সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অবৈধ পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা

বছরে খুন ২০০ বাংলাদেশি

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:০১ এএম

বাংলাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকার দূতাবাস এবং ভিসা সেন্টার না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধপথে দেশটিতে যাচ্ছেন হাজারো বাংলাদেশি। যাত্রাপথ দুর্গম ও জটিল হওয়ায় পথ হারিয়ে কেনিয়া, মোজাম্বিক, ইথিওপিয়ায় তাদের অনেককে কাটাতে হয় মানবেতর জীবন। এ সময় অনেকের প্রাণহানিও হয়। অবৈধপথে দক্ষিণ আফ্রিকা গেছেন এমন কয়েকজন সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, বাংলাদেশে দেশটির কোনো কূটনৈতিক মিশন না থাকায় প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে ভিসার আবেদন করতে হয়। এতে সময় ও খরচ বেশি পড়ে। আবার বেশিরভাগ সময় ভারত ও শ্রীলঙ্কার ভিসা সেন্টার বাংলাদেশিদের ভিসা দিতে গড়িমসি করে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করলেও হয়রানি করা হয়। এতে একটি ভিসা পেতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকায় অবৈধপথে দক্ষিণ আফ্রিকা যাত্রা করে প্রায় সবাই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ‘মাফিয়া চক্র’। বিশ্বব্যাপী জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ‘মহাশক্তিধর’ এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু মানবপাচারকারীর যোগসাজশ রয়েছে। তাদের তৎপরতায় দেশটিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে পড়ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শহর জোহানেসবার্গে বসবাসরত প্রবাসী সাংবাদিক রুহুল আমিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশটি বাংলাদেশের ওষুধ, গার্মেন্ট ও গ্রোসারি পণ্যের বড় বাজার হতে পারত। কিন্তু মাফিয়া চক্রের শক্তিশালী অবস্থান এবং ‘সরকারের উদাসীনতায়’ দেশটি বাংলাদেশের কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার হতে পারেনি। দূতাবাস এবং ভিসা সেন্টার না থাকায় শ্রমবাজারও ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অবৈধপথে  দক্ষিণ আফ্রিকা যান চট্টগ্রামের তরুণ ফারুক খান। এখন থাকেন দেশটির সবচেয়ে পুরাতন শহর কেপ টাউনে। দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমাদের তিনজনকে ঢাকা থেকে ভ্রমণ ভিসায় আরব আমিরাতের শারজায় নিয়ে যায় পাচারকারীচক্রের দুই বাংলাদেশি সদস্য। সেখান থেকে নেওয়া হয় দুবাই। এখানে চক্রের লোক বদল হয়। একজন পাকিস্তানি পাঠান আমাদের একটা বাসায় নিয়ে যান। সেখানে ভারত, নেপাল, পাকিস্তানের আরও ২০-২৫ জন ছিল। সে বাসায় তিন দিন ছিলাম। তিন দিন পর দুবাই থেকে রাত ২টায় আমাদের কেনিয়ার একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সকাল ৬টায় কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে পৌঁছি। এরপর নাইরোবি এয়ারপোর্ট থেকে এক বিমানে রওনা হয়ে সকাল সাড়ে ১০টায় মোজাম্বিকের এক ছোট বিমানবন্দর নামপুলাতে নামি। সেখান থেকে বাসে সাড়ে তিন ঘণ্টায় যাই মাপুতো (মোজাম্বিকের রাজধানী) শহরে। সেখানে আরেক বাংলাদেশি আমাদের ‘রিসিভ’ করেন। সে শহর থেকে গাড়িতে করে আমাদের এক গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে না খেয়ে মাটিতে শুয়ে রাত কাটাই। পরদিন সকাল ৮টায় রওনা দিয়ে একটা গাড়িতে করে এক কৃষ্ণাঙ্গের সঙ্গে অন্য একটি বাড়িতে পৌঁছি বেলা ১১টায়। বাড়ির এক নারীর কাছে একটু চিড়া আর পানি চেয়ে খাই। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিন কৃষ্ণাঙ্গ আসে। তাদের একজন মুসলমান, নাম জাকারিয়া। তারা আমাদের কাপড়চোপড় খুলে চেক করে। বলে মোবাইল, ডলার যা আছে দিয়ে দে। কিছুই না পেয়ে চড়থাপ্পড় মারে। এরপর একটা কাগজে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ডার পার হওয়ার নিয়ম শিখিয়ে দেয়। রাত ৮টায় গাড়ি আসে। জাকারিয়া দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে মোজাম্বিক আর দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যবর্তী পুমালাঙ্গা বর্ডারে নিয়ে যায়। রাত ১০টার দিকে সীমান্ত পার হয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকি; অন্ধকার পথ, প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর রাস্তা পাই। সেখানে গাড়ি দাঁড়ানোই ছিল। তাড়াতাড়ি সে গাড়িতে তুলে আমাদের সবাইকে শুইয়ে দেয় ওরা; যাতে পুলিশ বুঝতে না পারে গাড়িতে লোক আছে। সেখান থেকে এক গ্রামে এক কৃষ্ণাঙ্গের বাড়িতে নিয়ে যায় আমাদের। সেখানে দুই দিন কাটানোর পর রাতে একটা গাড়ি আসে। সে গাড়িতেও আমাদের শুইয়ে দেওয়া হয়। এভাবে রাত ১টার দিকে জোহানেসবার্গে পৌঁছাই। ফারুক খানের ভাষ্যমতে, এভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে লাগে সাত থেকে আট লাখ টাকা। তিনি জানান, দুবাই ছাড়াও পাচারকারীরা ভারত, থাইল্যান্ড হয়ে কেনিয়া, বুরুন্ডি, ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবপাচার করে। এ সময় অনেকে ভুলে দলচ্যুত হয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। পথে কেউ কেউ কেনিয়া ও মোজাম্বিকের জঙ্গলে হারিয়ে যান। সেখানে লতাপাতা খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়।   

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনৈতিক মিশন থাকলেও বাংলাদেশে নেই। এসব দেশের সঙ্গে আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশের অবাধ বাণিজ্যিক চুক্তি আছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে শুধু বাংলাদেশ। সে দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও কূটনৈতিক কারণে নানা বাধায় পড়তে হচ্ছে। অহরহ হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশিরা। প্রবাসী সাংবাদিক ও সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর দেশটিতে হত্যার শিকার হচ্ছে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি, যা দেশটিতে বসবাসরত অন্যান্য দেশের নাগরিকদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলাও হয় না। ফলে বাংলাদেশিদের ওপর দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের হামলা বেড়েই চলেছে। ওয়াশিকুর রহমান নামে এক প্রবাসী জানান, কেউ ব্যবসা ভালো করছে দেখলেই কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। তবে বিচার চাওয়ার শক্তি পাচ্ছে না কেউ। রাজধানী প্রিটোরিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনও এসব ঘটনায় ‘নির্লিপ্ত’। এতে দিন দিন বাংলাদেশিদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে দক্ষিণ আফ্রিকা।

প্রবাসী সাংবাদিক নূরুল আলমের তথ্য অনুসারে, নব্বইয়ের দশকে নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক যাওয়া শুরু হয়। বলা হয়, সবচেয়ে বেশি প্রায় এক লাখ লোক যায় ২০০৯-২০১৪ সালে। তবে সরকারিভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক পাঠানোর ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে ঠিক কত বাংলাদেশি আছে তা জানা যায়নি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাবেক কর্মকর্তা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় যারা যাচ্ছেন, তারা মানবপাচারের আওতায় পড়েন। ফলে তাদের সঠিক হিসাব দেওয়া কষ্টকর। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সেখানে আমাদের লক্ষাধিক মানুষ থাকতে পারে। তার মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পিছিয়ে থাকাটা দুঃখজনক। বাংলাদেশে দেশটির কনস্যুলার অফিস খুলতে পারলে অনেকেই সহজে সেখানে গিয়ে ব্যবসা করতে পারবে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রৌনক জাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব দেশে শ্রমবাজার এবং ব্যবসার পরিবেশ ভালো এগুলো নিয়ে তালিকা করছে সরকার। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশে হাইকমিশন চালুর ব্যাপারে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ আগ্রহী বলে শুনেছি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত