সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বড় চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:২২ পিএম

আবুল কালাম আব্দুল মোমেন একজন অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সিলেট-১ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৭ সালের ২৩ আগস্ট সিলেটের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে তার জন্ম। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ১৯৪৮ থকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে সিলেট অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন। তার বাবা অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজও সিলেটের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ছিলেন। আব্দুল মোমেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে বিএ এবং ১৯৭১ সালে উন্নয়ন অর্থনীতিতে এমএ অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ পাস করেন। ১৯৭৬ সালে ঢাকার সেন্ট্রাল কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে এলএলবি অর্জন করেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার লেখাপড়া চালিলে যান এবং নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস থেকে ১৯৮৮ সালে অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ড. এ কে আব্দুল মোমেন মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে একসময় সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অধীনে পরিচালিত প্রকল্পে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. মোমেন ১৯৯৮ সাল থেকেই অর্থনৈতিক কূটনীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত। তার বড় ভাই আবুল মাল আব্দুল মুহিত দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি রোহিঙ্গা সংকট এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতির নানা দিক নিয়েও আলাপ করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি উম্মুল ওয়ারা সুইটি।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আপনার কাছে এখন বড় চ্যালঞ্জ কোনটি?

এ কে মোমেন : রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত করা এবং সুশৃঙ্খলভাবে এর সমাধান করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা যতই সমঝোতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান চাইছি তারা সে পথে হাঁটছে না। তারপরও আমাদের সরকারের নীতি এখনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকেই রয়েছে। এ ব্যাপারে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। মিয়ানমারকে হয়তো বা কেউ কেউ গোপনে বুদ্ধি দিচ্ছে। প্রকাশ্যে কোনো দেশই তাদের সমর্থন দিচ্ছে না। মিয়ানমার একা হয়ে পড়বে একসময়। এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা ইস্যুকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি।

দেশ রূপান্তর : প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি হলেও এর সমাধান হচ্ছে না, সরকারের কী পরিকল্পনা রয়েছে?

এ কে মোমেন : আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। সেক্ষেত্রে পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি শক্তিশালী করতে চাই। এই পাবলিক ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে সরকারের পক্ষে একটি প্রেসারগ্রুপ তৈরি হবে। আমাদের দেশে এখনো পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি জনপ্রিয় হয়নি। বিশে^র অনেক দেশেই এই বিষয়টি রয়েছে। তাই আমরা সরকারের উচ্চপর্যারে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি এটাকে প্রমোট করতে চাই। এরই মধ্যে আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। রোহিঙ্গা ইস্যুটি নিয়ে বিভিন্ন দেশে ইভেন্ট হতে পারে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট যারা করে, তারা যেন এই ইস্যুতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তার জন্য লবিং করতে হবে। নিউইয়র্ক, কানাডা, ইউরোপসহ বড় দেশগুলোতে এরকম অনেক গ্রুপ রয়েছে। তারা ইস্যুটি নিয়ে কোনো ক্ষেত্র তৈরি করবে এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমরা অতিথি হয়ে গেলাম। সেখানে আলোচনায় অংশ নিলাম। প্রবাসীরা এ ব্যাপারে আমাদের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতে পারবে। দূতাবাসগুলোকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বলা হবে।

বিভিন্ন অপিনিয়ন বিল্ডার্স থাকে, তারাও সরকারের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কাজ করে। তারা সরকারকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। আমরাও এই পরিবর্তন চাই। এখানে সমাজের অনেক লোককে  সম্পৃক্ত করতে পারব। তাদের বুদ্ধি ও মতামত নিতে পারব। তারাও আমাদের প্রোমোট করতে পারবেন। শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতে নয়, অন্য বিষয়েও এই ডিপ্লোম্যাসি কাজ করবে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বার্থ রয়েছে এমন ইস্যুকে বিশ^ব্যাপী জনপ্রিয় করতে পারি।

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে এই সরকারের পরিকল্পনা কী?

এ কে মোমেন : আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে। এখন আমাদের স্বার্থগুলোর পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। গত ১০ বছরে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ শক্ত হাতে মোকাবিলায় আমাদের অর্জন অনন্য। এটাকে আমরা সামনে আনতে করতে চাই। এটা আমাদের বিদেশনীতির বড় একটি অবজেকটিভ হবে। এখন গ্লোবাল লিডারশিপেও আমরা ভূমিকা রাখতে চাই। বিশেষ করে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা কাজ করব। কারণ এতদিনে বিশে^ এটা প্রমাণিত হয়েছে, আমরা এমন একটি দেশ যারা সব সময়ই শান্তির পক্ষে ছিলাম।

দেশ রূপান্তর : এত অর্জনের পরও কি মনে হয় যে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে পিছিয়ে আছি, কী করা উচিত?

এ কে মোমেন : একটা বিষয় হলো, আমাদের দেশের সব কিছুরই কারেন্ট রিফ্লেক্ট হয় না। আমি কারেক্ট রিফ্লেক্ট চাই। যেমন ধরুন আমাদের দেশের একসময় রিফ্লেক্ট ছিল এমন দারিদ্র্যপীড়িত দেশ। তবে এখন আর সেটা নেই। এখন বলা হচ্ছে, হিউম্যান রাইটস ভায়োলেট হচ্ছে। অথচ সব দেশেই এগুলো হচ্ছে। আমেরিকাতে বছরে ৩৩ হাজার লোক মেরে ফেলে পুলিশ। সেটা কিন্তু ফলাও করে হয় না। তাদের খবর হয়, রিফ্লেক্ট কী হলো? আমাদের এখানে একটা-দুইটা হলেই মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়। কিন্তু এটি মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো সেটির প্রচার খুব কম। তাই গণমাধ্যমের কাছে আমরা এই রিফ্লেকশন চাই।

দেশ রূপান্তর : বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বমুখী নীতি বেশ জোরালো, এর কোনো পরিবর্তন হবে কি? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

এম এ মোমেন : উত্তর-পূর্ব এসব আসলে বিবেচ্য নয়। দেশের স্বার্থে যা করার সেগুলোই করব। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক বাড়ানো। বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের একটি আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। এই আস্থাকে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করব। সরকারপ্রধান এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেকে বেড়েছে এবং তা আরও বাড়বে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এখন বিশ^নেতার স্থান করে নিয়েছেন, এটা সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করব।

গত ১০ বছরে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের স্থিতিশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা বা উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ধারাবাহিক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা জাতি হিসেবে আমাদেরকে অনেক সামনে এগিয়ে দিয়েছে।

হিসাব করে দেখা গেছে, শুধু স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যই আগামী ১৩ বছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ছয় হাজার ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় চার কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার। এত টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? সরকারের কাছে তো এত টাকা নেই। এ কারণে দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। আর বিনিয়োগের জন্য দরকার ব্যাপক অর্থনৈতিক কূটনীতি। অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে সরকার নানাভাবে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এই চেষ্টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। আমরা এই লক্ষ্যে বেশি বিনিয়োগ এবং সঠিক প্রযুুক্তি নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করব। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলব। বাংলাদেশে লাভজনক বিনিয়োগে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হচ্ছে অর্থনৈতিক কূটনীতি।

দেশ রূপান্তর : অর্থনৈতিক কূটনীতিতে কোন কোন দেশকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে পরিকল্পনা করছেন?

এ কে  মোমেন :  উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো বিশেষ করে যাদের বিনিয়োগের সামর্থ্য আছে, তাদের সবার কাছেই আমরা যাব। এখানে আমরা সবার কাছেই তাদের এবং বাংলাদেশের যৌথ অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করব। তাই আলাদা করে কোনো দেশের কথা বলতে পারব না।  পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, সেটা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। এটিই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র। এ নীতি অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক উঁচু মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছেন। যার ফলাফলও চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত