রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

১৬ই ডিসেম্বর পায়ে পায়ে ১৬ কিলো

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:৩৯ এএম

পাঁচ ছাত্র বিজয় দিবসে দেশটাকে হেঁটে  দেখতে বেরুলেন। সবাই চট্টগ্রামে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েন। গত  বছরের ১৬ ডিসেম্বর ১৬ কিলোমিটার বেড়ানোর গল্প শোনাচ্ছেন কামরুল হাসান রায়হান

২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বরের কথা, বিজয় দিবসের আগের দিন সন্ধ্যায় ফেইসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করছি। হঠাৎ অভিযাত্রী ও পর্বতারোহীদের সংগঠন ‘রোপ ফোর’-এর মহিউদ্দিন মহি ভাইয়ের একটা পোস্ট দেখলাম। তিনি লিখেছেন, বিজয় দিবসে দেশটিকে নতুন করে চেনার জন্য ১৬ কিলোমিটার হাঁটা হবে। আমাদের ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব’-এর ফেইসবুক গ্রুপে সঙ্গীর খোঁজে পোস্ট দিলাম। ভ্রমণের নাম দেওয়া হলো ‘সেন্ট্রাল ফিল্ড টু আইআইইউসি।’ চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল ফিল্ড থেকে আমরা যাব ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চিটাগাংয়ে। পুরোটাই অবশ্য হেঁটে। কয়েকজন নক করল। নম্বর নিয়ে ফোনও করল। জোগাড় হলো পাঁচ অভিযাত্রী। চারজন আবার ব্যাচমেট, তিনজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের, দুজন এক বিভাগের! আমি কামরুল হাসান রায়হান ও মাহমুদ জুনায়েদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের, মাজহারুল ইসলাম সায়মন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র। ইকবাল মাহমুদ জুয়েল ‘আইআইইউসি’র ছাত্র। বাকিজন সিনিয়র বিশ্ববিদ্যালয়েরই হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আরিফুল ইসলাম।

আলোচনার পর ঠিক হলো, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে সকাল ৮টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পরিবহনকারী শাটলে চড়ব। সকালে এসে সবাইকে পাওয়া গেলেও আমাদের প্ল্যাটফরম খুঁজে না পেয়ে জুয়েল ট্রেনে উঠতে পারল না। আধঘণ্টা পর বাসে চেপে ক্যাম্পাসে এলো। আর জুনায়েদ ক্যাম্পাসের পাশে থাকে বলে সিএনজি অটোরিকশায় ক্যাম্পাসে এলো।

আমাদের এই ক্যাম্পাসের একেবারে উত্তরে সেন্ট্রাল ফিল্ড। বিশাল বড় এই মাঠটাতে সারা বছর নানা খেলাধুলা হয়। মাঠের পাশে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি। পাহাড় থেকে আমরা তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ফলফলাদি আনতে দেখি। এখানে এসে প্রথমেই আমরা ব্যাগের ভেতর থেকে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, হাফ প্যান্ট ও টি-শার্ট বের করে পরে ফেললাম। কারো পায়ে স্যান্ডেল, কারো পা খালি। তাহলে চলতে সুবিধা হবে। পরনের প্যান্ট, শার্ট ও শীতের পোশাকগুলো চলে গেল ব্যাগের ভেতরে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে চলতে শুরু করলাম আমরা। ঠিক হলো, সেন্ট্রাল ফিল্ড থেকে হেঁটে প্রথমে মুরগির ফার্মে যাব। এটি নতুন এলাকা, আগে কোনো দিন আসিনি। ফলে মোবাইলে সেভ করা গুগল ম্যাপস অ্যাপস থেকে মানচিত্র দেখে চলছি। পথের দুপাশের দৃশ্য আমাদের সব ভুলিয়ে দিল। দুপাশে পাহাড়, তাতে সবুজের সারি; পাকা ধানের রাশি দুলছে ক্ষেতে; তারই মধ্যে চলেছি আইল পথে।

শহরে বড় হওয়া পাঁচটি তরুণের সবারই এ দৃশ্যগুলো অপরিচিত। অনেকটা পথ হেঁটে বেড়ানোর পর গুগল ম্যাপ বলল, সামনে হাটহাজারী মুরগি ফার্ম। ততক্ষণে চোখের সামনে ঝিরিপথ দেখা দিয়েছে। আর থামায় কে? আইল পথে অনেক মাঠের ফসলের কাঁটা ঢুকেছে পায়ে। ফলে পাহাড়ি ঠা-া পানি ছুঁতেই পা হয়ে সেটি পৌঁছে গেল মগজে। আমাদের এ পথেই হাঁটা শুরু হলো। ছবি তুলছি, খালি পায়ে একে একে হাঁটছি। মনের খুশিতে সাইমন গান শুরু করল। আরিফ ভাই ব্যস্ত আমাদের আনন্দের ভিডিও ধারণে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, জুয়েল ঝিরির ওপরে উঠে ক্ষেতের মুলা কুড়াচ্ছে। ঝিরিতেও অনেক মুলা পড়েছিল। সে বলছে, বাসায় নিয়ে যাবে। আমরা হাসতে হাসতে মরি! হাঁটতে হাঁটতে খুব খিদে লেগে গেল। আরিফ ভাই ব্যাগ থেকে হালকা খাবার বের করলেন। চারজনে মিলে খেয়ে নিলাম। জুয়েলকেও অনেক জোর করলাম। কিন্তু সে খেল তার কুড়ানো মুলা। এরপর চলে এলাম ওয়াইয়ের মতো দেখতে এক জায়গায়। নাম তো জানি না। ফলে সেখান থেকে ভুল পথে চলে এলাম। আসলে সঠিক পথেই ছিলাম, তবে উল্টোদিকে। ভুল মনে হলো, নেমে গেলাম আবার ঝিরিপথে। এক জায়গায় দেখি, সেখানে হাজারো পাহাড়ি গাছ কেটে ফেলে রেখেছে চোরাকারবারিরা। বনের গভীরে হওয়ায় জায়গাটির নাম জানি না।

বনাঞ্চল ধ্বংসের এ দৃশ্য আমাদের মনকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করল। প্রতিবাদ হিসেবে আমরা চোরাকারবারিদের সঙ্গে কথা বলতে গেলাম। তবে দেখেই তারা দ্রুত সামনে এসে বলল, আপনারা এখান থেকে সরে যান। না হলে বিপদ হবে। চলে আসতে হলো। সামান্য গিয়ে এক চাষির দেখানো পথে ঝিরি ছেড়ে পাহাড়ি পথ ধরলাম। পথের দুধারে উঁচু পাহাড়। ততক্ষণে দুই ঘণ্টা হেঁটে ফেলেছি। অনুমান করলাম সীতাকু-ে চলে এসেছি। কিছুদূর এগোতে ন্যাড়া পাহাড় দেখতে পেলাম। তাতে পাহাড়ের মানুষরা জুম চাষ করে। গাছপালা নেই। ক্লান্ত হয়ে চাষিদের মাচায় বিশ্রাম নিলাম। পরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এক পাহাড়ের ওপরে উঠলাম। পাহাড় চূড়া থেকে আবছা চোখে পড়ছে, দূরে বিন্দুর মতো বঙ্গোপসাগরে জাহাজ চলছে। আমাদের নামার পালা শুরু হলো। আস্তে আস্তে হেঁটে ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে চলে এলাম।

ততক্ষণে লোকালয় আমাদের পেয়ে বসেছে। মানুষগুলো অবাক হয়ে ভাবছে, এরা কারা? গায়ে মাকড়শার জাল, গাছের কাঁটা, ধুলোবালি? তাদের অবাক চোখ আমাদের নামিয়ে দিল পুকুরে। গোসল সেরে আবার সাধারণ মানুষ!

মোবাইলের অ্যাপসে জানলাম, চার ঘণ্টা ১৬ মিনিটে আমরা ১৬ কিলোমিটার হেঁটেছি। নিজের দেশটাকে বিজয় দিবসে নতুন করে দেখেছি। ট্যুর শেষে মহি ভাইকে ছবি পাঠালাম। তিনি রোপ ফোর গ্রুপে আমাদের ছবি আপলোড করে স্বীকৃতি দিলেন।

                                                                                                                                                                   -অনুলিখন : রবিউল হোসাইন

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত