শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫১ এএম

সুখের আশায় দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে যাওয়া বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের সে দেশের নিয়োগকর্তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর মাঝেমধ্যেই আসে। অভিযোগ উঠেছে, দেশটির রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সেইফ হোমও এখন তাদের জন্য সেইফ নয়। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কফিলের (নিয়োগদাতা) বাড়িতে যেসব নারী নির্যাতনের শিকার হন, তাদের নতুন কাজ দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশেরই কয়েকটি সিন্ডিকেট বাধ্য করছে যৌন ও ভিক্ষাবৃত্তির মতো কাজে। গর্ভপাতের জন্যও রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে বাংলাদেশি নারীদের। এই নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে যারা দূতাবাসের সেইফ হোমে আশ্রয় নিচ্ছেন তাদেরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে। কারণ সেইফ হোমের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাদের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন করছে। সেইফ হোমে পালিয়ে আসা নারীদের যখন-তখন গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি এক কর্মকর্তাকে সরিয়েও দেওয়া হয়েছে। দেশ রূপান্তরকে কয়েকজন ভুক্তভোগী বলেছেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সৌদিদের নির্যাতন সইতে না পেরে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা যাদের কাছেই যাচ্ছেন তাদের কাছেই একই অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছেন।

গত ২৮ অক্টোবর রিয়াদে দূতাবাসের সেইফ হোমে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার অভিযোগ চিরকুটে লিখে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই আত্মহত্যার চেষ্টা চালান এক তরুণী। সৌদি ফেরত ওই তরুণীর এ ঘটনায় ৩ সেপ্টেম্বর দুই কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে দূতাবাস কর্র্তৃপক্ষ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুত করা হয় তাদের। ওই তরুণীর ভাষ্যমতে, দূতাবাসের সেইফ হোমে বাংলাদেশি নারীদের সঙ্গে অনেক খারাপ কাজ করা হয়। তাদের বাঁচাতে দূতাবাস কর্র্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার অনুরোধও তিনি জানান চিরকুটে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৌদি প্রবাসী দুজন সাংবাদিক সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, মাস ছয়েক আগে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে এক নারী সেইফ হোমে আত্মহত্যা করেন। বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শঙ্কায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেয় দূতাবাস কর্র্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দূতাবাসের প্রেস কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম ‘জিনের আছরের’ দোহাই দেন। গত ২৬ জানুয়ারি দেশ রূপান্তকে তিনি বলেন, ‘ওই নারী মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে আত্মহত্যা করেন। তার ওপর জিনের আছর থাকতে পারে। আগেও সে কয়েকবার ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল।’  

সরকারের জনশক্তি রপ্তানিকারক ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সর্বশেষ তথ্যমতে, সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিক আছে প্রায় সাড়ে ৩৬ লাখ। তাদের মধ্যে নারী প্রায় ৩ লাখ। নির্যাতনের শিকার হয়ে গত চার বছর সাড়ে ছয় হাজার নারী ফেরত এসেছেন। এর মাঝে গত বছর দেশটিতে গেছেন সাড়ে ৭৩ হাজার নারী শ্রমিক। এদিকে এ বছর এরমধ্যে ফিরে এসেছেন চার শতাধিক নারী। ফেরার অপেক্ষায় সেইফ হোমে আছেন আরও ৫ শতাধিক।  অভিযোগ রয়েছে, সৌদিতে নিপীড়নের মুখে গত ২০ জানুয়ারি দেশে ফেরত আসেন ৯১ নারী শ্রমিক। তাদের অনেকেই সেইফ হোমে শারীরিক ও যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাদের একজন দিনাজপুরের মিতা (ছদ্মনাম) দেশ রূপান্তরকে বলেন, কফিলের বাসায় যে নির্যাতন তারচেয়ে বেশি হয় দূতাবাসে। তার ভাষ্যমতে, কেউ সেইফ হোমে এলে সঙ্গের জিনিসপত্র নিয়ে নিতেন দূতাবাসের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মহিউদ্দিন আহমেদ। পরে চাইলে মারধর করতেন। তিনি বলেন, ‘সাবান-তেল কিছু নেই। খাবারও দেয় না ঠিক মতো। মাইয়াদের গায়ে যখন-তখন হাত দেয় ব্যাটারা। এক কাপড়ে থাকতে হয়। কত মাইয়্যার জীবন যে নষ্ট করতাছে আর কী কব?’ প্রায় একই তথ্য দেন কেরানীগঞ্জের এক নারী। বলেন, ‘বাংলাদেশিসহ সৌদি আরবের সব পুরুষই মেয়েদের সাথে কুত্তার মতো আচরণ করে। অ্যাম্বাসির কয়টা পোলা আছে হ্যারা সুন্দরী মাইয়্যা দেখলেই ফুসলাইতে থাকে। সেগুলা লজ্জায় কইতে পারুম না।’  

রিয়াদে কর্মরত এক বাংলাদেশি সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দূতাবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। প্রায় প্রতিদিন অভিযোগ আসে। অনেক নারী ফোন করে কান্নাকাটি করেন। আমরা দূতাবাসের কাছে জানতে চাইলে মুখ খোলেন না কর্মকর্তারা। উল্টো হুমকিও দেন সৌদি ছাড়া করার। এতে অনেক সাংবাদিক ভয় পেয়ে এসব বিষয় এড়িয়ে চলেন।

তার দেওয়া তথ্যমতে, দূতাবাসের সেইফ হোমের বাইরে বাংলাদেশেরই কয়েকটি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ব্যাপক যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন নারীরা। এসব সিন্ডিকেট যেসব নারী নিয়োগকর্তার বাসায় নির্যাতনের শিকার তাদের টার্গেট করে। এরপর তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ভালো কাজের প্রলোভন দেয়। তাদের এই ফাঁদে যারা পা দেন তাদের বাড়িতে আটকে যৌনবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। নরসিংদীর জালাল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি এরকম একটি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানান ওই সাংবাদিক। বলেন, রিয়াদের একটি হাসপাতালে কর্মরত জালাল নিজের বাসায় মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসা করছেন। সাংবাদিকরা খোঁজ নিতে চাইলে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন তিনি। এছাড়া বোরকা পরিয়ে নারীদের ভিক্ষার কাজে ব্যবহার করছে আরেকটি চক্র। যারা ভিক্ষা করতে চান না তাদের ঘরে আটকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এখন রিয়াদ ও জেদ্দার মতো বড় বড় সব শহরেই অনেক বোরকাধারী বাংলাদেশি নারী ভিক্ষুক দেখা যায়। সেখানে বাংলাদেশি যৌনকর্মীর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।

ওই দুই বাংলাদেশি সাংবাদিক দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, বাংলাদেশি নারীদের সন্ধ্যার পরপরই রাস্তার মোড়, মার্কেট ও জনাকীর্ণ এলাকায় যৌনকাজের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মাত্র এক রিয়ালে (২২ টাকা) বাংলাদেশি যৌনকর্মী পাওয়া যাচ্ছে। আর দিনের বেলায় রিয়াদের রাস্তা, বাজার, বস্তি, শপিংমলে কালো বোরকা পরিহিত বাংলাদেশি নারীদের ভিক্ষা করতে দেখা যায়। ভিক্ষার বড় একটি অংশ নারীদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় ওইসব সিন্ডিকেট।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেইফ হোমের দায়িত্বে নিযুক্ত দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) শফিকুল ইসলাম মোবাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মকর্তাদের দ্বারা নারী নির্যাতনের প্রশ্নই ওঠে না। সেইফ হোমের দায়িত্বে যেসব কর্মী আছে তাদেরও আমরা নিয়মিত মনিটরিং করি। এর আগে দুয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। তাদের বহিষ্কার করেছি। আপনাকে যারা এমন তথ্য দিয়েছে- তারা অনেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ।’ দূতাবাসের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মহিউদ্দিন আহমেদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে একজন নারীকে লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগ দিয়েছি।’ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এসব নারী এমনিতেই সৌদিদের হাতে ব্যাপক নিপীড়নের শিকার। তাদের আমরা দুবেলা ভাত ও এক বেলা রুটি খেতে দিই। কয়েকদিন আগেও শীতবস্ত্র দেওয়া হয়েছে। তবে যথেষ্ট বাজেট না থাকায় চাহিদা মাফিক সব কিছু দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’ বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে যৌন ও ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ অভিযোগ করেনি, অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহলে বিপদ। দূতাবাস ও শ্রম কাউন্সিলের কাজে সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটা হতে পারে। অনেক সময় লেবার উইংয়ের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতের কথা শুনতে চান না। এ বিষয়ে আরও গভীরভাবে আমাদের কাজ করা উচিত।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত