সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সংগীতের সেরা ছাত্রী নিটোল

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:১২ এএম

২৮ জানুয়ারি পেলেন বিভাগের সেরা ছাত্রীর সম্মাননা। তিন বছরের মধ্যে অনার্সে সর্বোচ্চ ফলাফল করা ঊর্মি ঘোষ নিটোল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন মা-বাবার অমতে। তারপর কীভাবে তার জীবন বদলে গেল? আরও কী কী অর্জন আছে? বলছেন উম্মে কুলসুম রাহী। ছবি তুলেছেন নূর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ টিএসসিতে আয়োজন করেছিল ‘সংগীত উৎসব ২০১৮’। তাতে নামকরা অনেকে গেয়েছেন। আয়োজনটি হয়েছিল এ বছরের ২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি। উৎসবের শেষ দিনে ঊর্মি ঘোষ নিটোল পেলেন অসাধারণ স্বীকৃতি। ২০১৭ সালের বিএ অনার্সের সর্বোচ্চ ফলাফলের জন্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে ‘নীলুফার ইয়াসমিন স্মারক বৃত্তি ২০১৮’ দেওয়া হলো। বিভাগের চেয়ারম্যান টুম্পা সমাদ্দার তার হাতে পুরস্কারের চেক তুলে দিলেন। অনেক কষ্টের পরে পাওয়া এই স্বীকৃতিতে খুব খুশি নিটোল। একেবারে ছোটবেলা থেকে গান গাইতে ভালোবাসেন। সে জন্যই আরও অনেক ভালো বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না নিয়ে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে সংগীতে ভর্তি হলেন। ফলে  মা-বাবা একেবারে খেপে গেলেন। ডাক্তার হওয়ার বাসনা ছেড়ে কে-ই বা সন্তানকে গায়ক হতে দিতে চান?

তবে নিটোল বললেন, ‘এই বিভাগের শিক্ষক প্রিয়াংকা গোপ ও আমার জীবনের প্রথম গানের গুরু স্বপন কুমারের ভালোবাসা ও প্রচেষ্টার ফলেই গানকে লেখাপড়ার অংশ করতে পেরেছি।’ তারপরও মা-বাবাকে বেশ কিছু মানানো যায়নি, তারা কথাও বলতে চাইতেন না। তাদের এই মেয়েটি যে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছে। এসএসসিতে অসাধারণ ফলের জন্য কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রথম বিভাগে বৃত্তি পেয়েছে। ঢাকার বিখ্যাত হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছে। এই কলেজেই মানুষ হওয়ার মানবিক পাঠ নিয়েছেন নিটোল। শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও পড়ালেখার ভালো পরিবেশ তাকে জীবনবোধ ও নিয়মতান্ত্রিকতা শিখিয়েছে। ভালো ছাত্রী হিসেবে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস অ্যান্ড প্রপার্টি সায়েন্স বিভাগে ভর্তিও হয়েছিলেন। তবে ভালো লাগেনি। তারপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেন ডি ইউনিটের ৪৪৮তম হিসেবে।  

গান তার চিরকালের সঙ্গী। ছোটবেলা থেকেই গাইছেন। জাতীয় শিশুশিল্পী অন্বেষণ প্রতিযোগিতা নতুন কুঁড়ির শিল্পী ছিলেন। কয়েকবার বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। জাতীয় পর্যায়েও নাম করেছেন। গানের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই নিটোলের সংগীতে পড়া। তার বিষয় ছিল ‘শাস্ত্রীয় সংগীত’। কেন কঠিন এই বিষয়কে বেছে নিলেন? নিটোলের উত্তর, ‘শাস্ত্রীয় সংগীতে সৃজনশীলতার সুযোগ ও স্বাধীনতা বেশি।’ আর সব ছাত্র-ছাত্রীর মতো তিনিও প্রথম বর্ষে খুব উৎসাহ নিয়ে লেখাপড়া করতে শুরু করলেন।

বিভাগের লেখাপড়ার মান যথেষ্ট ভালো হলেও পড়ালেখায় মন বসাতে পারলেন না। তিনি রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। হলের পরিবেশ তো ভালো নয়। সারা জীবন ভালোভাবে থেকে আসা মেয়েটির মন ভেঙে গেল। ফলে ভবিষ্যতের চিন্তায় আকুল হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে হতাশায় ডুবতে শুরু করলেন। তবে এই হতাশাগুলো বেশি দিন থাকেনি। সেজন্য অবশ্য প্রিয়াংকা গোপের কথাগুলো খুব কাজে দিয়েছে। একদিন অসুবিধাগুলো জানার পর তার এই শিক্ষক বলেছিলেন, ‘নিজেকে এমনভাবে যোগ্য করে গড়ে তোলো, যাতে নিজের যোগ্যতাই তোমাকে লক্ষ্যে পৌঁছায়।’ এই একটি কথাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। আরে আমি তো খুব ভালো ছাত্রী, আমি কেন হেরে যাব? কেন পৌঁছাতে পারব না জীবনের শিখরে? আবার লেখাপড়ায় মনোযোগ পুরো ঢেলে দিলেন। সেটির ফলাফল হলো দারুণ। প্রথম বর্ষ থেকে অনার্সের শেষ বর্ষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে তিনি সবচেয়ে বেশি নম্বর নিয়ে পাস করেছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে এই বিভাগের একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের হাত থেকে তিনি বিভাগের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক’ গ্রহণ করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে গবেষণাও আছে তার। অনার্সের শেষ বর্ষে তিনি ‘স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা ও বিকাশে শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠীর ভূমিকা’ শীর্ষক গবেষণা করেছেন।

কেবল লেখাপড়া নিয়ে মেতে থাকেননি ঊর্মি ঘোষ নিটোল। অনেক কাজে জড়িয়েছেন। ঢাকার কাঁঠালবাগান এলাকায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কিছু পথশিশুকে মাস কয়েক সাধারণ জ্ঞানের পাঠ দিয়েছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ)’র তরুণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়া ‘ইয়েস গ্রুপ’র দলনেতা ছিলেন নিটোল। তারা হলের ছাত্রীদের দুর্নীতির বিপক্ষে সচেতন করেছেন, টিআইবির নানা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। এই সংগঠনে কাজ করেই সৎ মানুষ হিসেবে জীবনযাপনের প্রেরণা পেয়েছেন তিনি। টিআইবির আরেকটি সংগঠন ‘ঢাকা ইয়েস থিয়েটার’। টানা চারটি বছর তিনি এই সংগঠনের সদস্য হয়ে বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতিবিরোধী পথনাটকে অভিনয় ও গান করেছেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতে ‘প্রথম রবীন্দ্র ভারতীয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সংগীত উৎসব’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। তখন তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের হয়ে রবীন্দ্র ভারতী বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা ১০ জন ছিলেন। সাংস্কৃতিক আয়োজনে নৃত্য ও গান পরিবেশন করেছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ১৩ জন ছাত্র-ছাত্রীর একজন হিসেবে তিনি গিয়েছেন চীনে। ২০১৭ সালে হয়েছিল এই ‘ফার্স্ট চায়না বাংলাদেশ ইয়ুথ ক্যাম্প’। চীনে গিয়ে বিভিন্ন আয়োজনে দেশকে তুলে ধরেছেন, সেই দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। গত বছর গিয়েছিলেন তাইওয়ানে। জার্মানির বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ‘টিআই’ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিয়েছিল। সেটির মাধ্যমে ইয়ুথ অ্যাম্বাসেডর’ বা ‘তরুণ রাষ্ট্রদূত’ নির্বাচন করা হয়েছিল। সাড়ে ছয় হাজার ইয়েস সদস্য তাতে অংশ নিয়েছিলেন। সেরা দুইজন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নিটোল ছিলেন একজন। সেই আসরের নাম ছিল ‘জি-১৪ রুইবিন আর্টস ক্যারেক্টার অ্যান্ড এডুকেশন ক্যাম্প-২০১৮’। এই কর্মশালা ১৫ দিন চলেছিল।

অসাধারণ ফলাফলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) নিটোলকে ‘সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ ক্যাম্প’র অংশগ্রহণকারী হিসেবে মনোনীত করেছে। তিনি ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের ঝাড়খন্ডের পত্নি রবিশঙ্কর শুল্কা ইউনিভার্সিটিতে থাকবেন। সেখানে নানা আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করবেন তারা পাঁচজন। ইংরেজি, বাংলা তো জানেনই, নিটোল ফ্রেঞ্চ ভাষায়ও পারদর্শী।

তিনি এখন মাস্টার্সের ছাত্রী। যে নিলুফার ইয়াসমিন স্মারক বৃত্তি পেয়েছেন, সেই বৃত্তির টাকাগুলো কীভাবে খরচ করবেন? নিটোল হেসে দিলেন, ‘একুশের বইমেলা থেকে অনেকগুলো বই কিনব। সেগুলো আস্তে আস্তে পড়ব। আর একদিন দুপুরে আমাদের ক্যাম্পাসের পথশিশুদের দাওয়াত করে খাওয়াব।’ অবসরে বই, গান তার সঙ্গী। ঘুরতেও ভালোবাসেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের ছাত্রী হলেও নানা গায়কের গান শুনতে ভালো লাগে।

মায়ের মতো শিক্ষক হয়ে জীবন কাটাবেন তিনি। বিভিন্ন দেশের সংগীত উৎসবে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে তার। সংগীত গবেষক হবেন, সংগীতে আরও উচ্চতর শিক্ষা নেবেন। জীবনের স্বপ্ন? ঊর্মি ঘোষ নিটোলের উত্তর, ‘আদর্শ শিক্ষক হয়ে ভালো মানুষ গড়ে তোলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৃজনশীল ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করাই আমার লক্ষ্য।’     

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত