রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আরও ৭০ বছর সৌদি তেলেসমাতি

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:২২ পিএম

তেল পরিমাপে যে কারণে বিদেশিদের অনুমতি

 

২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রতিদিন গড়ে ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে সৌদি আরব, যা দেশটির জন্য একটি রেকর্ড মাত্রা। প্রতিদিন এই পরিমাণ তেল তুললেও সৌদি আরবের তেলের রিজার্ভ শেষ হতে আরও ৭০ বছর লাগবে।

তেল থাকলেও, তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সৌদি আরব। কারণ তাদের সংরক্ষিত তেল এক দিন শেষ হয়ে যাবেই। এ কারণে ভিশন-২০৩০ নামের একটি লক্ষ্যমাত্রা তৈরি করেছে দেশটি। এই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ আসবে কোথা থেকে?

ভিশন-২০৩০-কে বাস্তব করার জন্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘আরামকো’র শেয়ার বিক্রি করার পরিকল্পনা করে সৌদি আরব। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শেয়ার বিক্রির জন্য স্বচ্ছতা বাড়াতেই বিদেশি নিরীক্ষকদের দিয়ে তেল রিজার্ভের তথ্যটি প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। আরামকোর শেয়ারের ৫ শতাংশ বিক্রি করলেই মিলবে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপুল অর্থই হতে পারে লক্ষ্য অর্জনের মোক্ষম অস্ত্র।

শেয়ারবাজারে আরামকোর শেয়ার ছাড়ার ঘোষণাকে বিশ^জুড়ে বিনিয়োগকারীরা এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ঘোষণার পর থেকেই সৌদি আরামকো নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে বিশে^র বড় স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য অত রাখ-ঢাকের মধ্যে ছিলেন না। তিনি রীতিমতো টুইট করে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আরামকো যেন নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা লন্ডন, নিউইয়র্ক, টোকিও এবং হংকংÑ এই সব কয়টি শেয়ারবাজারকেই বিবেচনায় রেখেছেন।

তেল মোক্ষম অস্ত্র

ইরাক, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ এবং রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা ও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ ইত্যাদি কারণে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার কথা ছিল। এতে নিঃসন্দেহে ধস নামত মার্কিন ও ইউরোপীয় অর্থনীতির। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে সৌদি সরকার বিশ^বাজারে তেলের বন্যা বইয়ে দিয়ে তেলের দরে ধস নামিয়েছে। তেলের বর্তমান দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারেরও নিচে নেমে এসেছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর।

ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে সৌদি পলিসি ব্যর্থ হওয়ায় ইরান ও রাশিয়ার ওপর প্রচ- ক্ষেপে গিয়েছিল সৌদি আরব। তাই এই দেশ দুটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে এবং মার্কিন ও পশ্চিমা বিশে^র অর্থনীতি চাঙা করতে, লাতিন আমেরিকায় ভেনিজুয়েলার প্রভাব ক্ষুণœ করে মার্কিন প্রভাব বাড়াতে বিশ^বাজারে তেলের বন্যা বইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সৌদি আরব। সৌদি আরবেরও এতে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু বিশ^ তেল বাজারে সৌদি আরবের ভূমিকা যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো। সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি হলেও রিজার্ভ ডলার দিয়ে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা সৌদি আরবের আছে। তাই নিজের ক্ষতি করে হলেও শত্রুদের শায়েস্তা করতে চায় সৌদি আরব। আর এ ক্ষেত্রে তার প্রধান ও একমাত্র অস্ত্র তেল।

image

আরামকো

সৌদি আরামকো শুধু বিশে^র সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানিই নয়, দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোম্পানিটির চেয়ে এটি বহু গুণ বড়। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আরামকোর তেলের রিজার্ভ হচ্ছে এ মুহূর্তে ২৬৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ব্যারেল। আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা মার্কিন কোম্পানি এক্সনের তেলের রিজার্ভ হচ্ছে ১৩ বিলিয়ন ব্যারেল। বাজার মূল্যের হিসাবেও সৌদি আরামকোর ধারে-কাছে নেই কেউ। বর্তমানে কোম্পানিটির বাজার মূল্য হচ্ছে অন্তত তিন ট্রিলিয়ন ডলার (এক ট্রিলিয়ন মানে এক লাখ কোটি)। দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যাপলের বাজার মূল্য হচ্ছে ৮৭৬ বিলিয়ন ডলার। আর গুগলের পেরেন্ট কোম্পানি অ্যালফ্যাবেটের বাজার মূল্য ৭৫৫ বিলিয়ন ডলার।

সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের অনুমতিতে ১৯৩৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন কোম্পানি ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ক্যালিফোর্নিয়ার একদল ভূতত্ত্ববিদ এসে নেমেছিল সৌদি আরবের পারস্য উপসাগর তীরের বন্দর জুবেইলে। সেখান থেকে মরুভূমির ভেতর দিয়ে শুরু হয় তাদের। এরপর বাকিটা ইতিহাস।

সৌদি আরব আর মার্কিন কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মধ্যে চুক্তির পথ ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি (আরামকো)। সৌদি সরকারকে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড ছাড়াও আয় অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করে আরামকো। এতে সৌদি আরবের কিছু এলাকায় তেল অনুসন্ধানের একচেটিয়া অনুমতি পেয়ে ১৯৩৮ সালে দাহরানের কাছে দাম্মাম তেল ক্ষেত্র আবিষ্কার করে প্রতিষ্ঠানটি।

১৯৫০ সালে সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ আরামকো জাতীয়করণের হুমকি দিলে আরামকো তাদের লভ্যাংশ সৌদি সরকারের সঙ্গে আধাআধি ভাগ করতে রাজি হয়।

১৯৭৩ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়ায় সৌদি আরব সরকার আরামকোর ২৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে নেয়। পরের বছরই কোম্পানিটিতে সৌদি সরকারের মালিকানা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ শতাংশে। আশির দশক নাগাদ পুরো কোম্পানিকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসে সৌদি আরব।

image

তেলের চেয়ে হজে আয় বেশি

প্রতিবছর হজ করার জন্য সারা বিশে^র মুসলিম দেশগুলো থেকে লাখ লাখ মুসল্লি জমায়েত হন সৌদি আরবের মক্কায়। বিবিসির ফার্সি বিভাগীয় সাংবাদিক আলী কাদিমি এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, তেল বিক্রি করে সৌদি আরবের যা রোজগার হয়, তার চেয়েও বেশি আয় হয় হজ থেকে।

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মুসলিমজাহানের সবচেয়ে বড় জমায়েত হজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি দেশ থেকে কত মানুষ হজে আসবে, তার একটা কোটা নির্ধারণ করে দেয় সৌদি আরব। হজ পালন করতে গিয়ে বিদেশিরা দেশটিতে যে খরচ করেন, তার একটি বড় অংশ যোগ হয় সৌদি আরবের অর্থনীতিতে। ২০১৭ সালে হজ থেকে সৌদি আরবের সরাসরি রোজগার হয়েছিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। সৌদি আরবে যাওয়া তীর্থযাত্রীরা ২৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন সেখানে। মক্কার চেম্বার অব কমার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাইরের দেশ থেকে আসা মুসলমানরা মাথাপিছু ব্যয় করেন ৪ হাজার ৬০০ ডলার আর স্থানীয়রা মাথাপিছু প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার ব্যয় করেন। হজে একটা নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়া গেলেও, মক্কায় উমরাহ পালন করা যায় সারা বছর। প্রতিবছর দেশটিতে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ লোক উমরাহ পালন করতে যান। নানা দেশ থেকে যারা সৌদি আরবে যান, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশের উদ্দেশ্যই থাকে উমরাহ পালন করা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত