মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিল্পায়ন ও আবাসনের ভবিষ্যৎ কী?

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২২ পিএম

১.
বাংলাদেশ আজ নানা বিভক্তি আর বৈষম্যে মারাত্মক চেহারা নিয়েছে। দ্রুত ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে যেমন বিশ্বে এক নম্বর, তেমনি গরিব হওয়ার ক্ষেত্রেও তিন নম্বর। আর গরিবানার হাল উত্তরের জেলাগুলোতে প্রকট আকার নিয়েছে। গোটা দেশে যেখানে গড়ে ৩০ ভাগ থেকে গরিবানা কমে ২৪ ভাগে নেমেছে, সেখানে কুড়িগ্রামে ৬৩.৬৭ ভাগ থেকে ৭০.৮৭ ভাগে অবনতি ঘটেছে।

বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও অর্থনীতিবিদ মো. আনিসুর রহমান তার ‘একুশে ও স্বাধীনতা : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ বাস্তবতা’ গ্রন্থে সংবিধানের চার মূলনীতি সম্পর্কে বলেছেন, “তবু অস্পষ্ট স্তম্ভগুলি নিয়েই জনগণের কাছে থেকে ব্যালট বাক্স ‘গণতন্ত্রের’ মাধ্যমেই ম্যানডেট নিয়ে জাতি গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এ কথা গুরুত্বপূর্ণ যে সে সময়ে জাতির মধ্যে অর্থনৈতিক ও সেই শক্তিতে সামাজিক বৈষম্য অসমাজতান্ত্রিক দেশের বৈষম্যের চেয়ে অনেক কম ছিল; আমাদের ‘বাইশ পরিবার’ ছিল না, এবং দেশের রাজনৈতিক শক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের হাতেই ন্যস্ত ছিল। তাই সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা যতই অস্পষ্ট হোক ভয়ানক একটা বৈষম্যমূলক জাতীয় আত্মপ্রকাশের চিন্তা তখনকার অধিপতি ধারার হয়তো ছিল না।”

আর এতদিন পর, ’৭১-পূর্ব বৈষম্যের মতো উত্তর ও দক্ষিণে বাংলাদেশ ভাগ হয়ে গিয়েছে। উন্নয়নের ঠেলায় গত সাড়ে তিন বছরে ২৫ হাজার জন নিহত ও আরও ৬৩ হাজার আহত হয়েছেন। তার মধ্যে উত্তরবঙ্গের মানুষই সর্বাধিক। এত ছোট দেশে এত মানুষ কীভাবে চলবে, কীভাবে থাকবেÑতা নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কল্পনা করবার সামর্থ্য আমাদের পরিকল্পকদের আছে কি না, সে এক ভাবনার বিষয়। যে ভূখণ্ড আড়াইশ বছর আগে পৃথিবীর জনবহুল দেশ থাকার পরও পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ ছিল, কেমন ছিল তার শিল্পায়ন ও নগর পরিকল্পনা, এটা না ভেবে আমরা কোনো রাস্তা নির্মাণ করতে সক্ষম হব না।

২.
সুলতানি আমলে যেমন বাংলার কৃষকরা কৃষির পাশাপাশি কারিগর ছিলেন, আজ তারা কিছুটা বদলে কারিগরের বদলে শ্রমিক হয়ে গেছেন। এক পা গ্রামে আরেক পা শহরে, কিংবা এক পা ক্ষেতে আরেক পা কারখানায়। একই কৃষক ক্ষেতে তুলা উৎপাদন করতেন, সেই তিনিই তুলা থেকে সুতা ও কাপড় তৈরি করতেন। পরাধীন আমল কৃষককে কারিগর থেকে ভিক্ষুক ও মজুরে পরিণত করল। যে নগর তুলল, সেখানে মজুরের ঠাঁই মিলল না। তাই কারখানার কাজ থেকে ছুটি মিললেই গ্রামের পথ ধরেন তারা। ব্রিটিশ আমল থেকেই শহরগুলো যেন রুজির জায়গা ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্রিটিশ-পূর্ব যুগে যেমন কারিগররা নিজ বাড়িতে থেকে কাজ করতেন, কিন্তু এখন কর্মক্ষেত্র বাড়ি থেকে বহুদূরে হওয়ায় সেটি আর নেই। ফলে তাদের থাকতে হয় ঘিঞ্জি ঘরে আর কাজ করতে হয় তাজরীন কিংবা রানা প্লাজার মতো মৃত্যুপুরিতে।

শহরে যেসব শিল্প-কারখানা থাকে, সেখানে জমির দর কৃত্রিমভাবে মারাত্মক আকারে বেড়ে যায়। যতই বাড়ুক, ঘরের ভাড়া নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বাড়তে পারে না। ফলে হাউজিং কোম্পানিগুলো এখানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে অনাগ্রহী থাকে। ফলে আবাসন সংকট ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফলে শ্রমিকদের থাকতে হয় উচ্চ ভাড়া দিয়ে নোংরা ঘরগুলোতেই। ছোট্ট ঘরে শিফটিং পদ্ধতিতে গরু-ছাগলের মতো থাকতে হয়। রাতের শিফটে যারা কারখানায় কাজ করেন তারা দিনে একই ঘরে ঘুমান, বিপরীতভাবে দিনের শিফটের কর্মীরা রাতে ঘুমান।

অথচ একজন শ্রমিক যদি নিজ বাড়িতে থেকে কারখানায় কাজ করতে পারতেন, তাহলে পুঁজিপতিদের শ্রমিকদের জন্য যে বাড়িভাড়া ও সবজির জন্য যে মজুরি দিতে হয় বলে অধিক উদ্বৃত্ত আত্মসাৎ করা সম্ভব হয় না, শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না-তখন দুটোই সম্ভব হতো। অর্থাৎ মজুরির নিয়মে তা মালিকেরই অধিক মুনাফা নিশ্চিত করত।

সুলতানি আমলে বাংলা যে পৃথিবীর তাঁতঘর হয়ে উঠেছিল, আর বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস যে বিশ্ববাজারে উন্নত পণ্যের বদলে শরীর বেঁচে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে পেছনের তরফের হয়ে, সেটাও ভালোভাবে করতে গেলে উন্নত জনশক্তি ও আবাসন সমস্যার সমাধান করেই করতে হবে।

ইউরোপে যেখানে কুটিরশিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একটির পর একটি কৃষক এলাকা আধুনিক শিল্প এলাকার মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে বাংলাদেশে উল্টো কুটিরশিল্প বিকাশ নয়, ধ্বংসের মধ্যদিয়ে তা হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমান শিল্পপতিদের মুনাফার সবটাই হলো মজুরি কেটে নেওয়া অংশ আর উদ্বৃত্ত মূল্যের সবটাই ক্রেতাকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। গার্মেন্টসসহ সকল রপ্তানিপণ্যের অসাধারণ সুলভ মূল্যের এই হলো গূঢ় কারণ।

ইউরোপে, যেখানে একজন শ্রমিকের শ্রম ছাড়া বেচবার কিছুই নাই, তাদের যখন কারখানা মালিকের পক্ষ থেকে আবাসন ব্যবস্থা করা হয়, তখন তা শ্রমিকের বার্গেইনিং ও স্বাধীনতার সামর্থ্যকে কমিয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে কারিগর-কৃষকের দেশে ব্যাপারটা উল্টো। এখানে ভূমি থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া ইউরোপের ধরনে হয়নি, ফলে শ্রমিকরা যদি বর্তমানের বাড়িটিতে অবস্থান করেই কারখানায় কাজ করতে পান, তাহলে এই বাসস্থানের নিশ্চয়তা তাকে বার্গেইনিং ও স্বাধীনতার শক্তিকে বৃদ্ধিই করবে।

তাই বাংলাদেশের শিল্পকেন্দ্রগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে আবদ্ধ না রেখে, সুলতানি আমলের মতো একেকটি শহরে একেক ধরনের শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে ওই সব অঞ্চলের অধিবাসীরা বংশ পরম্পরার সূত্রে দক্ষ হয়ে উঠবেন। কর্মক্ষেত্র নিয়ে বার্গেইনিং করতে পারবেন, স্থানান্তর সীমিত হয়ে আসবে। তখনই কেবল কর্মক্ষেত্রের মৃত্যুস্রোত রোধ করা সম্ভব হবে। অধিক কথার কী দরকার, উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের মৃত্যুর হারই তো সাবুদ হিসেবে যথেষ্ট।

লেখক : সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত