শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুয়েটের নাটক ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৪ পিএম

ওরিয়ানা ফালাচির উপন্যাস ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন’ সাহিত্য পাঠকদের কাছে ভীষণভাবে সমাদৃত। নাটক হিসেবেও একাধিকবার মঞ্চে এসেছে। সবশেষ ঢাকার মঞ্চে বাকার বকুলের নির্দেশনায় নাটকটি মঞ্চে আনে বুয়েট ড্রামা সোসাইটি। নাট্যরূপ দিয়েছেন শাহেদ ইকবাল। নাটকের শুরুতেই একটু হোঁচট খেতে হলো। ঢাকার মঞ্চে নাটক, শিল্পী-কলাকুশলীরা সবাই বাঙালি, সামনে বসে থাকা দর্শকও বাঙালি। তবে ইংরেজি ভাষায় কেন মঞ্চ উপস্থাপন? নির্দেশকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল- ‘এটি মূলত ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য মঞ্চে আনে বুয়েট ড্রামা সোসাইটি। সেই প্রতিযোগিতার শর্ত অনুযায়ী নাটকটি ইংরেজিতে মঞ্চায়িত হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় নিয়মিত মঞ্চায়ন করলেও নাটকের ডিজাইনে আর কোনো পরিমার্জন করা হয়নি। নাটকটি সবশেষ মঞ্চায়ন দেখার সুযোগ হয় কয়েক মাস আগে সাভারে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আবাসিক ক্যাম্পাসে। সম্ভবত সেই প্রদর্শনীটির পর আর কোনো প্রদর্শনী হয়নি নাটকটির। গল্পটা অনেকেরই জানা অপ্রত্যাশিত ভ্রণের অস্তিত্বে আলোড়িত এক মাতৃসত্তা। ধীরে ধীরে প্রাণের মাঝে আরেক প্রাণের অস্তিত্ব। অনাগত এই প্রাণের বৈধ-অবৈধতার প্রশ্নে সমাজ কাঠামো অসভ্যরূপে দৃশ্যমান। মায়ের উদরে মনুষ্যাকৃতি নিতে থাকা ভ্রণের সঙ্গে কথোপকথন চলে মায়ের। সেই কথোপকথনে দৃশ্যমান হতে থাকে সমাজের ভিন্ন এক রূপ। একাকিত্বের লড়াইয়ে ক্লান্ত হতে হতে উদরশূন্য মায়ের আহাজারি এ নাটকের শেষ পরিণতি। ভিন্ন ভাষার ভিন্ন অঞ্চলের এক মা যেন হয়ে ওঠেন ঢাকাই দর্শকের খুবই আপনজন।

বাকার বকুলের নির্দেশনায় এর আগে ‘বন মানুষ’, ‘মুল্লুক’, ‘ঊর্ণাজাল’ নাটকগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। বকুলের নির্দেশনার আলাদা বিশেষত্বই যেন আঙ্গিক অভিনয়ের যথার্থ ব্যবহার। তবে ‘লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন’ নাটকে বকুল নিজেকে একদমই বদলে নিয়েছেন। শারীরিক কসরতের চেয়ে শারীরিক অভিব্যক্তি ও বাচ্যিক অভিনয়কে প্রাধান্য দিয়ে সংলাপকে রেখেছেন মূল গুরুত্বের জায়গায়। নাটকের গল্পটিকে প্রাধান্য দিয়ে তার সঙ্গে পরিমিত সংগীতের ব্যবহার এবং সরলরেখায় সংলাপের উপস্থাপন নাটকটিকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। মায়ের আহাজারি সংগীতের সুরের সঙ্গে মিশে গিয়ে দর্শকের হৃদয়ে অন্যরকম এক অনুভূতির সঞ্চার করে। সংলাপ আর সংগীতের অপূর্ব সমন্বয় বুয়েটের এই নাটকটিতে দেখা গেল। মঞ্চের পাশেই বাদ্যযন্ত্রীরা সুরের দারুণ কিছু মুহূর্ত সৃষ্টি করলেন, যা মঞ্চের অভিনেতাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে দর্শকের হৃদয়ে ক্ষরণ জাগাল। মায়ের উদরে বেড়ে ওঠা ভ্রণটিকে সারাক্ষণ মঞ্চে বিচরণ করতে দেখাও ছিল ভিন্ন এক চমক। শেষ দৃশ্যে যখন মৃত্যুর আগ মূহূর্তে ভ্রণটি বলে ওঠে ‘ডোন্ট ক্রাই, আই উইল বর্ন এনাদার টাইম’ তখন দর্শকহৃদয়ে ক্ষরণ হয়। সেই ক্ষরণ বিনোদনের অংশ হিসেবে মঞ্চেই থেকে যাবে তার বিপক্ষে নির্দেশক বাকার বকুল। নাটকের ভাঁজপত্রে নির্দেশক লিখেছেন, ‘এমন অন্তর ক্ষরণ পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র কিংবা দেশ কালের ঊর্ধ্বে মানুষই বহন করবে।’ মঞ্চে মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্দেশক দুজন শিল্পীকে কেন ব্যবহার করলেন তার আলাদা কোনো ব্যাখ্যা স্পষ্ট হয়নি। তবে দুজনের অভিনয়ের সমন্বয় ছিল প্রাণবন্ত। নাটকের শেষ সংলাপে যখন মা বলেন, ‘হোয়্যার ইজ মাই বেবি?’ এর সঙ্গে নেপথ্য সংগীতের বেদনার্ত বিলাপ দর্শকের কর্ণকুহরে পৌঁছে গিয়ে সেই ভ্রণটি হয়ে ওঠে নিজেরই অস্তিত্বের অংশ। কানে কানে বাজে‘ডোন্ট ক্রাই, আই উইল বর্ন এনাদার টাইম।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত