বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আবাসন খাতে মন্দা কাটছে

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১৫ পিএম

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ চালু করার কারণেও দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা আবাসন খাত চাঙ্গা হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম খরচে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ যাতে ফ্ল্যাট কিনতে পারে, সেজন্য নিতে হবে আরও অনেক উদ্যোগ। ফ্ল্যাট কেনার জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা, ফ্ল্যাট নিবন্ধন খরচ কমানো হলে মন্দা ঠেলে নগরবাসীর সংকট দূর করতে সফল হবে আবাসন খাত

দরকার আরও অনেক কিছু

সমস্যার বেড়াজালে আটকে থাকা আবাসন খাতের মন্দাভাব কয়েক মাস পর একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে। ফ্ল্যাট কিনতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে থাকায় গত কয়েক বছর ধরে চলা আবাসন খাতের মন্দা এখন কাটতে শুরু করেছে। এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না খাতটির ব্যবসায়ী ও আগ্রহী ক্রেতারা। তারা বলছেন, কম খরচে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ যাতে ফ্ল্যাট কিনতে পারেন, সে জন্য নিতে হবে আরও অনেক উদ্যোগ। ফ্ল্যাট কেনার জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা, ফ্ল্যাট নিবন্ধন খরচ কমানো, সহজেই পুরনো ফ্ল্যাট বিক্রির সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সরকার। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ফ্ল্যাট কেনা বা ভবন নির্মাণে আগের চেয়ে বেশি হারে ঋণ দিচ্ছে। ৯ শতাংশ সুদের এই ঋণের কারণে দীর্ঘদিন পর ক্রেতারা ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন। এছাড়া, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে গৃহঋণ চালু করার কারণেও দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা আবাসন খাত চাঙ্গা হওয়ার আভাস পাচ্ছে। অনেক সরকারি চাকরিজীবী ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এছাড়া, আবাসন খাতের আরেকটি বড় সংকট ছিল গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকা। এখন বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কয়েকটি ফ্ল্যাট মিলে চেম্বার তৈরি করে সিলিন্ডার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করছে। এতে খরচও পড়ছে সরকারি গ্যাস ব্যবহারের মতোই।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যায়। গত বছরও প্রায় ১০ হাজার অবিক্রীত ছিল বলে জানান আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাব এর সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন। তিনি জানান, গত কয়েক মাস ধরে বিক্রি কিছুটা বাড়ছে। তবুও এখনো প্রায় ৮ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রীত রয়ে গেছে।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা নানা সংকটের কথা বললেও তা সমাধান হয়নি। এতে আবাসন খাতে মন্দাভাব নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল ২৬৯টি শিল্প খাতেও স্থবিরতা দেখা দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই করতে শুরু করে। এতে আবাসন খাতের ৩৫ থেকে ৪০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী ছাড়াও নির্ভরশীল খাতগুলোর শ্রমিকদের আয়-রোজগারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। সম্প্রতি সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্তে ওই মন্দাভাব কাটার আভাস মিলছে। তবুও অনেক সংকট রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান দাবি ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো। বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর দিতে হয়। এ নিয়ে প্রতি বছর বাজেটের আগে-পরে আলোচনা হলেও কমানোর উদ্যোগ নেয়নি সরকার। তবে এবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রিহ্যাব প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি নিবন্ধন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বর্তমানে প্লট ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন করতে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে গেইন ট্যাক্স ৪ শতাংশ, স্ট্যাম্প ফি ৩ শতাংশ, রেজিস্ট্রেশন ফি ২ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ২ শতাংশ ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ৩ শতাংশ। এত উচ্চহারে করারোপের কারণে অনেক ক্রেতা ফ্ল্যাট কেনার পরও রেজিস্ট্রেশন করতে আগ্রহী হন না। এছাড়া, জমির মৌজা মূল্যবৃদ্ধির কারণে জমির রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বাড়ছে।

ফলে সরকার এ খাত থেকে যথাযথ রাজস্ব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যারা রেজিস্ট্রেশন করেন, তারাও প্লট বা ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম দাম দেখিয়ে করছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এক বন্ধু ফ্ল্যাট বিক্রির পর ক্রেতা ৩০ লাখ টাকা কম দেখিয়ে তা নিবন্ধন করেছেন। উচ্চ নিবন্ধন ব্যয়ের কারণে সরকার এভাবে অনেক রাজস্ব হারাচ্ছে।

কমিটি খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেবে বলে গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ওই কমিটিতে থাকা রিহ্যাব প্রতিনিধি ও সংগঠনের প্রথম সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া। তিনি বলেন, আশা করছি, আগামী বাজেটেই ফ্ল্যাট নিবন্ধনে ভ্যাটসহ শুল্ক কর কমে যাবে। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াও দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ব্যয় কমানোসহ আবাসন খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে। এ খাতের বিকাশে সব ধরনের সহায়তা দেবে সরকার।

নিবন্ধন ব্যয় কমানো ছাড়াও সম্পদ কর কমানো, কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া, এক অঙ্কের সুদহারে গৃহঋণ দেওয়ার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনসহ ১২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে রিহ্যাব। ভ্যাট গোয়েন্দাদের নিরীক্ষা নিয়ে আপত্তি রয়েছে আবাসন ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, ভ্যাট গোয়েন্দারা ডেভেলপার কোম্পানি পরিদর্শন করে কাগজপত্র জব্দ করে নিয়ে আসছে। এতে আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডেভেলপারদের সংগ্রহকারীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন। কারণ অধিকাংশ ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নগদ টাকায় নির্মাণ সামগ্রী কিনে থাকে। তাই ভ্যাট ও উৎসে কর সংগ্রহের দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না। তাছাড়া অনেক উপকরণের সরবরাহকারী ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে না। এ ধরনের ভেন্ডরদের কাছ থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করা যায় না।

রিহ্যাবের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে রয়েছে পুরাতন গাড়ির মতো পুরনো ফ্ল্যাট কেনা-বেচার সুযোগ দেওয়া। গত নভেম্বর মাসে যৌথ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব দিয়ে রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন বলেছেন, পুরাতন গাড়ি কিনলে ক্রেতাকে নতুন করে কর দিতে হয় না। সামান্য খরচে মালিকানা বদল করা যায়। অথচ পুরনো ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন ফ্ল্যাটের মতো কর দিতে হয়। একই পণ্যের ওপর দুইবার করারোপ, কর আইনের পরিপন্থি। তাই পুরনো ফ্ল্যাট বিক্রির ওপর কর আদায় অযৌক্তিক। কর কমিয়ে ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি বাজার চালু করতে পারলে একদিকে আবাসন খাত যেমন এগিয়ে যাবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

পুরনো ফ্ল্যাট কেনা-বেচার ক্ষেত্রে রিহ্যাবের প্রস্তাব হলো- যে সব ফ্ল্যাট প্রথম বিক্রির পর ৫ বছরের মধ্যে পুনরায় বিক্রি হবে, কেবলমাত্র সে সব ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সাড়ে ৩ শতাংশ হারে করারোপ করা দরকার। এ ব্যাপারেও এনবিআর ইতিবাচক বলে কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের অন্যতম একটি বড় দাবি হলো এ খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক এই তহবিল গঠন করলে ক্রেতারা ফ্ল্যাট কেনার জন্য স্বল্পসুদে ঋণ নিতে পারবেন। গত কয়েক বছর ধরে এ দাবি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ঘুরলেও খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। আবাসন খাতের সংকট দূর করতে গঠিত এনবিআর-রিহ্যাবের কমিটি থেকে এ ধরনের তহবিল গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংককে সুপারিশ করা হবে।

রিহ্যাবের প্রথম সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৮-২০০৯ সালে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য ৯ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা করে একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছিল বাংলাদেশ। পরে ওই তহবিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারি চাকরিজীবীরা ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্যও কম সুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সুবিধা থাকা দরকার। এ জন্যই আমরা ২০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করতে সরকারকে বারবার অনুরোধ করছি। এটি হলে ভাড়ার টাকায় ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবেন ক্রেতারা। এ ছাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ সুদে ৩০ বছর মেয়াদি গৃহঋণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনকে তহবিল দেওয়ার প্রস্তাব করেছে রিহ্যাব।

এছাড়া, নির্মাণ উপকরণ সামগ্রীর দর বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাটের দর বাড়ে। ফ্ল্যাটের দর ক্রেতাদের সীমার কারণে নির্মাণ উপকরণের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা।

উত্তরায় ১৪০ বিঘা জমির ওপর ঢাকার প্রথম মেগা গেটেড কমিউনিটি গড়ে তুলছে রূপায়ণ গ্রুপ। প্রথম ছবিটি রাজউক অনুমোদিত রূপায়ণ সিটি উত্তরার পরিকল্পিত নগরের নকশা। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণকাজ চলছে। দৃশ্যমান হয়ে উঠছে পুরো প্রকল্প। রূপায়ণ সিটি উত্তরায় থাকছে ৬০ শতাংশেরও বেশি খোলা জায়গা নিয়ে বিশ্বমানের ল্যান্ডস্কেপ, সবুজ খেলার মাঠসহ আধুনিক জীবনের সব সুবিধা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত