রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গালগল্পে চা-চক্র

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:৩৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে গতকাল শনিবার দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের চায়ের আমন্ত্রণ ছিল তার সরকারি বাসভবন গণভবনে। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শুভেচ্ছা বিনিময় ও চা-চক্রের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গণভবনের দক্ষিণ লনের সবুজ চত্বরে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের নিয়ে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় আড্ডা দেন শেখ হাসিনা। এ সময় তার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘পান্তা উৎসব’সহ অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি অতিথিদের শোনান তিনি; শোনেন অতিথিদের গল্পও। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুধু আড্ডাই হয়েছে চা-চক্র অনুষ্ঠানে।

প্রধানমন্ত্রীর এই আমন্ত্রণে সাড়া দেননি বিএনপিপ্রধান সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা। এর বাইরে প্রায় সব দলের নেতারাই ছিলেন অনুষ্ঠানে। তাদের উপস্থিতিতে যেন রাজনৈতিক নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয় গণভবন।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে মেনন আরও বলেন, আমাদের বাসায় প্রায় পান্তা উৎসব হতো। সকলেই আসত। খুবই ভালো লাগত তখনকার এই দিনগুলো। শেখ হাসিনা বলেন, আব্বা পাটি বিছিয়ে সবাইকে নিয়ে খেতে বসতেন। আব্বা এরকম অনুষ্ঠান প্রায়ই করতেন। কিন্তু এখন আর এগুলো হয় না। এ সময় শেখ হাসিনার কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেনন বলেন, বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে থাকতেন। প্রয়োজন হলেই আমরা টপটপ করে দোতলায় উঠে যেতাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের নিয়ে ছাদে বসতেন। সেখানে সব কথা বলতাম। এ সময় শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেখেন না এরা সব সময় নিরাপত্তাবেষ্টিত করে রাখে আমাকে। ইচ্ছে হলেও কোথাও যেতে পারি না। ইচ্ছে তো অনেক হয়, এখানে-ওখানে চলে যাওয়ার।  শেখ হাসিনা বলেন, এখন এসব আড্ডা-চা-চক্রের আয়োজন না থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যেমন দেখাসাক্ষাৎ হয় না তেমনি দূরত্বও তৈরি হয়। আমি চিন্তা করেছি, এ ধরনের অনুষ্ঠান মাঝে মাঝেই করব। তাতে করে রাজনৈতিক দূরত্ব কমে আসবে। এসব অনুষ্ঠানে একত্রিত হওয়া গেলে বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্যও হবে।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, তাদের বেশিরভাগ সময় কেটেছে গল্পে আর হাসি-ঠাট্টায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের কথা বলতে গেলে রাশেদ খান মেনন ‘টিপ্পনী কেটে’ বলেন, আপা, খালেদা জিয়ার আসন থেকে নির্বাচন করে জিতে এসে শিরীনের এখন খালেদা জিয়ার মতো চেহারা হয়ে যাচ্ছে। তখন শেখ হাসিনাসহ উপস্থিত সবাই হাসিতে ফেটে পড়েন। একটু বিরতি দিয়ে প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা বলেন, হ্যাঁ। তাই তো! আওয়ামী লীগ সভাপতি এ সময় তার দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

চা-চক্র কেমন লাগল জানতে চাইলে শিরীন আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পেই কেটেছে। এটা শুধুই আড্ডা ছিল। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। কোথাও দাঁড়িয়ে, কোথাও চেয়ারে বসে আড্ডা দিয়েছেন তিনি। শিরীন আখতার বলেন, রাজনৈতিক কোনো আলাপ হয়নি অনুষ্ঠানে। প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। তার বাবা প্রায়ই এসব আয়োজন করতেন বলে জানান শেখ হাসিনা। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, চা-চক্রের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক কোনো আলোচনা ওঠেনি। এখানে বিভিন্ন নেতারা বিভিন্ন গল্প করেছেন। কোথাও শেখ হাসিনা গল্প শুনেছেন, কোথাও গল্প করেছেন।

বিকেল ৪টার কিছু পরে অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী। এরপর একে একে ঘুরে ঘুরে সবার সঙ্গে সহাস্যে কুশলাদি বিনিময় করেন তিনি। সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত অতিথিদের আপ্যায়ন ও তাদের সঙ্গে খোলামনে গল্প করে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। পরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল মতিন খসরু, নুরুল ইসলাম নাহিদ, ওবায়দুল কাদের, ড. আবদুর রাজ্জাক, আবদুর রহমান, শ ম রেজাউল করিম, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ। অংশ নেন জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ, জিএম কাদের, মশিউর রহমান রাঙ্গা, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, সুনীল শুভ রায়, জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জাসদ (ইনু) সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, জাসদ (আম্বিয়া) নেতা মঈনুদ্দিন খান বাদল, নাজমুল হক প্রধান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, তরীকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, সাম্যবাদী দলের সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদোজ্জা চৌধুরী, মহাসচিব এমএ মান্নান, মাহী বি চৌধুরী এবং শমসের মবিন চৌধুরী, বিএনএফ প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা প্রমুখ। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

অনুষ্ঠান উপলক্ষে আবহমান বাংলার বিভিন্ন ঐতিহ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে গণভবনের লন। পাশাপাশি বাজানো হয় দেশের গান। আর অতিথিদের ফুচকা, চটপটি, পাঠিসাপটা পিঠা, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, জিলাপি, কাবাব-রুটি দিয়ে আপ্যায়ন করেন প্রধানমন্ত্রী। খাবারের তালিকায় আরও ছিল বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল, জুস, চা-কফিসহ বাঙালি ঐতিহ্যের নানা খাবার।

অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে গণভবনের গেটে বিভিন্ন দলের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য বা এ ধরনের কিছুই হয়নি। শুধু চা-চক্র হয়েছে। উনি সবার সঙ্গে কথা বলেছেন।

জি এম কাদের বলেন, পরিচয়, সম্পর্ক ঝালাই করে নেওয়াই ছিল চা-চক্রের মূল বিষয়। আমি মনে করি এটা ভবিষ্যতে রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভালো মন্তব্য করে রাঙ্গা বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীকে এ ধরনের একটি আয়োজনে দাওয়াত দেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছি। তিনি বলেন, একটা রিসোর্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যেখানে তার নিরাপত্তার কোনো সমস্যা হবে না। ওইদিনের দাওয়াতে আজকে যারা ছিলেন সবাই থাকবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত