বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ডাকসু নির্বাচন : আশা-নিরাশা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৭ পিএম

ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ এক আনন্দ সংবাদ। নেতা তৈরির সূতিকাগার এই ডাকসুসহ সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের ছাত্র পরিষদ নির্বাচন খুবই জরুরি। কেননা এখান থেকেই ছাত্ররা রাজনীতি বোঝে, জনসংযোগ ও দলীয়  মেনিফেস্টো বুঝতে চেষ্টা করে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনার ভাষা তৈরি হয় এবং নেতাসহ শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘদিন নানা কারণে  এই সংস্কৃতি রুদ্ধ ছিল। আজকে তা খুলতে যাচ্ছে। কিন্তু যেদিন থেকে এই নির্বাচন বন্ধ ছিল সেখান থেকে পদ্মা-মেঘনায় অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। এসেছে স্বৈরশাসন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান এবং দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থা। শিক্ষক ও ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির পতাকাতলের মেরুকরণ। এ ব্যবস্থা পাকিস্তান আমলেও ছিল, কিন্তু ছাত্ররা যথেষ্ট স্বাধীনতাও ভোগ করত। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার বিষয়ও তখন ছিল। যারা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিল তারা নেতৃত্বের সব কথা শুনত না আর জাতীয়তাবাদীর সঙ্গে ছিল তারাও নেতৃত্বের সঙ্গে নানা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতো। নেতারাও ছাত্রদের অনেক কথা মেনে নিত।

কমিউনিস্ট পার্টির জেলা বা মহকুমা কমিটি ছাত্র নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। আওয়ামী লীগের নেতারাও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নিয়ে কাজ করতেন। এসবই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একটা বড় রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এসব সভায় ছাত্ররা কখনো ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যও রাখত কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেসব ধৈর্যের সঙ্গে শুনে একটা সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই ছাত্রদের সিদ্ধান্তই জয়ী হতো। এসবে কোনো ধরনের বিরক্তি রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রকাশ করতেন না বা চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে মনে করতেন না। এসব কারণেই দেখা যায়, সত্তরের নির্বাচনে অনেক ছাত্রনেতাই প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন এবং নির্বাচিতও হয়েছেন। তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে জাতীয় রাজনীতিতে একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এখনো করছেন। সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে আগ্রহী হয়েছেন এবং রাজনীতিকে তাঁরা প্রভাবিত করছেন, মেধা দিয়ে নয়, অর্থ দিয়ে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে লড়াইয়ের বড় শক্তি ছিল মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক কিন্তু কালক্রমে এসেছে উচ্চবিত্ত আর ব্যবসায়ী শ্রেণি। এটা রাজনীতিতে ছাত্ররাজনীতির অনুপস্থিতির কারণেই সম্ভব হয়েছে। ছাত্ররা তখন নির্বাচনে যারা, তখনই তারা বিশাল ছাত্রদের সম্মুখীন হয়। একটা রাজনৈতিক কর্মকা-ের ফলাফল হিসেবে একদল বিজয়ী হয়। এখানে অতীতে পেশিশক্তি বা অর্থের প্রভাব কোনো বিবেচনায় আসেনি। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এসেছে অনেক। এরপর এসেছে ক্যাডারভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি, হল-হোস্টেলের ওপর দখলদারি, ভর্তি-নিয়োগ এমনকি ঠিকাদারির কর্তৃত্বের মধ্যেও ঢুকে যাচ্ছে ছাত্ররা। এসেছে বহিরাগতÑ যারা ছাত্র নয় অথচ থাকছে হোস্টেলে বা হলে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জন্য এ এক মহা অস্বস্তি।

অতীতে তা অবশ্য খুব সুদূর অতীত নয়, ষাটের দশকেই বড় বড় ছাত্র আন্দোলন দৃশ্যমান হয়। শিক্ষার প্রশ্নে শরীফ কমিশনের রিপোর্টটিতে দেখা যায় শিক্ষা অধিকার নয়, শিক্ষা একটি পণ্য। এর বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে ওঠে ছাত্রসমাজ। আন্দোলন শুরু হয়। ডান-বাম সব ছাত্রসংগঠন একত্রিত হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। একপর্যায়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মতোই গুলি চলে। এ সময় চলছে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। হামুদুর রহমান কমিশন নামে আরেকটি শিক্ষা সংকোচনকারী কমিশনও চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে। তার বিরুদ্ধেও ছাত্রসমাজ আন্দোলন গড়ে তোলে। এ সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান ছাত্রদের মধ্যে একটা পেটোয়া বাহিনী গড়ে তোলে। যাদের নামকরণ হয় ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফোর্স সংক্ষেপে এনএসএফ। এদের হাতে অস্ত্রও তুলে দেওয়া হয়। অবশ্য সে অস্ত্র ছোরা, খুন্তি, সাইকেলের চেইন এসব। টাকা পয়সার ব্যবস্থাও থাকত এই সব সন্ত্রাসীদের। কিন্তু বৃহত্তর সম্মিলিত ছাত্রসমাজ এই শক্তিকে পরাভূত করতে সমর্থ হয়। এই সময়গুলোতে ডাকসুসহ সারা দেশের ছাত্রপরিষদগুলো সচল ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণের সুযোগ ছিল অবধারিত।

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব পশ্চিম পাকিস্তানেও পড়তে থাকে। এই কঠোর সামরিক শাসনের মধ্যেও তারিক আলী নামে এক ছাত্রনেতার উত্থান ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে যিনি সারা বিশ্বে ও একজন প্রভাবশালী বামপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরে এবং জেল-জুলুমসহ নানা ধরনের নির্যাতন ভোগ করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্ররা জীবন বাজি রেখে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সারা দেশে ছাত্র পরিষদগুলোতে নির্বাচন হয়। বামধারার ছাত্রসংগঠনগুলো এ সময় ছাত্রদের আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। সশস্ত্র সংগ্রামে ছাত্ররা অংশ নিলেও এ সময় অস্ত্রের দাপট তেমন একটা পরিলক্ষিত হয় না, কিন্তু সামরিক শাসন আসায় জাতীয় রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি দুটোই ভ্রান্ত পথে চলে যায়। অস্ত্রের দাপট সর্বত্রই দেখা যায়। তবু ছাত্রপরিষদের নির্বাচন চলেছে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চললেও একসময় ছাত্র আন্দোলন একেবারেই পুরোপুরিভাবে দলীয় রাজনীতির মেরুকরণের মধ্যে আটকে যায়। অতঃপর নির্বাচনের প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল কৃষক-শ্রমিকদের দলকে প্রায় বর্জন করে ছাত্রনির্ভর হয়ে পড়ে।

এসব ইতিহাসের সবাই সাক্ষী। হাইকোর্টের নির্দেশনায় আবার এসেছে ডাকসু নির্বাচন। আমরা আশায় থাকতে চাই নির্বাচন একটা মুক্ত পরিবেশে হোক। ছাত্রদের অভিন্ন দাবি-দাওয়ার যারা প্রতিফলন ঘটাতে পারবে, তারা নির্বাচিত হোক। সেই সঙ্গে সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজেও হোক নির্বাচন। ছাত্রদের মধ্য থেকে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। সর্বোপরি মধ্যবিত্তের রাজনীতিতে প্রবেশের দ্বার উন্মোচিত হোক, যারা সত্যিকার অর্থেই দেশের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করবে। যেখানে অর্থই একমাত্র নিয়ামক শক্তি হবে না।

মামুনুর রশীদ

লেখক

নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামনিস্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত