সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পানি সংকটে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৮ পিএম

চলছে বোরোর চারা লাগানোর ভরা মৌসুম। মূলত আমাদের দেশে এখন বোরো, আমন ও আউশের চাষাবাদের ওপর মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদই মুখ্য। মূলত দেশের মোট খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ জোগান আসে বোরোর বদৌলতে। বোরোর চাষাবাদ পুরোটাই সেচনির্ভর। আর এই সেচনির্ভর বোরো চাষাবাদে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার ভূমিকাই বেশি। যদিও এখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপরই সেচভিত্তিক চাষাবাদ অনেকাংশেই নির্ভরশীল। তবু নদীর পানি ও বৃষ্টির পানির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘সেচ কার্যক্রমের শুরুতেই বাদ পড়েছে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটি খুবই উদ্বেগের। খবরে বলা হয়েছে, এবারও ভয়াবহ পানির সংকটে পড়েছে তিস্তা। পানি সংকটের কারণে রংপুর ও দিনাজপুরের ছয়টি উপজেলাকে বাদ রেখে সেচ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এ দুই জেলায় প্রায় অর্ধলক্ষ হেক্টর জমি সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিস্তা ব্যারাজ কর্র্তৃপক্ষ বলছে, এবার তিস্তার পানি দিয়ে শতভাগ সেচ দেওয়া সম্ভব হবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, প্রতিবছর ১৫ জানুয়ারি থেকে বোরো মৌসুমে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে সেচ কমান্ড এলাকায় প্রায় ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এ বছর সেচ সুবিধা পাবে মাত্র ২৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি। এই সেচ কমান্ড এলাকার মধ্যে মাত্র চার হাজার কৃষক এই সেচ সুবিধা পাবেন। কারণ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ ছিল দুই হাজার কিউসেক। অথচ গত ২০ জানুয়ারি সে পানি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক হাজার কিউসেকের নিচে। ফলে তিস্তার ভাটিতে এখন শুধু ধু-ধু বালুচর।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প এলাকায় সেচ দেওয়া এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে ২০ হাজার কিউসেক পানি থাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে সেচকার্য পরিচালনার জন্য ১৪ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন পড়ে। অথচ ভরা সেচ মৌসুমে সেখানে পানি এক হাজার কিউসিকের নিচে নেমে গেছে। তাহলে সহজেই অনুমেয়, পানির অভাবে সেচকার্য ব্যাহত হবেই। হয়েছেও তাই। এরই মধ্যে দুই জেলায় ছয় উপজেলাকে সেচকার্যের বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে। কী ভয়ংকর অবস্থা! যেখানে আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হয় খাদ্যভা-ারখ্যাত উত্তরাঞ্চলের বোরোর চাষাবাদ থেকে। সেখানে রংপুর ও দিনাজপুর দুই জেলার ছয় উপজেলায় সেচের সুযোগ না থাকায় অর্ধলক্ষ হেক্টর জমি সেচ কার্যক্রম থেকে বাদ দিয়ে নীলফামারী জেলার ডিমলা, জলঢাকা, নীলফামারী সদর, রংপুরের তারাগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া উপজেলাকে সেচের আওতায় রাখা হয়েছে। তবে, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এও বলেছে, উজানের পানির প্রবাহ পাওয়া গেলে বাদপড়া উপজেলাগুলোকে সেচের আওতায় আনা হবে।

আশা করতে দোষ নেই, তবে এ মুহূর্তে উজানের পানিপ্রাপ্তির পরিমাণ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে না এলে চারা রোপণের সময় পেরিয়ে যাবে। সময় শেষে পানি এলে চারা লাগানো সম্ভব হবে না। অথচ পানির অভাবে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমি চাষের বাইরে থাকার অর্থই হচ্ছে ধানের উৎপাদন কম হওয়া। আর ধানের উৎপাদন কম হওয়ার অর্থ খাদ্যঘাটতি হবে। যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের চাষের জমির পরিমাণ জমি বাড়ানো উচিত, সেখানে পানির অভাবে সেচের আওতাভুক্ত বিপুল পরিমাণ বাদ পড়ে যাচ্ছে। এ জন্য তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি হওয়া একান্ত জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ভারত সরকার যুগের পর যুগ অতিবাহিত হলেও পানির অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে।

তিস্তা অববাহিকায় ৮ হাজার ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে। আর সমতল ভূমিতে তিস্তা অববাহিকার পরিমাণ ৪ হাজার ১০৮ বর্গকিলোমিটার। যার প্রায় অর্ধেক অংশ পড়েছে বাংলাদেশের সীমানায়। এখন দুই দেশই পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য নদীর ওপর ও আশপাশে ব্যাপক অবকাঠামো তৈরি করেছে। যেখানে ভারত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ও সেচকার্যে তিস্তার পানি ব্যবহার করছে, সেখানে বাংলাদেশ অংশে প্রয়োজনীয় পানির অভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক খাদ্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা তিস্তা পারের মানুষ। খুবই কাছাকাছি থেকে তিস্তা অববাহিকার প্রকৃত চিত্র প্রায় সময়ই দেখার সুযোগ পাই। তিস্তার অবস্থা দেখে কষ্ট হয়। ফলে সুযোগ পেলেই বাস্তব অবস্থার নিরিখে দু-চার কথা লেখার চেষ্টা করি। কিন্তু যা আর তাই, কাজের কাজ কিছুই হয় না। অবশ্য সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। সরকারের তরফেও কূটনৈতিক তৎপরতা চলে সত্য, কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলে না। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ইলিশ এলে তিস্তার পানি যাবে। ইলিশের দেখা মুখ্যমন্ত্রী ঠিকই পেয়েছেন, কিন্তু তিস্তার পানির দেখা আমরা পাইনি। এখন মনে হয়, দিদি হয়তো রসিকতা করেই সে কথা বলেছিলেন!

শুধু পানির অভাবে সেচকার্যই ব্যাহত হয় তা-ই নয়, তিস্তা নদীর অববাহিকায় ৫ হাজার ৪২৭ গ্রামে বসবাসরত মানুষজন তাদের জীবন-জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষের নদীকেন্দ্রিক রুটিরুজিও কমে গেছে অনেক আগেই। এখন নদীকেন্দ্রিক মানুষরা বেঁচে থাকার তাগিদে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাপ-দাদার চিরচেনা পেশা ছেড়ে ওদের গন্তব্য এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই। নদীকে ঘিরে রুটিরুজির মানুষদের দুঃসময় এখন শুধু তিস্তাতেই সীমাবদ্ধ নেই। উজান থেকে প্রবাহিত অভিন্ন প্রতিটি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশের মানুষ এখন বঞ্চিত। ফলে ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার বিরূপ প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি শাখা নদ-নদী এখন মরাখালে পরিণত হয়েছে। নদীতে পানি নেই, মাছ নেই। দেশি মাছের এখন বড়ই আকাল। যদি ভাগ্যগুণে মাছের দেখা মেলে, তার পরিমাণও কম, দামও বেশি। যা কেনার সামর্থ্য অধিকাংশ মানুষের নেই। অথচ মাছে ভাতে বাঙালির সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। ভাত জুটলেও মাছ জোটে না। যে মাছ জোটে, সে মাছে বাঙালির তৃপ্তি আসে না।

এত সব হারিয়ে যাওয়ার মূলেই হচ্ছে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার ঘাটতি। আমরা এ অন্যায্য অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি চাই। সব ক্ষমতাসীনই স্বপ্ন দেখান, আশ্বস্ত করেন। কিন্তু সময় গড়িয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পানির ন্যায্য হিস্যার দেখা মিলছে না। আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, তা শুধু ক্ষমতাসীনরাই ভালো বলতে পারবেন। আশার কথা, সদ্য শপথ নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। ভালো একটা ফল পাব। তবে আমরা চাই, পানির ন্যায্য হিস্যা। সে হিস্যা আদায়ে প্রয়োজনবোধে সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। যদি আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমার ন্যায্য পাওনা আদায় করা সম্ভব হয়, তাহলে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে বাধা কোথায়?

ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের আশ্রয় ও সহযোগিতা অবিস্মরণীয়। যে দেশের সঙ্গে দীর্ঘ ৬২ বছরের ছিটমহল সংকটের সমাধান হয়েছে কূটনৈতিক তৎপরতায়। জটিল এসব সমস্যার সমাধান হলে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি কেন হবে না? এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। রাজি করাতে হবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিষয়টিকে অতি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় সরকারের এই মেয়াদে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে আমরা আশাবাদী। বিশেষ করে বর্তমান মন্ত্রিসভায় উত্তরাঞ্চলের আটজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। যারা উত্তরাঞ্চলকে পানির হাহাকার থেকে রক্ষায় শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবেনÑ এটাই এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি।

আবদুল হাই রঞ্জু

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও কলামনিস্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত