মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারত থেকেও আসছে ইয়াবা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:০৮ এএম

ভারত থেকেও আসছে ইয়াবা বড়ি। এগুলোর আকার মিয়ানমারের ইয়াবার তুলনায় বড়। প্যাকেটের গায়ে চীনা হরফের লেখা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ইয়াবা ভারতে তৈরি হতে পারে; আবার অন্য কোনো দেশে উৎপাদন করে ভারতীয় সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাঠানো হতে পারে। এই নিয়ে তদন্ত চলছে। ভারতের নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরোকে (এনসিবি) বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। সরকারিভাবেও তাদের বিষয়টি জানানো হবে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ভারত থেকে ইয়াবা আসা দেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার নাইস ইটভাটার কাছে একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে ১৫শ পিস ইয়াবাসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা  হয়। জিজ্ঞাসাবাদে ওই ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি সীমান্তের ওপার (ভারত) থেকে এসব ইয়াবা নিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে গোদাগাড়ী

থানায় একটি মামলা হয়েছে। গোদাগাড়ী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবা উদ্ধার ও মামলা করার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জব্দ আলামত নিয়ে গেছেন। আসামিকে তারাই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।’ এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি রাজশাহীর দামকুড়া সীমান্তে বাসে তল্লাশি চালিয়ে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ একজন এবং একই এলাকা থেকে গত ২১ জানুয়ারি ৮৩০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ঘটনায় রাজশাহী মহানগরের দামকুড়া থানায় দুটি মামলা হয়েছে। মামলার আসামিরাও জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ইয়াবাগুলো সীমান্তের ওপার থেকে আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে আমরা রাজশাহীতে চারটি ইয়াবার চালান ধরেছি, যা ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এগুলো ভারতে না অন্য কোনো দেশে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়টি তদন্তাধীন আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারত থেকে ইয়াবা আসার ঘটনা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। আমাদের উদ্বেগের বিষয়টি আমরা ভারতের এনসিবিকে লিখিতভাবে জানাব।’ মিয়ানমারের কারবারিরা কৌশল পরিবর্তন করে ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাঠাতে পারে বলেও ধারণা তার। তিনি আরও বলেন, ‘টেকনাফ সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করে ইয়াবা পাচার বাড়িয়েছিল মিয়ানমার। কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর উপকূলীয় এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুল ইয়াবা উদ্ধার করেছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে ৩,০০৬ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া আছে। বাকি ১,০৯০ কিলোমিটারের মধ্যে ৪০৬ কিলোমিটার সীমান্তে ভৌগোলিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিশাল এই সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা চোরাচালান দেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার প্রধান ও অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাতক্ষীরা, যশোর, বেনাপোল, সিলেটসহ ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে আগেও ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু নতুন করে গত দুই সপ্তাহে চারটি চালান আটক হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে। আমরা যতদূর জেনেছি, ভারতীয় সীমান্ত ব্যবহার করে এসব ইয়াবা আনা হয়েছে। তবে সেগুলো কোন দেশে তৈরি হয়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্যাকেটের গায়ে চায়না লেখা মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশলও হতে পারে। ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে যেসব ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে সেগুলো মিয়ানমারের তৈরি ইয়াবার চাইতে আকারে বড়। তবে রং একই। বিষয়টি আমরা ভারতের এনসিবিকে লিখিতভাবে জানাব।’

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় সীমান্ত ব্যবহার করে ইয়াবা আসা একেবারেই নতুন নয়। টেকনাফ সীমান্তে ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ও কড়াকড়ির কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কৌশল পরিবর্তন করছে। তারা মিয়ানমার থেকে উত্তর ও পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তের সেনাপতি চক এলাকায় ৬১ হাজার ৪শ পিস ইয়াবা আটক করে বিজিবি। একই দিন হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ১৪শ পিস ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে আটক হন এক মাদক কারবারি। আইনশৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য মতে, সিলেট বিভাগের চারটি সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ইয়াবা আসছে। জকিগঞ্জ ছাড়াও সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও টেকেরঘাট এবং হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ইয়াবা চোরাচালান হয়। এছাড়া দিনাজপুরের হিলি সীমান্তেও ইয়াবার বড় চালান ধরা পড়েছে।

ভারত থেকে ইয়াবা আসার বিষয়ে বিজিবি মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সিলেট সীমান্ত থেকে ইয়াবার বড় চালান আটক করেছি। মিয়ানমার সীমান্তে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের নজরদারির কারণে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কৌশলে ইয়াবা পাঠিয়ে দিচ্ছে উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে। ওইসব সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে তারা। এসব বিষয়ে বিজিবি সতর্ক আছে।’

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ইয়াবা এমন একটি মাদক যা বহন খুব সহজ এবং নানা কৌশলে পাচার করা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসত, এতেই আমাদের দেশে একরকম বেসামাল অবস্থা। এখন ভারত থেকে আসা শুরু হলে আমাদের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করবে। কারণ বাংলাদেশের তিন দিকে ভারতের সীমান্ত। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত নিñিদ্র পাহারা দিয়ে রাখা অসম্ভব। এসব ইয়াবা যদি ভারতে উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে আরও বড় উদ্বেগের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসা একটি অর্গানাইজড ক্রাইম। এ ধরনের অপরাধের ধরন হলো তারা নানাভাবে কৌশল পরিবর্তন করে থাকে। ভারত থেকে ইয়াবা আসা মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদেরও কৌশল হতে পারে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইয়াবার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে হবে। এর চাহিদা না থাকলে এসব পাচার এমনিতেই কমে যাবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত