সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও জনপ্রত্যাশা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২১ পিএম

আগামী দিনে নতুন সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। একই সঙ্গে কাক্সিক্ষত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ রয়েছে। এগুলো খুবই বাস্তবসম্মত। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হবে। দ্রুত কর্মসংস্থান বাড়বে।

আমরা মনে করি, সরকারের কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু সে জন্য আরও কিছু বিষয়ে সংস্কার আনতে হবে। এর মধ্যে মেধাভিত্তিক দুর্নীতি প্রশাসন অন্যতম। জনকল্যাণমুখী সরকারের জন্য নৈতিকতা সম্পন্ন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে হবে। এর বাইরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও দূর করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এরইমধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। এর কার্যক্রমও শুরু করে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এর কিছু নজির দেখা গিয়েছে।

শিক্ষা নিয়ে প্রচুর কথা হয়। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আমি  মনে করি , শিক্ষাব্যবস্থায় একটা আমূল পরিবর্তন আনার এখনই সময়। এক্ষেত্রে কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি জোর দেওয়া যেতে পারে। আমার মতে, শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য পড়লেই হবে না। বর্তমান বিশ্বের চাহিদার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে। তাদের কম্পিউটার বেইজড, বিজ্ঞাননির্ভর আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। সবাইকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিতে হবে কেন। কর্মমুখী শিক্ষা নিতে হবে, যেন পড়ালেখা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, কার্যক্ষমতাসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। যেন শিল্প চাহিদা পূরণ করতে পারে। সিলেবাসে সে বিষয়গুলো থাকতে হবে।

দেশ ক্রমেই শিল্পের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন শিল্পমুখী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হবে কী করে। এমন শিক্ষা দিতে হবে যেন ব্যবহার উপযোগী প্রায়োগিক শিক্ষার গুরুত্ব পায়। শিল্পে এদের ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে জাতীয়ভাবে কয়েকটি ধাপে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি ছোট বাচ্চাদের (পিএসসি-জেএসসি) ওপর পরীক্ষার এই চাপটি না দিলেও চলে। পরীক্ষা হবে না তা নয়। সেটির জন্য ক্লাস মূল্যায়ন থাকবে, কোন বিষয়টি একজন খুদে শিক্ষার্থী পছন্দ করছে সেটি খেয়াল রাখবেন অভিভাবক ও শ্রেণি শিক্ষক। এরপর সে বিষয়টির দিকেই তাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিতে হবে। শ্রেণি মূল্যায়ন থাকবে, কিন্তু পঞ্চম, অষ্টম, দশম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষার কোনো মানে হয় না। যে কোনো একটি হলে ভালো হয়। একটা শ্রেণি মূল্যায়ন হবে। এর ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে পেশা উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

কারণ খুব কম বয়সে এত চাপ দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যে বয়সটা হচ্ছে খেলাধুলা, আনন্দ, হাসিখুশির মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের কথা, সে বয়সে বাচ্চাদের ওপর মানসিক চাপটা অহেতুক বাড়ানোর দরকার নেই। এটা মেধা বিকাশে সহায়ক নয়। আমার মনে হয়, এখন শিক্ষাব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন জরুরি। এখন সরকারের ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ চলছে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হবে, যা তৈরির ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় বছরে দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। এই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রায়োগিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার টার্গেট রয়েছে। অর্থাৎ মানসম্মত প্রায়োগিক শিক্ষার ওপর আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় আলাদা জোর দেওয়া হবে। ও এর ফলে কর্মমুূখী শিক্ষা গড়ে উঠবে। এখন শিল্প যে ধরনের শ্রমশক্তি চায়, সে ধরনের জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে কর্মমুখী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

আমি মনে করি, কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ তৈরি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ তৈরিতে চলমান প্রতিবন্ধকতা দূর করা, যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি সাধন করতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাণিজ্যে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টিকারী সকল ব্যবস্থা নিরসন করতে হবে। ব্যবসা শুরু করতে ভূমি সমস্যা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংযোগ পেতে ধীরতা দূর করতে হবে। আগামীতে সরকার এসব বিষয়ে অবশ্যই মনোযোগী হবে।

স্থল, জল ও আকাশ তিন পথেরই  যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। নৌপথে খরচ কম, সেটার জন্য নৌপথকে প্রসারিত করতে হরে, এটি হবে বিশ্বব্যাপী আমদানি-রপ্তানির বড় সুযোগ। এর সঙ্গে বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বড় বড় পোর্ট তৈরির জন্য বেশি জোর দিতে হবে। যদিও সরকার এ বিষয় নিয়ে যথেষ্ট ভাবছে। তারপরও আগামীতে এ বিষয়ে আরও দৃষ্টি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে আকাশপথকে উন্মুক্ত করতে হবে। যেন বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। তাহলে বিশ্ববাসী এমনিতেই ঝুঁকবে।  

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সামষ্টিক অর্থনীতির ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর একটি ধারণাপত্র তৈরির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এটি মার্চের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অবহিত করে মতামত ও পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তারপর ওই ধারণাপত্রের আলোকে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করা হবে।

আমরা সবাই বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে দেখতে চাই। যে দেশের মাথাপিছু আয় হবে ১৬ হাজার মার্কিন ডলার যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য। শিক্ষা, দারিদ্র্য, সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা যেখানে সবার জন্য নিশ্চিত হবে। সরকারের ধারাবাহিক উন্নতির ফলে এটি করা সম্ভব হয়েছে। এমন একটি দেশ দেখতে চাই, যেখানে দুর্নীতির মাত্রা একেবারে সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। দুর্নীতি কমে আসলে দেশের উন্নতি কেউ ঠেকাতে পারবে না। এজন্য দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে আইন বিভাগকে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বাধীন করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আইন ব্যবস্থা চালু করার যে চেষ্টা চলছে, সেটা বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

নতুন সরকারে অন্যতম প্রতিশ্রুতি হলো গ্রামে শহরের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শহরের সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগের  ফ্রেমওয়ার্ক থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণে বিশেষ নজর দেবে পরিকল্পনা কমিশন।

জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচনী ইশতেহারের সফল রূপায়ণ হবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। সমাপ্ত হওয়া ষষ্ঠ, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা ও প্রবৃদ্ধির উচ্চহার ধরে রাখার পরিকল্পনা থাকবে এতে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং সরকারের ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও থাকবে। নতুন পরিকল্পনাটি হবে আরও বেশি সংহত এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি সহায়ক।

আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গ্রামে শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছানোকে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মতো গ্রামগুলো সাজানো হবে। এক্ষেত্রে মানুষ একটি জায়গায় বসবাস করবে। যে যেটি করতে চায় করতে পারবে। কেউ কৃষিকাজ করবে,  কেউ মৎস্য শিকার করবে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চাইলে করবে। তাছাড়া শিক্ষার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা গ্রামে থেকেই সেই কাজ করবে। কারও পেশার ক্ষেত্রে কোনো বাধা আসবে না। ঘুচে যাবে গ্রাম ও শহরের সুবিধার পার্থক্য। এসব কর্মকা- কীভাবে করা হবে, তার বিস্তারিত থাকবে।

পরিকল্পনায় আয়বৈষম্য কমিয়ে আনা, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, উৎপাদনমুখী শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে  তোলা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো অর্জনের প্রক্ষেপণ থাকবে পরিকল্পনায়। শুধু পরিকল্পনাই নয়, তার বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য মধ্যবর্তী মূল্যায়নেরও ব্যবস্থা রাখা হবে। এই অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশকে একটি শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করবে এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক
সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য, সিনিয়র সচিব এবং গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত