শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘সোনালি ব্যাগ’-এর অপার সম্ভাবনা

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩১ পিএম

সোনালি আঁশ নামে খ্যাত পাট বাংলাদেশে একসময় প্রচুর পরিমাণে চাষ হতো। একসময় বাংলাদেশে প্রচুর পাটকল গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু বিগত সরকারগুলোর সময় ধীরে ধীরে পাটকলগুলো বন্ধ হতে থাকে। প্রচুর পরিমাণ পাটকল শ্রমিক বেকার হয়ে যায়। বিশেষ করে দেশের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী বন্ধ হওয়ায় এই শিল্পে মন্দাভাব দেখা দেয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। যখন দেশে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে পাটকলগুলো বন্ধ হতে থাকে তখন পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে ওই একই ব্যাংকের পরামর্শে নতুন করে পাটকল খোলা হতে থাকে।

বর্তমান সরকার এবার ক্ষমতায় আসার পর হারিয়ে যাওয়া পাটকে আবার অর্থকরী ফসল হিসেবে চাষের আওতায় আনার জন্য জোরালো ভূমিকা নিয়েছে। পাটের ব্যবহারকে বৃদ্ধি করার জন্য পাট থেকে ব্যাগ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পলিথিনের ব্যাগ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। এটি যেহেতু পচনশীল না, তাই এটি মাটিতে একটি স্তর তৈরি করে। আর দেশের জনগণের মধ্যেও এই ক্ষতিকারক ব্যাগ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। অবশ্য এজন্য তারা দায়ী নয়, কেননা তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাই সরকার এজন্য পাটের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য এই ব্যাগ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস পরিদর্শনকালে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানান যে, প্রাথমিক অবস্থায় সরকারিভাবে এ ব্যাগ বাজারজাত করা হলেও পরবর্তী সময়ে বেসরকারিভাবেও অহরহ এ ব্যাগ তৈরি করা যাবে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে এ ব্যাগ তৈরি করা হয়েছে। দামে সাশ্রয়ী এই ব্যাগের জন্য পাটের ব্যবহার বাড়বে আর কৃষকদের যদি এ জন্য ন্যায্য দাম দেওয়া হয় তাহলে কৃষিতে উল্লেখযোগ্য হারে অগ্রগতি হওয়া সম্ভব।

পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ তৈরির প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় ১২ মে ২০১৭। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) তত্ত্বাবধানে পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ উদ্ভাবিত হয়েছে। উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ পাইলট প্রকল্প পর্যায়ে উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান বিজেএমসি। রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুটমিলে সোনালি ব্যাগ তৈরির প্রাথমিক পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। গত ২ অক্টোবর পাট থেকে সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি কোম্পানির সঙ্গে বিজেএমসির একটি সমোঝতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি এনডিএ স্বাক্ষরিত হয়।

পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ তৈরির উদ্দেশে পাট থেকে সেলুলোজ আহরণ করা হয়। ওই সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে অন্যান্য পরিবেশবান্ধব দ্রব্যাদির মাধ্যমে কম্পোজিট করে এই ব্যাগ তৈরি করা হয়। উৎপাদিত ব্যাগে ৫০ শতাংশের বেশির ভাগ সেলুলোজ বিদ্যমান। তাছাড়া এতে অন্য কোনো প্রকার অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার হয় না বিধায় এটি দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আবিষ্কৃত এই ব্যাগের ভার বহন ক্ষমতা পলিথিনের প্রায় দেড়গুণ এবং এটি পলিথিনের মতোই স্বচ্ছ হওয়ায় খাদ্য দ্রব্যাদি ও গার্মেন্টস শিল্পের প্যাকেজিং হিসেবে ব্যবহারের খুবই উপযোগী। তা ছাড়া দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করায় এই ব্যাগের দাম প্রচলিত পলিথিন ব্যাগের কাছাকাছিই থাকবে। তাছাড়া এই ধরনের প্যাকেজিংয়ের বিদেশেও অত্যন্ত চাহিদা রয়েছে।

বর্তমানে বিজেএমসির উদ্যোগে একটি ম্যানুয়েল পাইলট প্ল্যান্ট দিয়ে ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে বৃহৎ পরিসরে নতুন উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ তৈরিতে দেশে বা বিদেশে কোনো মেশিন তৈরি হয়নি। তাই এ ধরনের মেশিন তৈরির জন্য বিভিন্ন দেশে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে যে মেশিন তৈরি করা হয়েছে তাতে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার পলিব্যাগ উৎপাদন করা সম্ভব হয়। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে আরও একটি মেশিনের মাধ্যমে দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে দৈনিক এক লাখ পলিব্যাগ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করা।

প্লাস্টিক না থাকায় এই ব্যাগ পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। তাই পরিবেশবান্ধব এই ব্যাগকে দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে তা শুধু পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে না, আমাদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। আশা করি, বর্তমান সরকার এই বিষয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে তা আরও সম্প্রসারিত করবে।

লেখক: কুমিল্লায় বসবাসরত সাংবাদিক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত