সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ডাকসু নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো কী ভাবছে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৩৪ এএম

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছরই সেখানে প্রথম হল ছাত্র সংসদ গঠিত হয়েছিল। সে সময় ঢাকা হল, মুসলিম হল ও জগন্নাথ হলে পর্যায়ক্রমে আলাদা ছাত্র সংসদ গঠিত হয়। ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ গঠন করা হয়। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ (ডাকসু) নামকরণ হয় ১৯৫৩-৫৪ সালে। এ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর প্রত্যক্ষ ভোটে ডাকসুর নির্বাচন হয়।  ডাকসুর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ছিলেন এস এ বারি এবং জেনারেল সেক্রেটারি (জিএস) ছিলেন জুলমাত আলী খান। ১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হওয়া মাহফুজা খানমই এখন পর্যন্ত ডাকসুর একমাত্র নারী ভিপি। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ডাকসুর ভিপি ছিলেন আ স ম আবদুর রব (ছাত্রলীগ) এবং জিএস ছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন (ছাত্রলীগ)। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসুর নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।  মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২-৭৩ সালে নির্বাচনে ডাকসুর ভিপি হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (ছাত্র ইউনিয়ন) এবং জিএস ছিলেন মাহবুবুর জামান (ছাত্র ইউনিয়ন)। ১৯৯০-৯১ সালের সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে ভিপি হন আমানুল্লাহ আমান (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল) এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল)। স্বাধীনতার পর ৪৭ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৭ বার।

সর্বশেষ ডাকসুর ২৮ বছর পর আগামী ১১ মার্চ ২০১৯ ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রেক্ষাপটে ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরছে দেশ রূপান্তর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য আরিফ ও ওমর হায়দার

 

image

সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় চাই

সাদ্দাম হোসাইন

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

সাদ্দাম : সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্তটিকে আমরা স্বাগত জানাই। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যে অচলায়তন তৈরি হয়েছে এর মাধ্যমে সেটা উত্তরণ সম্ভব। ২৮ বছরের বাস্তবতায় এই প্রার্থী-ভোটার করা হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আপনারা দাবি করেছেন হলের ভেতরে ভোটকেন্দ্র করার। এই দাবি কেন করছেন?

সাদ্দাম : ১৯২১ সালে ঢাবি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে হল সংসদ ও ডাকসু নির্বাচন হলেই হয়ে আসছে। এই হল থেকে নির্বাচন করে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ও বাসদ থেকে ভিপি হয়েছে। ঢাবির ৩৮ হাজার শিক্ষার্থীর ৬৫ শতাংশই হলে থাকে। বিরোধী ছাত্রসংগঠনের এই ধরনের প্রস্তাব হলের শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ ও উদারতায় আঘাত করেছে।

দেশ রূপান্তর : অনেক ছাত্র সংগঠন ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা বসানোর দাবি করেছেন। এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কী?

সাদ্দাম : সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে উদ্যোগ নেবে আমরা সেটাকে স্বাগত জানাবো।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনে আপনার সংগঠন থেকে আলাদা প্যানেল হবে নাকি জোটভুক্ত প্যানেল হবে?

সাদ্দাম : আমাদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্রিয়াশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগেরই যোগাযোগ আছে। মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করে এমন একটি রাজনৈতিক প্লাটফরম আমাদের রয়েছে। আমাদের প্রয়াস হবে সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আপনাদের মূল দাবি কী?

সাদ্দাম : প্রত্যেক বছর ডাকসু নির্বাচন হতে হবে। সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। সিটের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে। সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র ধরে রাখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

সাদ্দাম : বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই। জাতীয় আয়ের ৬ ভাগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। এই সময়ের শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার শিক্ষা চাই।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের প্যানেলে কি অন্তত ৩০ শতাংশ নারীপ্রার্থী থাকবে?

সাদ্দাম : ডাকসুর সকল পদে যে সব মেয়ে যোগ্য আমরা তাদের নিয়ে আসব।

image

হলে কেউ ভোট দিতে আসবে না

মেহেদী তালুকদার

সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

মেহেদী : আমরা এই সিদ্ধান্তে হতাশ। হয় বর্তমান শিক্ষার্থীরা প্রার্থী হোক আর না হলে উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। যেহেতু ২৮ বছর পর নির্বাচন হবে, যারা বাদ পড়েছে তাদের সবার অধিকার আছে প্রার্থী হওয়ার।

দেশ রূপান্তর : ভোটকেন্দ্র হলের বাহিরে দেওয়ার দাবি করেছে অনেক সংগঠন। আপনারাও একই দাবি জানিয়েছেন। কেন এ দাবি করেছেন?

মেহেদী : শুধু আমরা না, পরিবেশ পরিষদের অনেকেই এই দাবি করেছে। আমাদের নেতাকর্মীরা ক্লাস করতে পারছে না, পরীক্ষা দিতে পারে না। লাইব্রেরিতে এলেও তাদের বের করে মারধর করা হয়। এমন অবস্থায় হলের ভেতর ভোটকেন্দ্র হলে বলার অপেক্ষা রাখে না কী ধরনের কারচুপি হবে। ১৯৯৪ সালে ছাত্রলীগও দাবি করেছিল হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র নিতে। এখন তারাই আবার দিচ্ছে না।

দেশ রূপান্তর : আপনারা ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা বাসানোর দাবি করেছেন। যদি হলের ভেতর ভোটকেন্দ্র হয় এবং সিসিটিভির ব্যবস্থা করা হয় আপনারা সেটা সমর্থন করবেন কি?

মেহেদী : প্রথম কথা হলো হলে ভোটকেন্দ্র হলে অনেকে তো ভোট দিতেই আসবে না। সিসি ক্যামেরা লাগালে আর কী হবে! কারণ সবাই জানে হল এককভাবে ছাত্রলীগের দখলে।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনের প্রচারণায় আপনারা কি সমান সুযোগ পাবেন বলে মনে করেন?

মেহেদী : তারিখ ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত তো কোনো সুযোগই আমরা পাইনি।

দেশ রূপান্তর : সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে আস্থাটি দরকার সেটি আছে বলে মনে করেন আপনারা?

মেহেদী : ডাকসু নির্বাচনের জন্য যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে সেখানে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য দলের যারা আছেন তাদের দেওয়া হয়নি।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনে আপনার সংগঠন থেকে আলাদা প্যানেল হবে নাকি জোটভুক্ত প্যানেল হবে?

মেহেদী : এখনো এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। পরিস্থিতির প্রয়োজনে জোটবদ্ধও হতে পারি।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের প্যানেলে কি অন্তত ৩০ শতাংশ নারীপ্রার্থী থাকবে?

মেহেদী : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা সচেতন। যারা যোগ্য আছে তাদের আমরা নেব। মেয়েদের ৫টা হল আছে, নারী অংশগ্রহণ এমনিতেই হবে।
image

সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে আনব

নুরুল হক নূর

যুগ্ম-আহ্বায়ক, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

নূর : সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি। বিশেষ লোকজনকে প্রার্থী করার সুযোগ দিতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ভোটকেন্দ্র হলের ভেতরে রাখা হয়েছে এ ব্যাপারে আপনাদের সংগঠনের বক্তব্য কী?

নূর : এই সিদ্ধান্তে আমরা হতাশ। ১৩টি ছাত্র সংগঠন হলের বাহিরে ভোটকেন্দ্র নেওয়ার দাবি করেছিল। আমাদের দাবিও তাই। হলে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য। শুধু ছাত্রলীগকে খুশি রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।

দেশ রূপান্তর : আপনারা ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা দাবি করেছেন। যদি হলের ভেতর ভোটকেন্দ্র হয় এবং সেখানে সিসিটিভি রাখা হয় আপনারা কি তা সমর্থন করবেন?

নূর : ভোটকেন্দ্র হলে থাকলে শুধু সিসিটিভি নয় লাইভ করলেও আমাদের কোনো আস্থা নেই। জাতীয় নির্বাচনে আমরা দেখেছি কী ধরনের কৌশল করা হয়েছে। হলে থাকেই ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগের বাহিরে কেউ থাকতে পারে না। সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কীভাবে ভোট দেবে?

দেশ রূপান্তর : অনেকে বলছেন আপনারা ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ নিয়ে গড়ে উঠেছেন, সেটা এখন শেষ। আপনারা তারপরও কেন ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন?

নূর : আমরা কাজের মাধ্যমে সামনে এসেছি। আমাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ অনেক আগে থেকেই কাজ করি। আমরা ২০১৮ সালে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সফল হই। এই জন্যই শিক্ষার্থীদের আস্থা এরা ঢাবির জন্য ইতিবাচক কাজ করতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনে আপনার সংগঠন থেকে আলাদা প্যানেল হবে নাকি জোটভুক্ত প্যানেল হবে?

নূর : এখন পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। অনেকেই ভাবছে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বরং যারা খেলায় ভালো বিতর্কে ভালো সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে জড়িত, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে আনব।
image

ডাকসু নির্বাচন ঝুলে যাওয়া যাবে না

ফয়েজ উল্লাহ,

সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

ফয়েজ : যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তারাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এমনকি যারা এমফিল এবং পিএইচডি করছেন তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাই তাদের ভোটার বা প্রার্থী হওয়ার অধিকার রয়েছে। আর এই ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারিত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা চাই না এই বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে কোনো আইনি জটিলতার জন্য ডাকসু নির্বাচন ঝুলে না যায়। ১৯৯১ সালে এবং ১৯৯৫ সালে দুইবার তফসিল ঘোষণার পরও বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে আইনি মারপ্যাঁচে ডাকসু নির্বাচন আটকে যায়। আমরা এবার এর পুনরাবৃত্তি চাই না।

দেশ রূপান্তর : আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে আপনাদের সংগঠনের অবস্থান কি?

ফয়েজ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২% শিক্ষার্থী অনাবাসিক। তাই তারা যদি হলে কোনো ধরনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখেন তাহলে তারা ভোট দিতে যাবেন না। আর বাকি যেসব শিক্ষার্থী হলে থাকেন তারাও যদি অগণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোট দেন তাহলে ডাকসু নির্বাচনের যৌক্তিকতা থাকে না। তাই এই মুহূর্তে হলের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত না করে হলে ভোটকেন্দ্র করা যাবে না। প্রয়োজনে হলগুলোতে আবাসিক ছাত্রদের মধ্যে এই বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করা যেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আপনার সংগঠন কি স্বতন্ত্র এবং পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে নির্বাচন করছে? জোটগত হলে আপনাদের জোট এবং প্যানেল সম্পর্কে বলুন।

ফয়েজ : আমরা ছাত্র ইউনিয়নগতভাবে হলে হলে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছি। আমাদের জোট প্রগতিশীল ছাত্র জোট রয়েছে। আমরা জোটের সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলছি।  এর বাইরে ভালো বিতার্কিক, ভালো খেলোয়াড়, ভালো ফলাফলের শিক্ষার্থী প্রমুখের সঙ্গে কথা বলছি।  সব মিলিয়ে একটি সর্বদলীয় প্রগতিশীলদের একটা প্যানেল দাঁড় করানোর চিন্তা আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নয়নে কী কী কার্যক্রম হাতে নেবে আপনার সংগঠন?

ফয়েজ : শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে। আমরা রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করব। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখব। আর ছাত্র অধিকারগুলো নিশ্চিত করব।
image

যোগ্যতা অনুযায়ী নারীরা প্রার্থী হবেন

উম্মে হাবিবা বেনজীর

সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন

দেশ রূপান্তর : নিয়মিত এবং এমফিল শিক্ষার্থীর বয়স ৩০ বছরের মধ্যে হলে তারাই শুধু প্রার্থী বা ভোটার হতে পারবেন।  আপনার সংগঠন কি একমত?

বেনজীর : আমরা দাবি করেছিলাম সব শিক্ষার্থীর প্রার্থিতা বা ভোটাধিকার। সেই বিবেচনাকে বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে নিয়েছে তা স্পষ্ট করেনি। আর সিন্ডিকেট তো আমাদের মূল দাবিকেই উপেক্ষা করেছে। আমরা চেয়েছিলাম ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে করা হোক। কিন্তু কর্র্তৃপক্ষ সেই দাবিতে কর্ণপাত করেনি। এখন নির্বাচন যদি সুষ্ঠু না হয় তাহলে প্রার্থিতা দিয়ে কী করব। তাই বিষয়টিকে আমরা ইতিবাচকও দেখছি না আবার নেতিবাচকও দেখছি না।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোয় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর একাধিপত্য চলছে। এই ধরনের পরিবেশে কর্র্তৃপক্ষ কি স্বাধীনভাবে ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে?

বেনজীর : হলে মোটেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। শিক্ষার্থীদের ভয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।  বিভিন্ন বিরোধী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরক্ত করা হয়। তাদের প্রতি বিরূপ আচরণ করা হয়। তাই এই পরিবেশের মধ্যে কেউ যদি নির্বাচন করতে চায় তাহলে সে আক্রান্ত হবে। তাই এই পরিবেশের নিরসন না ঘটিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনের ইশতেহারে কী কী বিষয় প্রাধান্য দেবেন?

বেনজীর : যেহেতু এখনো তফসিল ঘোষণা হয়নি তাই আমরা এখনো ইশতেহার প্রকাশ করিনি। আমরা ইশতেহারে প্রাধান্য দেব ১. গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ২. বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা ৩. হলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ৪. ২৪ ঘণ্টা লাইব্রেরি খোলা রাখা।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচনে আপনার সংগঠনের প্যানেলে মোট কতজন নারী সদস্য হচ্ছেন? তাদের সংখ্যা কি মোট প্রার্থীর ৩০ ভাগ?

বেনজীর : এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। ক্লাসরুমগুলোতে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি। আর কোটা থাকা তো বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ। আমরা বিবেচনা করব কাদের যোগ্যতা বা সামর্থ্য বেশি। সেই অনুযায়ী প্রার্থী করা হবে। এখানে নারী বা পুরুষ বিবেচ্য বিষয় নয়।

image

সবার সুযোগ পাওয়া যুক্তিসংগত ছিল

আলমগীর হোসেন সুজন, আহ্বায়ক

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

সুজন : আমরা প্রথমত মনে করি, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র, যারা হল সংসদে চাঁদা দেয়, যারা টিএসসিকে চাঁদা দেয় তারা সবাই ভোটার বা প্রার্থী হতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, এক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ করা অযৌক্তিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র এমফিল করতে পারেন, পিএইচডি করতে পারেন। তারা সবাই ভোটার হতে পারবেন। তাই আমরা দাবি তুলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীই ভোটার বা প্রার্থী হতে পারবেন।

দেশ রূপান্তর : আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে আপনাদের সংগঠনের অবস্থান কি?

সুজন : ছাত্রলীগ ছাড়া মোট ১১টি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন এবং ছাত্রদল আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্র করার বিপক্ষে। আগে ডাকসুতে ভোটকেন্দ্র ছিল। আর এখন হলে যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান সেটি নিশ্চিত হয়নি। হলগুলোতে ছাত্রলীগ নির্যাতন চালায়। কয়েকদিন আগে জিয়া হলে এক সাধারণ শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার অপরাধ, তিনি ডাকসুতে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিল। হলের এই ধরনের পরিবেশে সেখানে ভোটকেন্দ্র করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

দেশ রূপান্তর : ডাকসুর ভোটকেন্দ্রগুলোতে ক্যামেরা রাখার যে দাবি উঠেছে, তা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন অনেকে। আপনারা কি এই দাবি সমর্থন করেন?

আলমগীর হোসেন সুজন : আমরা মনে করি নির্বাচনে ক্যামেরা রাখা যৌক্তিক। আর গণমাধ্যমেরও প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জানি। অতীতে ডাকসু নির্বাচনে ভোট কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। তাই সেইসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন ডাকসুতে না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। 

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কি স্বাধীনভাবে ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে?

সুজন : ২০০১ সালের পর থেকেই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর একাধিপত্য চলছে।  আমরা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো স্থিরতা বজায় রেখেছি বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তাই আগে হলে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তারপর নির্বাচন করতে হবে। না হলে পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত থাকবে। বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। যার দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্র্তৃপক্ষকে নিতে হবে।

image

পরিবেশ রক্ষায় ব্যর্থ ঢাবি প্রশাসন

উলুল অন্তর

আহ্বায়ক, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশ রূপান্তর : স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডাকসু নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আপনার সংগঠনের মতামত কী?

অন্তর : এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভোটার হওয়ার পক্ষে আমরা ছিলাম, কিন্তু তাদের প্রার্থিতার বিপক্ষে ছিলাম আমরা। এমফিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে, তাদেরই ছাত্রদের নেতৃত্বে আসা উচিত।

দেশ রূপান্তর : অনেক সংগঠনের মতো আপনারাও ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলের বাহিরে করার দাবি করেছেন, এই দাবি কেন?

অন্তর : ঢাবি ছাত্রলীগ প্রতিটা হলেই দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অনুষ্ঠানে না গেলে শিক্ষার্থীদের মারধর করা ও হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এসব বিষয়ে ঢাবি প্রশাসন একেবারে নীরব। আর অধিকাংশ শিক্ষার্থী হলের বাহিরে থাকে। তারা ভয়ে হলে ভোট দিতে যাবে না।

দেশ রূপান্তর : আপনারা ভোটকেন্দ্রে ক্যামেরা বসানোর দাবি করেছেন, এই দাবির পক্ষে যুক্তি কী?

অন্তর : আমরা জানি নির্বাচনে কীভাবে দখলদারিত্ব কায়েম করে সরকারি ছাত্র সংগঠন। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে সেটা আমি বলতে পারি। এরকম হওয়ার আশঙ্কা এখানেও আছে। তাই ভোটকেন্দ্রের ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য ক্যামেরার দাবি করেছি আমরা।

দেশ রূপান্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোয় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে আস্থা দরকার তা আছে বলে মনে করেন কি?

অন্তর : আস্থা পাচ্ছি না বলেই আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য আন্দোলন করছি। অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আপনাদের মূল দাবি কী?

অন্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। বৈধ সব ছাত্র সংগঠনের অবাধ কার্যক্রম নিশ্চিত করা। আবাসিক হলে বৈধদের সিট নিশ্চিত করা। নির্বাচনের প্রচারণায় কোনো বাধা দেওয়া যাবে না এবং ভোটকেন্দ্র অ্যাকাডেমিক ভবনে করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

অন্তর : আমরা চাই বিজ্ঞানমনস্ক ও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি চাই।

image

হলগুলোর পরিবেশ অগণতান্ত্রিক

সালমান সিদ্দিকী

সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট

দেশ রূপান্তর : নিয়মিত এবং এমফিল শিক্ষার্থীর বয়স ৩০ বছরের মধ্যে হলে তারাই শুধু প্রার্থী বা ভোটার হতে পারবেন।  আপনার সংগঠন কি একমত?

সালমান : যেহেতু দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না তাই আমরা দাবি তুলেছিলাম বিভিন্ন সেশন ধরে বিশেষ করে ২০০৯-১০ সেশন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ভোটার বা প্রার্থী করার।  যারা সান্ধ্যকালীন কোর্সে বা ডিপ্লোমা কোর্সে পড়াশুনা করছেন তাদের ভোটার বা প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই বলে আমরা মনে করি। 

দেশ রূপান্তর : আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে আপনাদের সংগঠনের অবস্থান কি?

সালমান : আবাসিক হলগুলোতে একটা চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত না করে হলে ভোটকেন্দ্র করা যাবে না। কিন্তু ছাত্রলীগের পক্ষে গিয়ে প্রশাসন এই ধরনের প্রহসনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

দেশ রূপান্তর : বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কি স্বাধীনভাবে ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে বলে মনে করেন?

সালমান :  আমরা চাই একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। একটি ভয়মুক্ত, গণতান্ত্রিক পরিবেশে যদি ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে যারাই নির্বাচিত হোক না কেন আমরা তাদের সাদরে মেনে নেব। কিন্তু তার আগে একটা ভয়হীন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি। এই দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্তু সে রকম কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

দেশ রূপান্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের যে চিত্র আমরা দেখি উপাচার্য নিয়োগ থেকে শিক্ষক রাজনীতি মিলিয়ে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে ডাকসু নির্বাচন পরিচালনা করতে পারবে বলে মনে করেন কি?

সালমান : আমরা দেখতে পাই, বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য থেকে শুরু করে হলের প্রভোস্ট ও শিক্ষক নিয়োগে দলীয় আনুগত্য প্রবলভাবে বিবেচিত হচ্ছে। এমনকি ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনী কমিটি, আচরণবিধি কমিটি এবং রিটার্নিং অফিসার সর্বক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনায় কাজ করছেন। এমনকি নীল দলের সঙ্গে যুক্ত একজন শিক্ষককে একইসঙ্গে তিনটি পদে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বজনগ্রাহ্য ইংরেজি বিভাগের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কিংবা ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা যেত। কিন্তু এখানে দলীয় বিবেচনা কাজ করছে। যা সুষ্ঠু নির্বাচনের ইঙ্গিত নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত