শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

২০২৯ সালে সংকটে পড়বে ৩ কোটি নগরবাসী

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১৭ পিএম

দ্রুত নগরায়ণের ফলে বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরেই বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার আবাসনের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। আর এ চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ সম্ভব হচ্ছে। বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে শহর এলাকায় আবাসন সুবিধা বাড়ছে না। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শহর অঞ্চলে আবাসিক ইউনিটের ঘাটতি ৮৫ লাখে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করছে সরকার।

সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশের শহর অঞ্চলে জনসংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি। ২০২৯ সালে এ সংখ্যা উন্নীত হবে ৮ কোটি ১০ লাখে। এর ফলে আবাসন সংকটের সম্মুখীন হবে তিন কোটির বেশি নগরবাসী।

মূলত ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্য ও পর্যাপ্ত গৃহঋণ সুবিধা না থাকার কারণেই শহরাঞ্চলে আবাসন সংকট তীব্র হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলের ৮৫ ও শহরাঞ্চলের ৭০ শতাংশ আবাসন গৃহঋণ সুবিধার বাইরে রয়েছে। শহরাঞ্চলে প্রায় ১৭ শতাংশ নিবন্ধন ব্যয়ও আবাসন ঘাটতি বাড়িয়ে তুলছে। নির্মাণ থেকে নিবন্ধন পর্যন্ত ব্যয় বাড়ার ফলে দেশে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় সাধারণ মানুষের বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে। পার্শ^বর্তী দেশ ভারতে আবাসনকে সাধারণের সামর্থ্যরে মধ্যে আনতে পুরো আবাসন খাতকে শতভাগ কর সুবিধা দেওয়া হয়।

বিশ^ব্যাংকের ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নগরীকরণ সবচেয়ে দ্রুত হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশে শহুরে জনসংখ্যার পরিমাণ প্রতিবছর ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ হারে বাড়ছে। এতে শুধু ঢাকা শহরের জন্যই প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার আবাসিক ইউনিটের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলের জন্য বেসরকারিভাবে মাত্র ২৫ হাজার আবাসন ইউনিটের জোগান দেওয়া হচ্ছে। এসব ফ্ল্যাটের অধিকাংশই উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তদের টার্গেট করে নির্মাণ করা হয়। আর ঋণসুবিধা না পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে আবাসনের ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রণয়ন করা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০০১ সালে দেশের নগর অঞ্চলে আবাসন ইউনিটের ঘাটতি ছিল ১১ লাখ ৩০ হাজার। ২০১০ সালে সে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ লাখে। ওই সময় শহর এলাকার প্রতিটি থানায় সদস্যের সংখ্যা ছিল গড়ে ৪ দশমিক ৪১ জন। এ হিসাবে ২০১০ সালে আবাসন সমস্যায় ছিল ২ কোটি ৩ লাখ মানুষ।

পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, বাড়তি মানুষের চাপ মোকাবিলায় আবাসন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ না বাড়লে ২০২১ সাল নাগাদ আবাসন ইউনিটের ঘাটতি ৮৫ লাখে উন্নীত হবে। নগর এলাকায় পরিবারে সদস্যের সংখ্যা ৩ দশমিক ৯৩-এ নেমে এসেছে। এ হিসাবে ২০২১ সালে আবাসন সুবিধার বাইরে থাকবে ৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষ। একই সময়ে শহর এলাকায় জনসংখ্যা ছয় কোটিতে উন্নীত হবে। এ হিসাবে নগর এলাকার অর্ধেকের বেশি মানুষ আবাসন সংকটের সম্মুখীন হবে।

মূলত অর্থায়নে অব্যবস্থাপনার কারণে আবাসন খাতের সংকট কাটছে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।

পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আবাসন খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট দেশজ আয়ের ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। ব্যক্তি খাতে ঋণের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ বিতরণ হয়েছে আবাসন খাতে। এ সময় আবাসন ঋণের বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের (এইচবিএফসি) অংশ ৪৮ থেকে ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৫৬ হাজার ২৯০ কোটি টাকার গৃহঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর। আর ৮ শতাংশ রয়েছে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। এ খাতে খেলাপির পরিমাণ হচ্ছে ৩ দশমিক ১২ শতাংশ।

বিশ^ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে গৃহঋণের পরিমাণ বাড়লেও অন্য দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেক নিচে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় মোট ঋণের ২৯ দশমিক ১৭ শতাংশ হচ্ছে গৃহঋণ। ভুটানে মোট ঋণের ২২ দশমিক ৭ শতাংশ হচ্ছে গৃহঋণ। এছাড়া থাইল্যান্ডে মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৯ ও ভারতে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ হচ্ছে গৃহঋণ। আর বাংলাদেশে মোট ঋণের ৯ দশমিক ১ শতাংশ হচ্ছে গৃহঋণ।

নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আগামীতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হবে বলে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, আবাসন উন্নয়ন ও আবাসন ঋণের নিশ্চয়তা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। আবাসনের চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্য আনতে কার্যকর অর্থায়ন মডেল প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনায়।

ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বড় শহর ও নগরে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিকল্পনা নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত