শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আসল অলরাউন্ডার

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫২ পিএম

বল করার আগ মুহূর্তে বোলিং প্রান্তে দাঁড়িয়ে ইমরান খান যখন তার ঊরুতে বলটিকে ঘষতেন, তখন হায়দরাবাদের অনেক নারীই নাকি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলতেন।হৃৎস্পন্দন থেমে যেত তাদের। আর হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত তার বল মোকাবিলা করার জন্য যে ব্যাটসম্যান দাঁড়িয়ে থাকত তার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলেরও ক্যাপ্টেন ছিলেন এই ইমরান। নিজ দেশের ক্রিকেটেও দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন, জিতেছেন বিশ্বকাপ।বিশ্বজয়ী ইমরান এবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা আর উগ্রতার হাত থেকে তিনি কি পারবেন পাকিস্তানকে মুক্ত করতে? অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, পাকিস্তানের মতো একটি দেশকে আমূল বদলে দেওয়ার শক্তি ধারণ করেন এই নেতা। লায়লা আরজুমান্দ-এর লেখায় জানুন তার সম্পর্কে

ক্রিকেটার ইমরান

১৯৫২ সালের ৫ অক্টোবর লাহোরে জন্ম। পুরো নাম ইমরান খান নিয়াজী। ছোটবেলায় খুব লাজুক প্রকৃতির ছিলেন ইমরান খান। ১৯৬৮ সালে ষোল বছর বয়সে লাহোরের হয়ে সারগোরার বিরুদ্ধে প্রথম ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলেন তিনি। ক্রিকেটের প্রতি ইমরান খানের আগ্রহ এবং লেগে থাকাই তাকে দ্রুত স্থান করে দেয় পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলে। ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক। তার তিন বছর পর একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেন। তার পরে তার  পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন ফাস্ট বোলার ও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। তার গতি আর সুইং প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের কাছে ছিল সাক্ষাৎ ত্রাস। তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। ‘পাকিস্তানের প্রতিভা’, ‘পাকিস্তানের ক্রিকেট জাদুকর’ এমন অনেক বিশেষণ তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ইমরান খানের জাদুকরী নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে পাকিস্তান ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতে। এরপর ক্রিকেটকে বিদায় জানান দীর্ঘদেহী সুদর্শন এই খেলোয়াড়।

হলেন প্রধানমন্ত্রী

ক্রিকেট কিংবদন্তি থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন। ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির মূলোৎপাটনের সেøাগানকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে যাত্রা শুরু করেন ইমরান খান।

১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করেন নিজের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। শুরুতে নাম ছিল জাস্টিস পার্টি।

১৯৯৭ সালে প্রথম নির্বাচনে দুটি আসনে ভোটযুদ্ধে নামেন ও পরাজিতও হন। একটি আসন হলো মিয়ানওয়ালি (আসন নং ৫৩) ও লাহোর (আসন নং ৯৪)।

২০০২ সালের নির্বাচনে ইমরান খান নিজ আসন মিয়ানওয়ালিতে জয়লাভ করেন। জাতীয় পরিষদে তার দায়িত্ব পালন করেছেন নির্দিষ্ট মেয়াদের পুরোটা জুড়েই।

১৯৯৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক পারভেজ মুশাররফের সমালোচনায় মুখর ছিলেন তিনি। তবে প্রথমে তিনি পারভেজ মুশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেন এই আশায় যে, দেশ থেকে দুর্নীতির অবসান ঘটবে।

ইমরান খানকে সে সময় গৃহবন্দি করে রাখেন পারভেজ মুশাররফ। ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বয়কট করেন ২০০৮ এর জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনকে পাতানো নির্বাচন আখ্যায়িত করেন সে সময়।

রাজনীতির মারপ্যাঁচ শুরুর দিকে না বুঝলেও ততদিনে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে ইমরান খানের এক জনসভায়।

image

২০১৩ সালে দেশটির সাধারণ নির্বাচনে নিজ আসনে জয়ের পর সংসদ সদস্য হয়ে রাজনীতিতে নতুন রূপে দেখা যায় ইমরান খানকে। এই নির্বাচনে ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে তার দল আবির্ভূত হয় পাকিস্তানের তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে। তবে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে প্রতিবাদের ডাক দেন ইমরান। মুসলিম লীগের নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের দাবিতে গড়ে তোলেন তীব্র আন্দোলন।

২০১৩ সালে তিনি নির্বাচনী নতুন সেøাগান ধরেন। এর নাম দেন ‘নয়া পাকিস্তান রেভ্যুলুশন’।

২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। যদিও তার এই জয়ের পেছনে সেনাবাহিনীর হাত রয়েছে বলে বিরোধী মহল থেকে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্য

বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে বঞ্চনাই প্রধান কারণ ছিল বলে স্বীকার করে নেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। বাংলাদেশের জন্মের বিষয়ে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে তাদের অধিকার দেওয়া হয়নি, এটাই বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ। গত বছর পাঞ্জাব সরকারের ১০০ দিনের সাফল্য তুলে ধরতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় সেই অনুষ্ঠানেই এসব কথা বলেন ইমরান। যখন প্রাপ্য ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখনই অস্থিরতা আর আন্দোলন দেখা দেয়।

স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের উন্নতির কথাও

একাত্তরে বাংলাদেশে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন চালায় পাকিস্তানি সেনারা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্কিত মন্তব্য করলেও সব খাতে অদম্য গতিতে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের উন্নতির সঙ্গে নিজ দেশের অর্থনীতির তুলনা করতে দেখা যায় তাকে। ডেইলি সানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সেই পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) আজ সবকিছুতেই এগিয়ে গেছে। তাদের দূরদর্শী চিন্তার জন্যই এমনটা হয়েছে।’ ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য কারাভান’-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ২০১২ সালে ইমরান খান বলেছেন, ১৯৭১ সালের ঘটনা থেকে পাকিস্তান কিছুই শিক্ষা নেয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরাধ সংঘটনকারীরা শাস্তি পেলে, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি অন্য রকম হতো। পাকিস্তানের তুলনায় অনেক শান্তি ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে পাকিস্তান দিনকে দিন ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। সে সময় ইমরান খান বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় গুণগত পরিবর্তন আনতেই রাজনীতিতে এসেছেন তিনি।

প্লেবয় ইমেজ ও বিয়ের হ্যাটট্রিক

রাজনৈতিক জীবনের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ তার বিবাহিত-ব্যক্তিগত জীবন। পছন্দ করতেন নারীসঙ্গ ও নাইট ক্লাবে যাতায়াত। ইমরানের বিলাসী জীবনে রয়েছে অসংখ্য নারীঘটিত কেলেঙ্কারি। এজন্য তাকে ‘প্লেবয়’ খেতাবও দিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো। ব্যক্তিগত জীবনে তিনটি বিয়ে করছেন তিনি। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিয়েকে জীবনের সব থেকে বড় ভুল বলে আখ্যাও দিয়েছেন।

১৯৯৫ সালে ইমরান খান বিয়ে করেন ব্রিটিশ ধনকুবের স্যার জেমস গোল্ডস্মিথের মেয়ে জেমিমা গোল্ডস্মিথকে। বিয়ের জন্য ধর্মান্তরিতও হতে হয় জেমিমাকে। তারপর সংসার শুরু করেন পাকিস্তানে। এই দম্পতির দুটি ছেলে রয়েছে, নাম সোলাইমান ও কাসিম। ২০০৪ সালের জুন মাসে তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটে।

এরপর ২০১৫ সালে ৬২ বছর বয়সে আবার বিয়ে করেন ইমরান খান। একসময় বিবিসিতে আবহাওয়ার সংবাদ পড়তেন। এই বিয়েকেই জীবনের সব থেকে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেন ইমরান খান। এরপর আবারও বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ইমরান খান। বুশরা মানেকা ছিলেন ইমরান খানের আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু। বুশরা মানেকার রয়েছে ৫ সন্তান। ইমরান খানের সঙ্গে প্রথম যখন তার পরিচয় হয় তখন পর্যন্ত আগের স্বামীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটেনি।

কেলেঙ্কারি

ক্রিকেটার থেকে এখন পুরোদস্তর রাজনীতিবিদ বনে গেছেন ইমরান খান। কিন্তু তার জীবন বিতর্ক আর কেলেঙ্কারিতে ভরপুর। নারীঘটিত কেলেঙ্কারিই যার মধ্যে বেশি। ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন ইমরান খান। দেখতেও ছিলেন বেশ হ্যান্ডসাম। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদন জানায়, তরুণ বয়সেই পাড়ি দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে। সেখানকার নাইট ক্লাবগুলোতে ছিল তার অবাধ যাতায়াত, লেডি কিলার উপাধিও পেয়েছিলেন তিনি। সেখানকার ট্রাম্প নামে এক ক্লাবে ১৯৮৬ সালে পরিচয় হয় সিতা হোয়াইটের সঙ্গে। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক গড়ায় গভীর প্রণয়ের দিকে। বিয়ে না করলেও সিতার ১৯৯২ সালে কোলজুড়ে আসে এক কন্যাসন্তান। নাম টাইরিয়ান হোয়াইট। যদিও সেই সন্তানকে অস্বীকার করেছিলেন তিনি। পরে ১৯৯৭ সালে আদালতের আদেশে তাকে নিতে হয় পিতৃত্বের দায়িত্ব।

দ্বিতীয় বিয়ে টিকেছিল মাত্র ১০ মাস। এই বিয়ে বিচ্ছেদের পর থেকেই নানা বিস্ফোরক বক্তব্য আসতে থাকে ইমরান খানের বিরুদ্ধে। রেহামের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছিলেন এমন অভিযোগও উঠে আসে। নিজের স্বার্থের জন্য নাকি সবই করতে পারেন ইমরান খান, এমনকি দলের বিভিন্ন নেত্রীর সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কও ছিল। আর তার বদলে তাদের দলে সুবিধা দেওয়া হয় এমন অভিযোগও করেন রেহাম। তার এসব বিস্ফোরক মন্তব্যে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল ইমরান খানকে ঘিরে।

গড়েছেন ক্যান্সার হাসপাতাল

শওকত খানম ছিলেন ইমরান খানের মা। দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। মায়ের এই শোক তাকে অনুপ্রেরণা জোগায় মানবতার সেবায় একটি অত্যাধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুলতে। হাসপাতালের নামও দেন মায়ের নামে ‘শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হসপিটাল এবং গবেষণা কেন্দ্র ।’ ১৯৯৪ সালে লাহোরে গড়ে ওঠা এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৬০০। এই হাসপাতালটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ৭৫ শতাংশ রোগীকে ক্যানসারে বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়। এই হাসপাতালে বেশিরভাগ চিকিৎসা হয় অসহায় দরিদ্রদের।

জনপ্রিয়তা

ইমরান রাজনীতিবিদ হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছেন মূলত তার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে। বারবারই তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে তার সোচ্চার অবস্থানও জনপ্রিয়তার কারণ। প্রথম জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চললেও রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর এসব কিছু ছেড়ে সম্পূর্ণ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার অঙ্গীকার করেন তিনি। তিনি মনে করেন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি যেমন সাফল্য বয়ে এনেছেন, ঠিক তেমনিভাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েও সাফল্য বয়ে আনবেন। তাছাড়া তার ‘নতুন পাকিস্তান’ সেøাগান তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে। এসব কারণে তরুণদের মন দ্রুতই জয় করে নিয়েছেন ইমরান খান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত