সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জোরদার কূটনীতির বিকল্প নেই

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:২৩ পিএম

বাংলাদেশের উদ্ধাস্তু সংকটে নতুন এক মাত্রা যুক্ত হলো সম্প্রতি। রোহিঙ্গাদের পর এখন মিয়ানমারের আরও কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা অনেককে বিস্মিত করেছে। বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রী প্রাংসা ইউনিয়ন দিয়ে মঙ্গলবার মিয়ানমারের ১৬০ জন নাগরিক বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। রোহিঙ্গাদের বাইরে অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর এই অনুপ্রবেশের ঘটনা এমন সময়ে ঘটল যখন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত অ্যাঞ্জেলিনা জোলি কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করছিলেন এবং সবার মনোযোগই রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিবদ্ধ। অবশ্য এই ঘটনার পরপরই মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাখাইন আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নতুন সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের পর এবার দেশটির চিন রাজ্যের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জাতিসত্তার ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর লোকজন দেশটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। এর অর্থ হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিতাড়নের পর পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্য থেকেও সংখ্যালঘু বিভিন্ন জাতিসত্তার লোকজনকে তাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সীমান্ত এলাকা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং অনুপ্রবেশে চেষ্টাকারী বেশ কিছু লোকজনকে ফেরতও পাঠিয়েছে।

‘মানবতার কারণে বাংলাদেশ অনেকদিন ধরে সীমান্ত খুলে রেখেছে, এখন অন্যরা সীমান্ত খুলে দিক’ বলে নতুন অনুপ্রবেশের ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সময়োপযোগী । ভুলে গেলে চলবে না যে, বাংলাদেশ গত এক বছরেই দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং বিগত এক-দেড় দশকে আশ্রয় নেওয়া আরও বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রতিবেশী দেশ ভুটানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে পুনর্বাসন এবং দেখভালের ব্যাপক কর্মযজ্ঞের দায়ভার এখনো বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া খুবই উদ্বেগের। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয় গত সেপ্টেম্বর মাসে। এ সংকটের অবসান চেয়ে নিরাপত্তা পরিষদ একটি যৌথ বিবৃতিও দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের শীর্ষ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি দলসহ বিভিন্ন দেশ এবং সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে নির্যাতনের বর্ণনা শুনেছেন। গত জুলাই মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও। কিন্তু কোনো কিছুতেই এই সংকট সুরাহার কোনো ইতিবাচক দিশা পাওয়া যাচ্ছে না। শরণার্থী সংকট দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে আছে। পারস্য উপসাগরের যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পশ্চিমা আগ্রাসন, আফগানিস্তান সংকটের পর সিরিয়া, ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী ও শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে সমস্যায় রয়েছে ইউরোপের দেশগুলোও। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কারণে বর্তমান বিশ্বের শরণার্থী সংকটের কেন্দ্রে চলে এসেছে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া। আর বাংলাদেশই হয়ে উঠছে এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের মূল কেন্দ্র। ফলে বিশ্ব পরিস্থিতির বিবেচনাতেও এই সংকট নিয়ে আমাদের অবশ্যই গভীর অভিনিবেশের প্রয়োজন।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং জাতিগত সমস্যার অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দায়ভার বাংলাদেশকে যেভাবে ভারাক্রান্ত করে তুলছে সে বিষয়ে দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের নীরবতা কোনোভাবেই সহায়ক হবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতের নয়াদিল্লিতে যাচ্ছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আলোচনা হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে নয়াদিল্লি এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অবিলম্বে একটা বহুপক্ষীয় সমঝোতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা এখন খুবই জরুরি। মানবতার প্রশ্নে বাংলাদেশ তার ঐতিহাসিক দায় পালন করেছে এবং করছে, এখন প্রয়োজন জোরদার কূটনীতি ও শক্ত অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা। বিশেষত শরণার্থী রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বাস্তব একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের ইতিবাচক ও কার্যকর ভূমিকা তৈরি করতে জোরদার কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত