রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাজনৈতিক সচেতনতায় ‘সময়ের প্রয়োজনে’

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৩২ এএম

২০০৫ সালে থিয়েটার আর্ট ইউনিট মঞ্চে আনে জহির রায়হানের ছোটগল্প অবলম্বনে নাটক ‘সময়ের প্রয়োজনে’। সেই সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করায় যে এই নাটকের মূল লক্ষ্য সেটা বুঝতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। নাটকের স্যুভিনিরেও সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা এবং রাজাকারদের ভূমিকা তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই নাটকটি মঞ্চে নিয়ে আসা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই নাটকের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ঢাকার নাট্যমঞ্চে থিয়েটার আর্ট ইউনিট রাজনীতি সচেতন নাট্যদল। এই দলটির আগের নাট্য প্রযোজনাগুলো, যেমন ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল’ ‘বার্থ ফ্যান্টাসি’, ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং ২০১৭ সালে মঞ্চে আসা দলটির সব শেষ প্রযোজনা ‘মর্ষকাম’ নাটকের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছে থিয়েটার আর্ট ইউনিট। ২০০৫ সালে মঞ্চে আসা ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নাটকের শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানটির মাধ্যমে। এরপর বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, চট্টগ্রাম থেকে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সশস্ত্র লড়াই শুরু।

মুক্তাঞ্চল ঘুরতে গিয়ে এক ক্যাম্প কমান্ডার জহির রায়হানের হাতে তুলে দেন মামুন নামের এক মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি। সেই ডায়েরি পাঠের মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হতে থাকে যুদ্ধদিনের মুক্তিযোদ্ধাদের সুখ-দুঃখের গল্প। প্রেমিকাকে রেখে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মামুনের যুদ্ধে চলে যাওয়া, শেখ সাবের ডাকে যুদ্ধে আসা রবি দা, কবি সুশীল ভদ্র, বাবুসহ মুক্তিযোদ্ধাদের দল। তাদের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়, কেন তারা যুদ্ধ করছে? কমান্ডার যখন প্রশ্ন করে আমরা কেন যুদ্ধ করছি? তখন রবি দা’র সরল উত্তরÑ আমি শেখ সাবের ডাকে যুদ্ধে আইছি। আরেক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘ওরা আমার মা-ভাইকে হত্যা করেছে। আমি হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধে আইছি।’ অন্য একজন বলে আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করছি।’ তাদের উত্তর শুনে কমান্ডার বলে ‘দেশ তো ভূগোলের ব্যাপার, হাজার বছরে যার হাজার বার সীমানা পাল্টায়, ভবিষ্যতেও পাল্টাবে।’ সব মুক্তিযোদ্ধারা যখন দ্বিধাগ্রস্ত তখন মামুন বলে ‘আমরা আসলে সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করছি। এটা সুবর্ণ সময়, খুব কম মানুষের জীবনেই এমন সময় আসে।’ জহির রায়হানের ছোটগল্পকে নাট্যরূপ দিতে গিয়ে নিজের কিছু ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন নির্দেশক মোহাম্মদ বারী। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কেমন বাংলাদেশ হবে?

স্বাধীন বাংলাদেশে যদি প্রতিবিপ্লবী তৈরি হয়। যদি স্বাধীনতার নায়ক শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়, যদি উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশ তবে যেন নতুন প্রজন্ম আবার যুদ্ধে নামে, তার আহ্বানও জানানো হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই মুক্তিযোদ্ধা মামুন ধরা পড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু মামুন বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে জানা যায়নি। পুরো নাটকে যুদ্ধকালীন সময়কে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নাটকের সেট ছিল নান্দনিক। সংগীতের পরিমিত ব্যবহার নাটকটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। পুরো নাটকে নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রকে ছাপিয়ে গল্পই হয়ে উঠেছে মূল প্রাণ।

অভিনেতাদের টিমওয়ার্ক মুগ্ধ করবে দর্শকদের। তবে অভিনেতাদের বাচ্যিক অভিনয়ের ব্যাপারে আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। নির্দেশক পুরো নাটকে গল্পের সরল জার্নিটাকে সহজভাবেই উপস্থাপন করেছেন। বাড়তি কোনো চমকের মাঝে গল্পটাকে হারিয়ে যেতে দেননি। যার ফলে নাটকের সঙ্গে দর্শকের দারুণ মেলবন্ধন ঘটেছে। নাটকটি ছুঁয়ে গেছে দর্শকের হৃদয়।

জহির রায়হানের ছোটগল্প থেকে ‘সময়ের প্রয়োজনে’ নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন ড. মোহাম্মদ বারী। এই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন মোহাম্মদ বারী, সেলিম মাহবুব, প্রশান্ত হালাদার, কামরুজ্জামান মিল্লাত, সাথী রঞ্জন দে, সাইফ সুমন, বিপ্লব, চন্দন রেজা, অলক, নাহিদ সুলতানা, প্রদীপ, জায়েদ, মাহফুজ, বাবু, সম্পদ, জামান, সুমন, রাকিব প্রমুখ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত