শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিশুদের বইয়ের মান নেই, দাম বেশি

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:৪১ এএম

প্রতিদিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই বইপ্রেমীদের ভিড় বাড়তে থাকে মেলার মাঠে। বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে রয়েছে শিশু চত্বর।  শিল্পী সব্যসাচী হাজরা ও মেহেদী হক নান্দনিক করে সাজিয়েছেন এই চত্বরটিকে।  শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বড়দেরও আনাগোনা দেখা যায় এখানে। এই চত্বরে শিশুদের টানতে রয়েছে ‘সিসিমপুর’ নামের একটি মঞ্চও। এখানে হালুম-ইকরি-টুকটুকিদের সঙ্গে বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে ওঠে শিশুরা।

সরেজমিনে শিশু চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, নানা রঙের বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছেন প্রকাশকরা। এতসব বইয়ের ভিড়ে ভালো বইটি খুঁজে পেতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে অভিভাবকদের। ৮ বছরের মেয়ে রাইসাকে নিয়ে রাজধানীর বনানী থেকে মেলায় এসেছে খালেক-মিতু দম্পতি। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু চত্বরে ঘুরে দেখলাম বেশিরভাগ বই একই রকম। ভূত, কমিকস, মজার খেলা, ধাঁধার বই। এসবের ভিড়ে ভালো বই খুঁজে পেতে সমস্যা। আর সব বইয়ে এত রঙিন প্রচ্ছদ করা হয়েছে যে বাচ্চারা রঙিন বই দেখেই কিনতে কান্নাকাটি করছে। কিন্তু সব বই মানসম্পন্ন হয়েছে বলে মনে হয়নি।’ তবে তার কথা মানতে নারাজ ‘বাবুই প্রকাশনী’র কর্ণধার কাদের বাবু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা খুবই সচেতন থাকার চেষ্টা করি। আমাদের পাঁচজনের একটা বিশেষজ্ঞ বোর্ড আছে।  তারা পাণ্ডুলিপি থেকে বই প্রকাশ পর্যন্ত আমাদের নানারকম পরামর্শ দেন। আমরা চেষ্টা করি মানসম্পন্ন বই প্রকাশ করতে।’

শিশু চত্বরের প্রবেশদ্বার পেরুতেই চোখে পড়বে শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা একাডেমির বইয়ের স্টল। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তেমন বৈচিত্র্য নেই বইয়ের তালিকায়। বেশিরভাগই জীবনীগ্রন্থ; অন্য বইয়ের তুলনায় অভিধানের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া সিসিমপুর, প্রগতি পাবলিশার্স, শিলা প্রকাশনী, ঘুড়ি প্রকাশনী, ঘাস ফড়িং, টুইটুম্বুর, ঢাকা কমিক্স, পাতাবাহার, ডাংগুলি, ঝিঙেফুল নামের স্টলগুলো ঘুরে দেখা যায়, নানান নান্দনিক ছবিতে ছাপানো বই। বাহারি রঙের বইয়ের ছবি দেখেই শিশুরা অভিভাবকদের কাছে কেনার বায়না ধরছে। তবে একাধিক স্টলেই পাওয়া গেল মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প, সিনডেরেলা, সুকুমার রায়ের ছড়া, কমিকসের প্রায় একই রকম বই। বাহারি প্রচ্ছদের এসব বইয়ের মান যেমন-তেমন হলেও দাম বেশি বলে অভিযোগ করলেন কয়েকজন অভিভাবক। তবে প্রকাশকদের দাবি, শিশুদের বইয়ের দাম তুলনামূলক কম। মেলায় প্রকাশ হয়েছে সুমন মাহমুদের ছড়ার বই ‘কিলিক কিলিক মেঘের ঝিলিক’। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের বই মানসম্পন্ন হওয়াটা জরুরি। এই বইয়ের মাধ্যমেই শিশুদের মননশীলতার বিকাশ হয়। তাই শিশু চত্বরে স্টল বরাদ্দ এবং কী ধরনের বই বিক্রি হচ্ছে তার যাচাই-বাছাইয়ের দরকার আছে।’

মেলায় সাকিব

গতকাল বিকেল ৩টায় প্রবেশদ্বার খুলতেই বইমেলার মাঠে প্রবেশ করেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। বর্ষাদুপুর থেকে প্রকাশিত ‘চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত বলছি’ সিরিজের নতুন বই ‘নাম্বার ওয়ান সাকিব আল হাসান’র মোড়ক উন্মোচন করতেই মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে এসেছিলেন এই তারকা ক্রিকেটার। এ সময় অটোগ্রাফ ও ফটোগ্রাফ শিকারিদের কবলে পড়েন সাকিব। মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে বলেন, ‘বইমেলায় আসতে ইচ্ছা করে। কিন্তু এখন সেভাবে আসা হয় না। তবে আজকে এখানে এসে আমার ভালো লাগছে।’ ‘নাম্বার ওয়ান সাকিব আল হাসান’ বইটি প্রসঙ্গে চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত বলেন, ‘ছোট্ট ফয়সাল থেকে দেশসেরা ক্রিকেটার হওয়ার গল্পগুলো আমি বইটিতে তুলে ধরেছি।  এতে পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও অন্য খেলোয়াড়রা সাকিবের মূল্যায়ন করেছেন। এ ছাড়া টি-টোয়েন্টিতে সাকিবের অভিষেক, উইজডেনের বর্ষসেরা ক্রিকেটার ইত্যাদি বিষয় বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে।’ বইটির মোড়ক উন্মোচনের পরপরই মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়েন সাকিব।

বাংলা একাডেমির সংবাদ সম্মেলন

গতকাল বিকেলে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে আসেন মেলা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এবারের মেলার প্রথম সপ্তাহেই বই বিক্রি বেড়েছে। প্রথম ছয় দিনে শুধু বাংলা একাডেমির বই বিক্রি হয়েছে ২৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা, যা গতবারের চেয়ে ৭ লাখ টাকা বেশি।’ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘মেলার প্রথম সপ্তাহে বইপ্রেমীরা এসেছেন। এবারের আয়োজন নিয়ে অনেকেই আমাদেরকে তাদের পরামর্শ জানিয়েছেন। কিছু ত্রুটি রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে সবার সহযোগিতায় মেলার আয়োজনটি ভালোভাবে শেষ করতে চাই।’

নতুন বই

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মেলার প্রথম সাত দিনে নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ৮৩২টি। প্রকাশের দিক থেকে এগিয়ে আছে কবিতাগ্রন্থ।  এখন পর্যন্ত এসেছে ২১৪টি কবিতার বই। উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ১৫০টি ও গল্পগ্রন্থ ১২৮টি। এ ছাড়া প্রবন্ধ ৪৭, গবেষণা ১৫, ছড়া ২৪, শিশুসাহিত্য ২৩, জীবনী ২৩, রচনাবলি ৪, মুক্তিযুদ্ধ ৩০, নাটক ৮, বিজ্ঞান ১৭, ভ্রমণ ২৩, ইতিহাস ১৮, রাজনীতি ৬, স্বাস্থ্য ৬, রম্য/ধাঁধা ৮, ধর্মীয় ৪, অনুবাদ ৩, সায়েন্সফিকশন ১৬ এবং অন্যান্য বিষয়ের এসেছে ৬৫টি নতুন বই। 

গতকাল প্রত্যয় প্রকাশন এনেছে সেলিনা হোসেনের গল্পগ্রন্থ ‘গল্পের রংধনু’, কবিতা টাঙ্গন এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতাগ্রন্থ ‘ম্লান, ম্রিয়মাণ নয়’, আর অনন্যা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে মুনতাসীর মামুনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘বঙ্গবন্ধুর জীবন’।  ঐতিহ্য এনেছে নাহিদা নাহিদের গল্পগ্রন্থ ‘পুরুষ পাঠ’, কথাপ্রকাশ এনেছে শামসুজ্জামান খানের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা’, ঐতিহ্য এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘কানার হাটবাজার ও অন্যান্য’, দ্যু প্রকাশনী এনেছে এমএম আকশের রাজনীতিবিষয়ক গ্রন্থ ‘সমাজতন্ত্র : ভাবনা-পুনর্ভাবনা’।

ছুটির দিনে জমবে মেলা

আজ (শুক্রবার) বইমেলার অষ্টম দিন। মেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকছে শিশুপ্রহর। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে মেলার একাডেমি চত্বরে হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এর উদ্বোধন করবেন চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী। বিকেল ৪টায় মেলার মূল মঞ্চে হবে চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেন : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।  এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আবুল মনসুর। রফিকুন নবীর সভাপতিত্বে এতে আলোচনা করবেন মতলুব আলী, সৈয়দ আবুল মকসুদ ও আমীরুল ইসলাম।  সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।  বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও সময় প্রকাশনের কর্ণধার ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘এবারের মেলার উদ্বোধন শুক্রবার হওয়ায় সেদিন ২ ঘণ্টা মেলা খোলা ছিল। তাই প্রথম ছুটির দিন পেতে যাচ্ছি। তার সঙ্গে শনিবার ও পরবর্তীতে সরস্বতী পূজা, পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসও রয়েছে। সব মিলিয়ে এবার মেলার মূল বিক্রি শুরু হবে মূলত অষ্টম দিন থেকে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত