মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নাম বদলের রাজনীতি নাকি বিজেপির নয়া লড়াই

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৩:২৭ পিএম

সম্প্রতি ভারতে নাম বদলের হিড়িক পড়েছে। ইসলাম ধর্ম বা মুসলিম ইতিহাস ও সংস্কৃতি আশ্রয়ী স্থানের নামকে হিন্দুয়ানি শব্দে রূপান্তর করা হচ্ছে। এর মধ্যে ‘নতুন লড়াইয়ের’ ইশারা পাচ্ছেন ইতিহাসবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

অবশ্য দেশটিতে নাম বদলের বড় ঘটনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে একশ’রও বেশি স্থানের নাম বদল হয়। যেমন; বোম্বে থেকে মুম্বাই, ক্যালকাটা থেকে কলকাতা, মাদ্রাজ থেকে চেন্নাই ইত্যাদি। মূলত ব্রিটিশদের দেওয়া নাম বাতিল করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগের নামকেই ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ভিন্ন চোখে দেখা হচ্ছে।

বিবিসির ভারতের প্রতিনিধি সৌতিক বিশ্বাস বলছেন, আত্মমর্যাদার পরিচয়, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক দাবি সেই সঙ্গে খেয়ালখুশি মতো কাল্পনিক চিন্তা থেকে ভারতে স্থানের নাম বদলের রীতি শুরু হয়। মূলত পুরনো বা আগের নামের দিকেই তাদের সমর্থন বেশি।

কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীকে তুষ্ট করে ক্ষমতায় আসা বিজেপির বর্তমান কর্মকাণ্ড নাম বদলের ক্ষেত্রে উম্মত্ততা সৃষ্টি করে চলেছে। এমনটাই মত সৌতিকের।

উত্তর প্রদেশে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত প্রখ্যাত রেল জংশন মুঘলসরাইয়ের নাম বদলের মধ্যে দিয়ে চলতি বছরের জুলাইয়ে শুরু হয় এই কর্মকাণ্ড। এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশনটির নাম এখন দিনদয়াল উপাধ্যায় রেল জংশন। কট্টরপন্থি হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (আরএসএস) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার নামেই এখন এর পরিচিতি। এই আরএসএস’র রাজনৈতিক সংগঠন হচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

অক্টোবরে একই প্রদেশেই সুপরিচিত এলাহাবাদ শহরকে প্রয়োগরাজ নামকরণ করা হয়। গঙ্গা ও যমুনা নদী এলাহাবাদেই এসে মিশেছে। যার কারণে এটি হিন্দুদের অন্যতম পবিত্র শহর। ৪৩৫ বছর আগে মুঘল শাসকরাই এর নাম দেন এলাহাবাদ।

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রত্যক্ষ সম্মতিতেই একের পর এক নাম বদল হচ্ছে। বিজেপির এজেন্ডা এগিয়ে নিতেই তাকে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচএস) এবং  হিন্দু যুব বাহিনীর বড় মাপের ব্যক্তিত্ব আদিত্যনাথ। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যোগীর সিদ্ধান্তেই এসব হচ্ছে। তাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সৃষ্টিতে অভিযুক্ত বলেও উল্লেখ করা হয়।

এলাহাবাদ প্রয়োগরাজ হওয়ার পরপরই উত্তর প্রদেশে মুসলিম ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত নাম বদলের হিড়িক পড়ে। হিন্দুস্তান টাইমস জানাচ্ছে, আজমগড়কে আরিয়ামগড়, ফৈজাবাদকে সাকেত, আলীগড়কে হরিগড় এবং মুজাফফরনগর জেলাকে লক্ষ্মীনগরে নামকরণের দাবি তুলেছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো।

বিজেপি নেতারা ইতোমধ্যে হরিগড় লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঐতিহাসিক শহর আলীগড়ে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছেন।

শুধু তাই নয় নভেম্বরের শুরুতেই প্রদেশটির ফয়জাবাদ জেলার নামকরণ করা হয় অযোধ্যা। এই জেলার দুটি যমজ শহর ফায়জাবাদ ও অযোধ্যা। হিন্দু দেবতা রামের জন্মস্থান হিসেবে অযোধ্যা পবিত্র শহর। এ অযোধ্যাতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে ১৯৯২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পুরো দেশে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের দুই হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়।

এখন কোন সমালোচনাকেই তোয়াক্কা করছেন না আদিত্যনাথ। দিওয়ালি উৎসবে সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, যারা এর বিরোধিতা করছেন, তাদের নাম রাবণ বা দুর্যোধন হলো না কেন? কী কারণে তাদের বাবা-মা সন্তানদের রাবণ অথবা দুর্যোধন নাম দিলেন না? এই দেশে নামের মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখন উত্তরপ্রদেশের আরেক বিখ্যাত শহর আগ্রার নাম বদলের দিকে এগুচ্ছে বিজেপি নেতারা। এখানেই মুঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মিত পৃথিবীর সপ্তমাচার্যের অন্যতম তাজমহলের অবস্থান। একইভাবে গুজরাটের আহমেদাবাদের দিকেও নজর তাদের। এর মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজস্থানের তিনটি গ্রামের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে।

পৃথিবীর সর্বত্রই নানা কারণে শহর কিংবা স্থানের নাম বদল হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারতের ঘটনাকে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকেই দেখছেন সমালোচকরা। বিজেপির দাবি, নাম বদল হলো ভারতের ‘গৌরবোজ্জ্বল অতীত’কে তুলে ধরা। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ ঘটছে ‘মুসলিম ঐতিহ্যের’ প্রতি বিদ্বেষের।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামিক নাম মুছে দেওয়া অনেকটা মুসলিম শাসকদের নাম মুছে দেওয়ার চেষ্টা। সেই সঙ্গে ইতিহাস থেকে তাদের অবদানকে গুরুত্বহীন ও আড়াল করে রাখা।

সমালোচকদের অনেকেই পাকিস্তানের সাথে বিষয়টির তুলনা করেছেন। সেখানেও অনেক রাস্তা এবং স্থানের নতুন নামকরণে বেছে নেওয়া হয়েছে মুসলিম বীর ও ব্যক্তিত্বদের। ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব বলছেন, স্থানের নাম হচ্ছে রাজনীতির প্রথম শিকার।

জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ মাস আগে এভাবে নাম বদলকে বিজেপির ভোটের রাজনীতি বলছেন সমালোচকরা। ভোটারদের তুষ্ট করতেই এ কাজ করছে।

মার্চে সংসদে দেশটির এক মন্ত্রী জানান, শহর, গ্রাম, রেল স্টেশনের নাম বদলের জন্য ২৭টি প্রস্তাব তার কাছে এসেছে। যার অধিকাংশই এসেছে বিজেপি শাসিত রাজস্থান ও হরিয়ানা রাজ্য থেকে।

image

শুধু উত্তরপ্রদেশই নয়, পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়েছে নাম বদল। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর জেলার নাম লেখা হচ্ছে ‘ঈশ্বরপুর’। আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ভিএইচপি’র উদ্যোগে পরিচালিত একটি স্কুলে ইসলামপুরের স্থলে লেখা হচ্ছে ঈশ্বরপুর। সংগঠনটির কার্যালয়েও লেখা হয়েছে একই নাম। ভিএইচপি’র পূর্ব ভারতের সাংগঠনিক সম্পাদক শচীন্দ্রনাথ সিংহ জানান, ইসলাম শব্দটা ঔপনিবেশিক ও মুসলিম শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া। ঐতিহাসিকভাবে ওই জায়গার নাম ঈশ্বরপুর।

তবে আদি নাম ঈশ্বরপুর ছিল কি-না সে ব্যাপারেও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না স্থানীয় নাগরিক সমাজ। ইতিহাসবিদরাও ভিএইচপি’র দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইতিহাসবিদ গৌতম ভদ্রের মতে, এ  দাবি হাস্যকর! বরঞ্চ ইসলামপুর নামের মধ্যে আরবি ‘ইসলাম’ ও বৈদিক শব্দ ‘পুর’ যোগে চমৎকার একটি সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আছে। তার মতে, এটিই ভারতীয় সংস্কৃতি।

আরেক ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায় এ কর্মকাণ্ডকে ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার যুক্তিতে ইসলামপুরের নাম ঈশ্বরপুর হতে পারে না। দুটি আলাদা বিষয়।

এদিকে জায়গার নাম বদলের সমালোচনা করে কয়েক দিন আগে উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী ওম প্রকাশ রাজভাড় তার রাজনৈতিক মিত্র বিজেপির প্রতি আক্রমণ করে বলেন, দলটির মুসলিম নেতাদের নামও বদলে দিতে। সুহেলদেভ ভারতীয় সমাজ পার্টির এ নেতা বলেন, বিজেপি মুঘলসরাই ও ফয়জাবাদের নাম বদল করেছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এসব জায়গার নাম মুঘল শাসনামলের পরে রাখা হয়েছে। তাহলে বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র শাহনেওয়াজ খান, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নকভি, উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী মহসিন রাজার নামও কেন বদলে দেওয়া উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, যখনই মুসলিমরা তাদের অধিকারের জন্য সোচ্চার হয়, তখন পিছিয়ে থাকা ও নিপীড়িত জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এসব নাটক করা হচ্ছে। মুসলমানরা ভারতকে যা দিয়েছে তা অন্য কেউ দিতে পারতো না। আমি কি এখন এই গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডকে ছুঁড়ে ফেলে দিব? কে বানিয়েছে এই লালদুর্গ, কে বানিয়েছে এই তাজমহল?

সাংবাদিক সিমি পাশা নাম বদল নিয়ে অসন্তুষ্টির প্রকাশ করে বলেন, শহরের নাম পরিবর্তন করার উদ্দেশ্য কী? এতে শহরের কি আরও ভালো অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটবে, মানুষ কি আরো ভালো কাজ পাবে?

এলাহাবাদের নাম বদলের পর ইরফান হাবিব বলেন, নিঃসন্দেহে, তারা শুধু এলাহাবাদের নাম পরিবর্তন করতে চায় না বরং সামাজিক ভারসাম্যকেও ধ্বংস করতে চায়। তারা আসলে ইতিহাস বা ধর্ম নিয়ে চিন্তিত না, তারা উভয়টিকেই নষ্ট করতে চায়।

তবে স্থানের নাম বদলে ভারতীয় মুসলিমরা এখনও লক্ষ্য করার মতো কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কিন্তু তাদের অনুভূতির আঘাত ঠিকই হয়েছে, সেইসাথে আবেগেরও। সংসদে বিজেপি সরকারের কয়েকজন এমপি ছাড়াও কংগ্রেসের এমপিদের বক্তব্যে তা প্রকাশ পায়। এছাড়া উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার দাঙ্গার স্মৃতি বেশি পুরনো হয়নি এখনো। যার কারণে সতর্ক থাকতেই মুসলমানদের এমন নীরবতা- এমনটি ভাবা হচ্ছে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত