রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সমুদ্রের ঢেউ ডোবাবে বিশ্বব্যবস্থাকেও

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:১৬ পিএম

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পরবর্তী ধাপের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করতে সম্প্রতি সম্মেলন হয়ে গেল পোল্যান্ডের কাতোবিস শহরে। অংশগ্রহণকারীরা এ বৈঠককে সফলই বলেছেন। তার কিছু কারণও আছে। সম্মেলনে পুরোপুরি অচলাবস্থা এড়ানো গেছে। বহুপাক্ষিকতার একটা চেহারাও রক্ষা করা গেছে। তবে এ সাফল্য যতটা না সারবস্তুর, তার চেয়ে বরং প্রক্রিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব আর রাশিয়ার জোট জাতিসংঘের আইপিসিসির সাম্প্রতিকতম সমীক্ষার ভয়াবহ ফলের যথাযথ স্বীকৃতি সাফল্যের সঙ্গে ঠেকিয়ে দেয়। অন্যদিকে ব্রাজিল আগামী সম্মেলন আয়োজন করার পরিকল্পনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। আরও বড় কথা যেটি তা হচ্ছে, কার্বন নিঃসরণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি পোল্যান্ড আর যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এ বৈঠককে কাজে লাগিয়েছে কয়লার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার সুযোগ হিসেবেই।

সময়ে হয়তো এসব অনীহা কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু সময়কালের ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবাই বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এমন এক বৈশ্বিক ঝুঁকি যা সবার ওপর প্রভাব ফেলবে। কিন্তু এই স্বতঃসিদ্ধ সত্যটি আড়াল করে ফেলে বড় একটি পার্থক্যকে। সেটি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন কিছু দেশের জন্য অন্যদের তুলনায় অনেক বড় ঝুঁকি। নিঃসরণ হ্রাসের বর্তমান লক্ষ্যমাত্রায় বিশ্বের গড় তাপমাত্রা সাড়ে ৩ ডিগ্রি বৃদ্ধির পথে রয়েছে। এটি ক্যারিবীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও অন্যান্য অঞ্চলের নিচু দেশের সর্বনাশ ঘটাতে যথেষ্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এ দেশগুলোর অস্তিত্বই হুমকির মুখে। বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারারা বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলে এতে প্রভাব পড়বে কোটি কোটি মানুষের ওপর। তবে তাদের অন্তত পিছিয়ে গিয়ে উঁচু মাটিতে ঠাঁই নেওয়ার একটা জায়গা আছে। দ্বীপদেশের অধিবাসীদের সে উপায়ও নেই।

বাস্তব জরুরি পরিস্থিতি ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে নতুন ও মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বৈশ্বিক ঝুঁকির মাত্রায় যখন এত অসমতা, তখন সার্বভৌমত্বের অর্থ কী দাঁড়ায়? জীবনের মেয়াদ হাতে গোনা যাচ্ছে এমন দেশগুলো রাজনীতিকে কীভাবে দেখবে? প্রথম দেশগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করলে বিশ্বের দায়িত্বই বা কী হবে? এই প্রশ্নগুলোর জবাব বিশ্বব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিষয়টি বিশেষ করে দৃশ্যমান হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। মার্কিন রাজনীতির রক্ষণশীল শাখাটি গোটা বিশে^ই জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার শিবিরের মাথা। বস্তুত এটা যেন ট্রাম্প প্রশাসনের ‘জীবনের ধ্রুবতারা’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পৌরহিত্যে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিণতি আর এর অতি নিকট প্রতিবেশীদের কাছ থেকে অচিরেই যে দায়দায়িত্ব দেশটির ঘাড়ে চাপতে যাচ্ছে এ দুয়ের বিবেচনায় বলা যায়, মার্কিন সরকার তাদের এ অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে ক্রমেই বেশি করে চাপে পড়বে।

সাধারণভাবে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন দ্বীপদেশগুলো ছোট। এ বছরের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদদের একজন উইলিয়াম নর্ডহাউসের মতো সোজাসাপ্টা ভাষায় বললে, মালদ্বীপ, জ্যামাইকা বা বাহামার ভাগ্য হিসাবের মধ্যে আসেই না বলা যায়। দেশগুলোর এই ছোট আকারের আরেকটি অর্থ হচ্ছে- ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা অসহায়। তারা নিজেরা কোনো নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশল নিয়েও পরিস্থিতি বদলাতে পারবে না। পাশ্চাত্য ও এশিয়ার বৃহৎ জনকেন্দ্রগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহার আর বৃহৎ উৎপাদনকারীদের (যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও রাশিয়া) জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিই হবে তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা। বড় রাষ্ট্রগুলোর নিস্পৃহতার পেছনে আছে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ। জলবায়ু পরিবর্তন কূটনীতি থেকে ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা সরকারগুলো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। কিন্তু ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য তারা যে হুমকি সৃষ্টি করছে তা চরমপন্থা।

বিষয়টিকে হয়তো একদিক থেকে উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। কারণ, খুদে দ্বীপদেশগুলো রাষ্ট্র হিসেবে নেহাতই নাজুক। এগুলোর অনেকটিতে দীর্ঘদিন ধরে টানা মানুষ বসবাসের নজিরও নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিংশ শতাব্দীতে তারা স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের মর্যাদা পেয়েছে। হতে পারে সার্বভৌম সমতা একধরনের ভন্ডামিপূর্ণ কাল্পনিক বিষয়। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অন্যতম মূল স্বতঃসিদ্ধ হচ্ছে স্থায়িত্ব। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ভেঙে দেওয়ার একমাত্র বৈধ উপায় হচ্ছে আরও কয়েকটির জন্ম দেওয়া। যেমন, ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি ও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পোল্যান্ডের ভাগাভাগির মাধ্যমে যেভাবে সার্বভৌমত্বের বিলুপ্তি ঘটেছিল তা আন্তর্জাতিক অপরাধের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। সোভিয়েতরা অন্তত পূর্ব পোল্যান্ডের অধিবাসীদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ যে ঢালাও সার্বভৌমত্ব হারানোর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে তার মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলবে। আমাদের বর্তমান বিশ^ব্যবস্থার একটি মৌলিক ধারণাই হচ্ছে সার্বভৌমত্বের স্থায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রগুলোর সময়কাল সীমাহীন- এ বিশ্বাসই একটি স্থিতিশীল ও স্থায়ী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়বিষয়ক সব ধারণার ভিত্তি। এর ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামোটি। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে এই বিশ্বাস একটি দেশের নীতিগত আলোচনার রূপটি ঠিক করে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকের থেকে পৃথক করার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্র এর স্থায়িত্বের বৈধতার জোরেই কঠিন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার আহ্বান জানাতে পারে। মোটাদাগে বললে, এই বৈশিষ্ট্যের বলেই রাষ্ট্রগুলো কার্যত স্থায়ীভাবে বিপুল পরিমাণ ঋণের মধ্যে থাকতে পারে।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার এই মৌলিক, নিশ্চিত বৈশিষ্ট্যগুলো এখন হুমকির মুখে। ঋণাত্মক জনমিতিগত পরিবর্তনের কারণে ধনী দেশগুলো ‘হারিয়ে যাওয়ার’ ভয়ে উদ্বিগ্ন। অভিবাসনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন দ্বীপ দেশগুলোকে আরও মৌলিক এক সমস্যার মুখে ফেলেছে। তারা বাস্তব ভূখ-বিশিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবেই আর টিকে থাকবে না। আক্ষরিকভাবেই দেশগুলো মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। বাহামার মতো তুলনামূলকভাবে ধনী দ্বীপদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন করা নিয়ে জোরের সঙ্গেই কথাবার্তা বলে। কিন্তু বাহামার ৮০ শতাংশই সাগরপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক মিটার বা আরও কম উঁচুতে। তাদের ক্ষেত্রে প্রশমনের কী অর্থ হতে পারে? আর হাইতিরই বা কী হবে? বন কেটে ফেলা অনুর্বর পাহাড়ঘেঁষা প্লাবন সমভূমিতে ভিড়াক্রান্ত পরিবেশে বসবাস দেশটির দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষদের।

সার্বভৌমত্বের এই ক্ষয়িষ্ণুতা অনিবার্যভাবেই রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। তবে এর রূপটি কীরকম হবে সে নিয়ে এখনো চিন্তাভাবনা হয়নি। আয়ুস্কাল সীমিত হয়ে আসা সার্বভৌম দেশগুলোর সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে বিশ্বকে। আয়ু মাত্র কয়েক দশকের ঘরে নেমে আসা দেশে কোন ধরনের বিনিয়োগ করা যৌক্তিক সে কথা ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদের। মাথায় রাখতে হবে কোন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়টির পর পুনর্গঠনের জন্য ঋণ দেওয়া আর বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সভরেইন ঋণের বাজার আর রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছে এরই মধ্যে এগুলো প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নও হতে চলেছে এগুলো।

তা পুনর্বিনিয়োগ ও পুনর্গঠন বন্ধ হয়ে গেলে কী ঘটবে? অবশিষ্ট বিশ্বের অধিকতর শক্তিশালী ও অনেকগুণ বড় শক্তিগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে তাদের ভাগ্যে সর্বনাশ ঘনিয়ে আসছে, উপনিবেশ-উত্তর দেশগুলোর কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? বিষয়টা ভাবলে দৃষ্টিসীমায় একটা অশনিসংকেতই যেন ভেসে ওঠে। দ্বীপদেশগুলোর অস্তিত্বের সংকট তাদের চরম কোনো জবাবের পথেই ঠেলে দিতে পারে। অবশিষ্ট বিশ্বকে আরও জরুরি ভিত্তিতে নীতিগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য করতে তারা কোনো ধরনের হুমকির আশ্রয় নিতে পারে এমন ভাবনা খুব অস্বাভাবিক হবে না।

লেখক : কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

‘ফরেন পলিসি’ থেকে অনূদিত

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত