শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ধান বিক্রি করে খরচও উঠছে না কৃষকের

মাঠের হাসি বাজারে মলিন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:২১ এএম

এবার আমন মৌসুমে দেশজুড়ে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। এতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু ধান বাজারে আসতেই ফসলের মাঠের কৃষকের সেই হাসি মিলিয়ে গেছে। বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে তারা জানিয়েছেন। তারা অভিযোগ করছেন, অধিক মুনাফার আশায় মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা কারসাজি করে দাম কমিয়েছে। আমন মৌসুমে কৃষকের কাছ থেকে সরকার ধান না কেনায় শিগগির এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ দেখছেন না কৃষি কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি চলমান থাকলে কৃষকরা তামাক বা অন্য কোনো ক্ষতিকর ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে পারে বলেও শঙ্কা করছেন কেউ কেউ। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরÑ

সিলেট : বিভাগের চার জেলাতেই আমনের ভালো ফলন হলেও দাম কম। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে গত বছরের তুলনায় বর্তমানে প্রতিমণ আমন গড়ে ১৫০-২০০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। সিলেটের জৈন্তাপুরের কৃষক ফারুক মিয়া জানান, উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভের খাতায় তেমন কিছু থাকছে না। হবিগঞ্জের কৃষক জানু লস্কর বলেন, বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ছে, আর কৃষকের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ধানের দাম কমছে।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, এ বছর সিলেট জেলায় আমন ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ১৪৪ টন। হবিগঞ্জে ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৫০ টন। সুনামগঞ্জে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৬ টন। সিলেট কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আমনের ফলন বেশি হয়েছে। গত মৌসুমে বোরোর ফলনও ভালো হয়েছিল। তাই বাজারে ধান-চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এ কারণে দাম কম।’

কুষ্টিয়া : দেশের সবচেয়ে বড় ধান উৎপাদন ক্ষেত্র কুষ্টিয়া জেলার পোড়াদহ, মশান, মিরপুর, বিত্তিপাড়াসহ সব হাটেই অভিন্ন চিত্র। মোটা ধানের দর মণপ্রতি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে অভিযোগ কৃষকের। পোড়াদহের কৃষক আজিজুল সেখ জানান, প্রতিবছর ধান ওঠার মৌসুমে ন্যায্য দাম পান না কৃষকরা। মিলারদের বেঁধে দেওয়া প্রতিমণ ধান ৬৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অথচ কৃষকের ঘরের ধান শেষ হলেই এর দাম ৮০০ থেকে হাজার টাকা হয়ে যায়।

এ বিষয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম খাজানগরের অটো রাইস মিলার এবং বাংলাদেশ মেজর অটো ও হাস্কিং রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, ‘ধান নিয়ে কৃষকদের তেমন বিপাকে পড়তে হয় না। দামে হয়ত কিছুটা হেরফের হতে পারে, কিন্তু তারা এখন ধান বিক্রি করতে পারছেন। এমনকি বর্ষা মৌসুমের কাঁচা ধান পর্যন্ত আমরা নিয়ে নিচ্ছি। একটা কথা মনে রাখা দরকার, ধান কেনার টাকার জোগানে ব্যবসায়ীদের ব্যাংকসুদের বোঝা বইতে হয়। মিলে ধান সরবরাহ করা মহাজনরা এত টাকা বিনিয়োগ করে কিছু লাভ করতে না পারলে সেই ব্যবসা করবেন কেন?’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক বিভূতিভূষণ সরকার বলেন, ‘প্রতিবারই দেখা যায়, ধান ওঠার মৌসুমে কৃষক ন্যায্য দাম পান না। সে কারণে আমন মৌসুমেও কৃষক যাতে ন্যায্য দাম পায় এবং লোকসানের মুখে না পড়ে সরকারিভাবে সেই উদ্যোগ নেওয়া দরকার। নয়তো কুষ্টিয়ার অনেক কৃষক যেভাবে তামাক চাষে আগ্রহী হয়েছে, তাতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কঠিন হয়ে পড়বে।’

দিনাজপুর : জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, এবার আমন মৌসুমে ধান উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৬ টন। গত মঙ্গলবার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, আমন ধান বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায়। গোপালগঞ্জ বাজারে ধান নিয়ে আসা কৃষক মো. বেলাল হোসেন বলেন, ১৫-২০ দিন আগেও প্রতিমণ ধান ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

খানসামা উপজেলার পাকেরহাট ও ধুকুরঝাড়ী বাজারেরও চিত্রও একই। ধুকুরঝাড়ীর কৃষক মো. সামাদ বলেন, সারা বছর কষ্ট করে আমাদের কোনো লাভই হয় না। জেলা খাদ্য পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমন সংগ্রহ মৌসুমে সরকার কোনো ধান কেনে না।’ জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মিলারদের কাছে ধানের চাহিদা কম ও বাজারে চালের ঘাটতি নেই। তাই বাজারে ধানের দাম কম।’

বগুড়া : দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলায় আমন মৌসুমে মূলত স্বর্ণা জাতের ধান চাষ হয় বেশি। গত রবিবার এখানকার হাটে এই ধান বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৬৬০ থেকে ৬৮০ টাকা দরে। জানুয়ারির মাঝামাঝিও এর দর ছিল ৭০০-৭২০ টাকা। নন্দীগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী নাটোরের সিংড়া উপজেলায় গত সোমবার বিনা-৭ জাতের ধান বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকা মণ, বিআর-৪৯ ও বিআর-৫১ জাতের ধান বিক্রি হয়েছে ৭৭০-৮০০ টাকা মণ এবং সুগন্ধী জাতের বিআর-৩৪ ধান বিক্রি হয় ১৬০০ টাকা মণ।

দুপচাঁচিয়া উপজেলার বিনাহালি গ্রামের কৃষক ফজলুর রহমান বলেন, ‘বাপ-দাদার জমিজিরাত না থাকলে এই আবাদপাতি আর করনোনাহিনি। হামরা কষ্ট করে ধান ফলাই, আর দাও মারে ব্যাপারি-মহাজনরা। সরকার ওরকেরে থ্যাকে চাউল কিনোচে। ক্যা, চাউল-ধান হামাকেরে থ্যাকে কিনলে তো দুডে ট্যাকা হামরা বেশি পানোহিনি। ওরা হামাকেরে ধান কিনে চাউল করে মণে ৩০০ ট্যাকা করে লাভ করোচে, আর হামরা হা-হুতাশ করোচি।’

সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল হক জানান, এবার ১২টি উপজেলা থেকে ৩৯ হাজার ৯৭২ টন চাল কেনা হবে সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে। তা চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জেলার ১ হাজার ৯২৫ জন মিল মালিক (মিলার) প্রতি কেজি চাল ৩৬ টাকা দরে সরকারি খাদ্য গুদামে সরবরাহ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৩৮ হাজার টন চাল মিলাররা সরবরাহ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে চাল কিনলে হয়ত তারা ভালো দাম পেতেন, কিন্তু তাতে সরকারের খরচ বাড়ত। কারণ সংগৃহীত ধান বিতরণের সময় চাল আকারে দিতে হয়।’

পটুয়াখালী : মৌসুমের শুরুতে ধানের বাজার দর ছিল নিম্নমুখী, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দর কিছুটা বাড়লেও এক মাস না যেতেই একই চিত্র। গত মঙ্গলবার কলাপাড়ার বাজারে দেখা যায়, মণপ্রতি ভোজন ধান ৬৫০, মোটা ধান ৬৫০, বহরী ধান ৮০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে। প্রকারভেদে মণপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা দর কমে গেছে। কলাপাড়ার লালুয়ার কৃষক জাকির মাতুব্বর জানান, কম দরে বিক্রি না করায় তার প্রায় ৩০০ মণ ধান বাড়িতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বোরোর মতো আমন ধান সংগ্রহের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি। মাঠ পর্যায়ে আমন ধান সংগ্রহ করলে কৃষক সরাসরি উপকৃত হবে।’ চলতি বছর জেলায় ২ লাখ ১০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত