বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের পরামর্শ

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:১৬ পিএম

ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট করা প্রয়োজন। খেলাপি কমাতে চাইলে শক্ত পদক্ষেপের পাশাপাশি তাদের আইনিভাবে ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংস্কার করা দরকার। তবে সবই নির্ভর করবে সরকারের মনোভাব ও সিদ্ধান্তের ওপরে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া কঠোরভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে না। গতকাল বুধবার বিকালে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত এক পরামর্শক সভায় তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও আইনজ্ঞরা এসব পরামর্শ তুলে ধরেন।

গতকালের পরামর্শ সভায় বাংলাদেশ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ কমিশনের সব সদস্য ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর এমডিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে এতে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা চলে এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক।

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে এখন মোট খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানা গেছে, সভায় ব্যাংকিং খাতের হয়ে অংশ নেওয়া এমডিরা খেলাপি ঋণ বাড়ার বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরেন। কেন ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না সেটিও তারা জানান। এমডিরা বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় করতে হলে সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন চর্চা রয়েছে। ঋণখেলাপিরা ব্যাংকের দায় পরিশোধ করবেন না, কিন্তু বিলাসী জীবনযাপন করবেন সেটি যাতে না হয়। তাদের পাসপোর্ট নবায়ন আটকে দেওয়া যেতে পারে দেশের বাইরে যাতে ভ্রমণে যেতে না পারেন। এমনকি দেশের ভেতরে প্লেনের টিকিট যাতে কিনতে না পারেন। বৈঠকে আলোচনা হয়, ঋণখেলাপিদের সন্তানদের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আটকে দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া এসব ব্যক্তি যাতে গাড়ি কিনতে না পারেন, বাড়ি কিনতে না পারেন সেটি কীভাবে করা যায়, তা ভাবার সময় এসেছে। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সভায় খেলাপি ঋণ কীভাবে কমানো যায় সেটি উঠে এসেছে। খেলাপি কমাতে বিদ্যমান আইনগুলো যদি সংস্কার ও যুগোপযোগী করার দরকার পড়ে সেটি করা হবে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি এবং ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের কিছু বিষয় সংস্কার দরকার। কারণ অনেকেই ব্যাংকের দায় পরিশোধ না করে আদালতে চলে যাচ্ছেন। সেখান থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, এখানে কোনো পক্ষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানি না হন। তবে ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের ধরা হবে। ইচ্ছেকৃত খেলাপি কীভাবে শনাক্ত করা হবে প্রশ্নে এই কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেন না কিন্তু বিলাসী জীবনযাপন করছেন এরাই ইচ্ছেকৃত খেলাপি। ব্যবসা করেন ভালো কিন্তু ঋণ পরিশোধ করেন না তারা ইচ্ছেকৃত খেলাপি। 

তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকার খেলাপি ঋণ কমাতে চায়। আমরাও তাই চাই। সভায় আমাদের পরামর্শ তুলে ধরেছি। আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইন কমিশন, আইন মন্ত্রণালয়, বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সবাই একসঙ্গে কাজ করা হবে। বৈঠক করা হবে।

তিনি বলেন, টাকা নিলে ফেরত দিতে হবে এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে কীভাবে ঠেকানো যায় সেগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে। তবে বিস্তারিত এখনই বলা যাচ্ছে না। জানা যায়, বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষেও বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে। ঋণ পুনঃতফসিলিকরণসহ মন্দ ঋণ বেচাকেনার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসা হয়। তবে বৈঠকের একটি সূত্র বলছে, খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ, সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে আইন প্রণয়ন করা কঠিন কিছু নয় মর্মে আলোচনা হয়। তবে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ সময় জানান, যত আলোচনাই করা হোক, সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা না থাকলে কার্যকর কিছু করা যাবে না। আইন কমিশনের কথা সরকার আমলে নেবে কি না সেটিও স্পষ্ট নয়।

প্রসঙ্গত এশিয়ায় খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেয় চীন। দেশটিতে খেলাপিদের ওপর উড়োজাহাজ ও উচ্চ গতির ট্রেনের টিকিট ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। করপোরেট সংস্থার নির্বাহী কিংবা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতে পারেন না খেলাপিরা। এমনকি খেলাপিরা ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কোনো হোটেল সুবিধা নিতে পারেন না, রিয়েল এস্টেট ক্রয় করতে পারেন না। চীনের কিছু প্রদেশে খেলাপিদের সামাজিকভাবে ও সর্বজনীনভাবে লজ্জা দেওয়া হয়। মালয়েশিয়াতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি পায় না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত