সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কে ফিরিয়ে দেবে জাহালমের ৩ বছর

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫০ এএম

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হন জাহালম। প্রায় ৩ বছর পর এসে দুদক জানায়, জাহালম প্রকৃত অপরাধী নন, নির্দোষ। গতকাল রবিবার হাইকোর্ট জাহালমকে দুদকের করা ২৬টি মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাৎক্ষণিক মুক্তির আদেশ দেন। এরপর রাত পৌনে ১টার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান সহকারী কারা মহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহ আল মামুন। মুক্তি পেলেও তিন বছর ধরে বয়ে চলা কষ্ট কাটেনি জাহালম ও তার পরিবারের সদস্যদের।

এদিন ‘ভুল’ ব্যক্তিকে জেল খাটানোর ঘটনায় দুদকের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট। জড়িত দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে জানানো ও তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল

আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশ দেয়। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য ৬ মার্চ তারিখ ধার্য করেছে আদালত।

সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলায় টাঙ্গাইলের নিরপরাধ পাটকল শ্রমিক জাহালম তিন বছর ধরে কারাগারে থাকার পর গত ৩০ জানুয়ারি এ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সমালোচনা শুরু হয়। ওইদিনই বিষয়টি হাইকোর্টের ওই বেঞ্চের নজরে আনেন আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত। শুনানি নিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের একজন প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট মামলার বাদীকে সশরীরে এবং আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে ৩ ফেব্রুয়ারি ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিন দুদক মহাপরিচালক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান এবং মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাহিদ আদালতে হাজির হয়ে এবং আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবের পক্ষে আদালতে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশিদ আলম খান। তিনি এ ঘটনায় দুদকের ভুল স্বীকার করেন। এ সময় আদালত বলে, ‘যাকে আসামি করা উচিত ছিল, তাকে আসামি না করে সাক্ষী বানালেন। এখানে সিন্ডিকেট আছে, আরেকটি জজ মিয়া নাটক সাজানো হচ্ছে কি না?’ শুনানিতে আদালত দুদকের ভুলের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করে বলে, ‘কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে নই আমরা।’

আদালত বলে, ‘দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা। দুদক যদি সঠিকভাবে কাজ না করে তাহলে আমাদের যে উন্নয়ন হচ্ছে এর স্থায়িত্ব থাকবে না।’ আদালত আরও বলে, ‘এরকম ভুলের দায় দুদক এড়াতে পারে না। দুদককে আরও স্বচ্ছ হতে হবে।’ এই ‘ভুল’ তদন্তে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত কি না, আর সিন্ডিকেট থাকলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা চিহ্নিত করে জানানোর নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এর ব্যত্যয় হলে হাইকোর্ট এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে জানিয়ে আদালত বলে, ‘দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করুক এটা আমরাও চাই।’

আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত গণমাধ্যমকে বলেন, জাহালমকে ২৬টি মামলায় অব্যাহতি দিয়েছে হাইকোর্ট। বাকি সাতটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেয়নি আদালত।

এদিকে প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকা জাহালমের মা মনোয়ারা বেগমের কষ্টের শেষ নেই। অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃদ্ধ বয়সেও তাকে অন্যের বাড়ি কাজ করতে হচ্ছে। ছেলেকে নির্দোষ প্রমাণে দৌড়াতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়েছে, করতে হয়েছে ধার-দেনা। সামান্য ভিটেয় ছোট্ট টিনের বাড়িটি ছাড়া তাদের আর কিছু নেই।

রবিবার টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া গ্রামের বাড়িতে আমাদের জেলা প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব মনোয়ারার সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘পাহা হাড্ডিতে এহন আর সয় না। আর কতদিন মাইনসের বাইত্তে কাম করমু। ভাবছিলাম পোলাটা কামাই করে আমি রেহাই পাইলাম। আমার পোলাডারে ওরা জেলখানায় নিছে।’ অসহায় চোখে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘৩৫ বছর পরের বাড়ি কাম করি চালাইলাম। এহন বয়স অইছে আর যে পারি না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত