সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গানের আনন্দে কোক স্টুডিও

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:১৫ এএম

‘পুরো কাশ্মীর নিয়ে নাও, শুধু তোমাদের কোক স্টুডিওটি আমাদের দিয়ে দাও।’ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের প্রতি মজা করে বলেছিলেন ভারতীয় কৌতুক অভিনেতা সঞ্জয় রাজৌরা। পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত ‘কোক স্টুডিও’তে গান গাওয়ার জন্য পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত শিল্পীই মুখিয়ে থাকেন। এটি এমন এক স্টুডিও, যেখানে গান গেয়ে রাতারাতি তারকা বনে গেছেন অসংখ্য অখ্যাত গায়কও। যারা ইউটিউবে নিয়মিত গান শোনেন, তাদের কাছে ‘কোক স্টুডিও’ খুবই পরিচিত একটি নাম। এই স্টুডিওতে ধারণ করা অসংখ্য গান আজকাল আড্ডায়-কোলাহলে মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু কী এমন বিশেষত্ব যে, সংগীতপ্রিয় যেকোনো মানুষ এই স্টুডিওতে ধারণ করা গান শুনতে ব্যাকুল হয়ে থাকে। এই স্টুডিওকে নিয়ে পরাগ মাঝির লেখা

গানের খেলা ফিউশন

নানা সুরে পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য গান। এসব গান গেয়ে গায়করা শ্রোতাদের সুরের ভুবনে ডুবিয়ে রাখে। আধুনিক, ফোক, রক সব ধরনের সংগীতেই মন মজে মানুষের। কিন্তু কেমন হবে যদি আধুনিকের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় কোনো ফোক গান, কিংবা কোনো কাওয়ালি গান যদি রক গানের তালে মিশে যেতে পারে? সুরের এই বিশেষ খেলাটিকে বলা হয় ফিউশন। বর্তমানে এই ফিউশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় আঁতুড়ঘর ‘কোক স্টুডিও’। এই স্টুডিওর নিজস্ব হাউস ব্যান্ড থাকে, সেই সঙ্গে যোগ দেয় সুফি, ক্লাসিক্যাল, ফোক ধাঁচের বিখ্যাত ওস্তাদ শিল্পীরা। বিভিন্ন রক, পপ ব্যান্ড পারফর্ম করে এসব ওস্তাদের সঙ্গে।

image

২০০৮ সালে কোমলপানীয় কোকাকোলার ব্যানারে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে কোক স্টুডিওর প্রথম সিজন শুরু হয়। মূলত এটি একটি টেলিভিশন সিরিজ। এখানে তৈরি হওয়া গানগুলোয় শিল্পীর নিজস্ব বাদ্যবাজনার সঙ্গে যুক্ত করা হয় স্টুডিওর অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র। গানকে চমৎকার করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপন করাই কোক স্টুডিওর মূল লক্ষ্য। এই স্টুডিওতে পাকিস্তানের সুফি ও বাউলসংগীতের সঙ্গে মিশে যান একাল-সেকালের রক ও পপ ঘরানার বিখ্যাত সবাই।

রোহাইল হায়াত

কোক স্টুডিও ধারণাটি প্রথম উৎপত্তি ২০০৭ সালে। কোমলপানীয় কোম্পানি ওই বছর ব্রাজিলে কনসার্ট আদলে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিল। ওই প্রোগ্রামটি দেখেই নতুন এক পরিকল্পনা করে বসেন পাকিস্তানি ব্যান্ড ‘ভাইটাল সিংস’র সদস্য রোহাইল হায়াত। তিনি ভাবছিলেন, ওই অনুষ্ঠানটিকে কীভাবে নতুন করে পাকিস্তানে শুরু করা যায়। পরের বছরের জুনেই তিনি কোক স্টুডিওর প্রথম এপিসোড শুরু করেন।  এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন স্ত্রী আম্বার হায়াতসহ শাহজাদ হাসান এবং রিজওয়ানুল হক নামে ‘ভাইটাল সিংস’ ব্যান্ডের অন্য দুই সদস্য।

image

প্রথম এপিসোডেই আশাতীত সাড়া পেয়েছিলেন হায়াত। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় কোক স্টুডিওর সিজন-টু। ওই প্রোগ্রামে দর্শকদের সরাসরি উপস্থিতি ছিল না। একটি আবদ্ধ হলরুমে অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের সমাবেশ ঘটিয়ে পরিচালিত হয় অনুষ্ঠানটি। এভাবে টানা ছয়টি সিজন পরিচালনা করেন হায়াত। পরে স্ট্রিংস ব্যান্ডের বিলাল মাকসুদ এবং ফয়সাল কাপাডিয়া আরও চারটি সিজন পরিচালনা করেন। সিজন-১১-এর নবম এপিসোডের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

কোক স্টুডিও ইন্ডিয়া

পাকিস্তানের সব বিষয়ে নাক সিঁটকালেও ‘কোক স্টুডিও’ নিয়ে রীতিমতো ঈর্ষাপরায়ণ ছিল প্রতিবেশী ভারত। পাকিস্তানে নির্মিত হলেও এই স্টুডিওর অসংখ্য গান ভারতেও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পায়। ভারতের জনপ্রিয় শিল্পীরাও কোক স্টুডিওতে গান গাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। শেষ পর্যন্ত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভারতও কোক স্টুডিও পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সাল থেকে এমটিভির সঙ্গে শুরু করে এমটিভি কোক স্টুডিও ইন্ডিয়া। এই স্টুডিওতে এ আর রহমানের পরিচালনায় নেপালি বৌদ্ধ ভিক্ষু অনি চোয়িং ও জর্ডানের শিল্পী ফারাহ্ সিরাজের কণ্ঠে ‘জারিয়া’ বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেলিম সুলাইমানের পরিচালনায় কৈলাশ খেরের কণ্ঠে ‘বিসমিল্লাহ’ রাম সম্পদের পরিচালনায় ‘সুন্দরী কমলা’, রাজস্থানি গানের সঙ্গে ভারতীয় হিপ-হপ ও র‌্যাপ মিশিয়ে ‘কাট্টে’, পাপনের পরিচালনায় আফ্রিকান নাচুনে তালের সঙ্গে ফাঙ্ক মিশিয়ে ‘তওবা’র মতো গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হলেও সমালোচকরা দাবি করেন, পাকিস্তানের কোক স্টুডিওর কাছে-ধারেও যেতে পারেনি এমটিভির কোক স্টুডিও।

কোক স্টুডিও আফ্রিকা

কোক স্টুডিওর সর্বশেষ সংযোজন আফ্রিকা। ২০১৭ সালে আফ্রিকান শিল্পীদের গানকে সারা বিশ্বে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে সাউথ আফ্রিকায় স্টুডিওটি স্থাপন করা হয়। স্টুডিওটির বয়স অল্প হলেও এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার অন্তত ১৫ দেশের গায়ক এই প্ল্যাটফরমে এসে গান গেয়েছেন। এই গানগুলো ওই মহাদেশের ৩০ দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে।

image

আফ্রিকার লোকজশিল্পীদের সঙ্গে তারকা গায়করা এখন নিয়মিত মিউজিক ফিউশন করছেন। ন্যাস্টি সি, রানটাউন, একেএ, প্যাটোরেঙ্কিংয়ের মতো ব্যান্ড ছাড়াও সেকিনাহ্র মতো নতুন শিল্পীরা এই কোক স্টুডিওর মধ্য দিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের মেয়ে সেকিনাহ্ এখন প্রতিষ্ঠিত পপগায়িকা। তার গাওয়া ‘ব্যাক টু দ্য বিচ’ গানটি এখন তুমুল জনপিয়। আফ্রিকার সংগীতের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার জন্য ধীরে ধীরে বিশ্বস্ত মাধ্যমে পরিণত হয়েছে কোক স্টুডিও আফ্রিকা।

কোক স্টুডিওতে বাংলা গান

কোক স্টুডিওর বাংলাদেশি কোনো সংস্করণ না থাকলেও পাকিস্তান এবং ভারতে অবস্থিত এর দুই স্টুডিওতেই একাধিকবার শোনা গেছে বাংলা গান। ভারতীয় ভার্সনে বাবুল সুপ্রিয় আর সাত্যকি ব্যানার্জির সঙ্গে অনুপম গেয়েছিলেন লালনগীতি ‘মিলন হবে কত দিনে’। দেশের অন্যতম বাউলশিল্পী শফি ম-লও গেয়েছেন ভারতীয় টেলিভিশন এমটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘কোক স্টুডিও’তে। ভারতীয় সংস্করণেই ‘রাঙাবতী রাঙাবতী’ সুন্দরী কমলা এসব গানের মাধ্যমে বাংলাদেশে কোক স্টুডিও দ্রুত প্রবেশ করে। ভারতীয় শিল্পী পাপনের গাওয়া ‘দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে...’ গানটিও বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয়। পাকিস্তানি ভার্সনে পাকিস্তানি গায়ক আলমগীর হক বাংলা-উর্দুর মিশিয়ে গেয়েছিলেন ‘আমায় ভাসাইলি রে’ গানটি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছিল তার জন্ম বাংলাদেশেই। এমনকি তিনি উইলস লিটল ফ্লাওয়ার, পিএএফ শাহীন কলেজ ছাড়াও জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই ভাগ্যান্বেষণে তিনি পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত