই ১৫০ বছরের আয়ু পেয়েছিলেন।  

দক্ষিণ কোরিয়ার নৃবিজ্ঞানী কিম বাইউং মো বহুল প্রচলিত এই লোককাহিনী সম্পর্কে বলেন, এই কিংবদন্তির ‘‘অযুতা’ আসলে অযোধ্যাই। প্রাচীন ওই নগরের নামের ধ্বনিগত মিলকে গুরুত্ব দেন তিনি। তবে বিবিসি কোরীয় সার্ভিসের ডেভিড কান বলেন, ‘অযুতা’র রাজকুমারীর আসলেই কোনো অস্তিত্ব ছিল কিনা তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না। ইতিহাসবিদদের কাছে এর কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই আর লোকগাঁথাতেও এই গল্পের অনেকগুলো সংস্করণ রয়েছে।

রাজকন্যা সুরিরত্ন ও কারাক রাজবংশ

রাজকন্যা সুরিরত্ন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূরপ্রাচ্যের যে নগরে যান, তা এখনকার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাচীন নগর গিমহায়ে। এই নগরের রাজবংশ দীর্ঘদিন কোরিয়া শাসন করে। গিমহায়ের রাজা কিম সুরো আর অযোধ্যার রাজকন্যা সুরিরত্নের বিয়ের মধ্য দিয়েই সেখানে এক নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা পায়। কিম সুরোর নামানুসারেই কিম বংশের নামকরণ হয়।

বিবিসি কোরীয় সার্ভিস মিনজি লি জানান, কোরিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে সন্তানেরা তার বাবার পদবি বহন করে। রানি সুরিরত্ন এটা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলেন যে, সন্তানেরা তার পদবি বহন করতে পারবে না।

image

রানি সুরিরত্ন

কিংবদন্তি অনুসারে, রানির মনোকষ্ট দূর করতে রাজা তার দুই সন্তানকে রানির নাম (হিউ) ব্যবহারের অনুমতি দেন যা আজও একটা পদবি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।  ইতিহাসবিদরা জানান, কারাক বংশের বা এই রাজ দম্পতির বংশধরদের সংখ্যা এখন প্রায় ৬০ লাখ  যা দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় দশভাগ।

দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম ইয়ং-স্যাম ও কিম-দায়ে জুং এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিম জং-পিল নিজেদের কারাক রাজবংশের উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করে থাকেন।

এই কিংবদন্তি কি দক্ষিণ কোরিয়ায় জনপ্রিয়?

বিবিসি কোরীয় সার্ভিসের কিছু কর্মী জানান, তারা এ সম্পর্কে শুনেছেন। কিন্ত বিশ্বাস করেন না। কারণ এটা অনেক বেশি প্রাচীন ঘটনা। মিনজি লি জানান, যখন প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তেন তখন তারা এসব নিয়ে গল্প করতেন। বন্ধুদের আড্ডায় তারা এটা ভেবে পুলকিত বোধ করতেন যে, কিভাবে এত দূর থেকে এসে কেউ আমাদের শেকড়ের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

অবশ্য, কেউ কেউ মনে করেন রাজকন্যা সুরিরত্ন আসলে থাইল্যান্ড থেকে এসেছেন। কিংবদন্তিতে উল্লেখিত ‘অযুতা’ নগরটি আসলে থাইল্যান্ডের ‘অযুত্থায়া’ নগর। অনেকে মনে করেন, রাজকন্যা আসলে দূর সাগরের পাড়ে দক্ষিণের কোনো দেশ থেকে এসেছিলেন। আজকের দিনেও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে এ লোকগাঁথার নানা সংস্করণ। দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবারগুলোতে কারো গায়ের রঙ একটু বেশি শ্যামবর্ণের হলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে বলা হয় যে, তার পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারীরা হয়তো ওই রাজকন্যার মতোই দক্ষিণের কোনো দেশ থেকে এসেছে।  তবে, এই লোকগাঁথা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে কোরিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তারের সময়ে।

বোন-নগর অযোধ্যা-গিমহায়ে

২০০০ সালে অযোধ্যা ও গিমহায়েকে বোন-নগর (সিস্টার সিটি) হিসাবে গড়ে তোলার জন্য একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। পরে ২০০১ সালে ভারতের দক্ষিণ কোরীয় রাষ্ট্রদূতসহ একশোরও বেশি ইতিহাসবিদ এবং সরকারি প্রতিনিধিরা রানি হিউ হোয়াং ওকের স্মারকসৌধ উন্মোচন করেন যা অযোধ্যার সরযু নদীর তীরে অবস্থিত।

রানির মাতৃভূমিতে তার প্রতি সম্মান জানাতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রতি বছর প্রচুর মানুষ এখানে আসছেন। এ স্মারক সৌধের আরো উন্নয়নের জন্য ২০১৬ সালে কোরিয়ার একটি প্রতিনিধি দল উত্তর প্রদেশের সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায়। দক্ষিণ কোরিয়ার ফাস্ট লেডি কিম জুং-সুকের এখনকার এই সফর তারই ধারাবাহিকতায়। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসে কিম জুং-সুক রোববার সৌধটির ভবিষৎ উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন।

বিবিসি অবলম্বনে লায়লা আরজুমান্দ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত