সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জীবনানন্দ দাশ ফিরবেন কোথায়!

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০১ পিএম

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়’। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের এই ধানসিঁড়ি নদীটির অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। ফলে কবি যেখানে, যে ঠিকানায় ফিরবার আকুতি প্রকাশ করে অনবদ্য বাংলার রূপের পরিচয় ব্যক্ত করেছেন কবিতায়, সেই ধানসিঁড়ি না থাকলে, এই বাংলায় কোথায় ফিরবেন তিনি!

ঝালকাঠি সদর থেকে শুরু করে রাজাপুর উপজেলার বাঘরী বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার আঁকা বাঁকা বয়ে চলা ধানসিঁড়ি দিনে দিনে নাব্যতা হারিয়ে ও খননের অভাবে শীর্ণ হয়ে পড়ায় মরা খালে পরিণত হয়েছে।

অবৈধ ভাবে ভূমিদস্যুদের হাতে দখল হয়ে যাওয়া ছাড়াও সময় মতো খনন না করায় পলি পড়ে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে এখন মাত্র চার কিলোমিটার জায়গায় পানি প্রবাহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এক সময়ের এই খরস্রোতা ধানসিঁড়ি নদী। বর্ষা মৌসুমে এই নদীতে কিছুটা প্রাণের সঞ্চার হলেও শীত মৌসুমে জোয়ার ভাটা বন্ধ হয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে রূপসী বাংলার এই নদী। এখনো দূরদূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী ধানসিঁড়ি নদী দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

জিয়াউর রহমান সরকারের সময় খাল কাটা কর্মসূচির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়নি। সড়কপথে যোগাযোগ শুরু হওয়ার আগে জেলা সদরের সঙ্গে রাজাপুর উপজেলার সব ধরনের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই ধানসিঁড়ি নদী। একসময় এই নদী দিয়ে এক্সপ্রেস সার্ভিসের স্টিমার খুলনা হয়ে কলকাতায় যেত। বড় বড় মালবাহী পালতোলা নৌকা এবং সাম্পানও চলাচল করত এই ধানসিঁড়ি নদীতে। দুই যুগ আগেও ধানসিঁড়ি নদী থেকে লঞ্চ ও কার্গো চলাচল করত। রাজাপুর থেকে শুরু করে ঝালকাঠি হয়ে বরিশাল ও ঢাকার সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক রুট হিসেবে এই নদীটির অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই নদী হয়ে ব্যবসায়ীরা সহজেই অল্প সময়ে মালামাল দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় পৌঁছাতেন।

বর্তমানে এই নদীটির বাকি অংশ ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার পাড়েরহাট এলাকা থেকে ভরাট হয়ে কৃষি জমির সঙ্গে মিশে গেছে । নদীর তলদেশে পলি পড়ে ভরাট হয়ে ও দখলদারির ছোবলে ধীরে ধীরে ধানসিঁড়ি এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। শীত মৌসুমে কোন কোন জায়গার পানি পর্যন্ত শুকিয়ে যায় ফলে নৌকাও চলাচল করতে পারে না। যেখানে পানি থাকে সেখানেও কচুরিপানায় ভর্তি হয়ে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। গত পাঁচ বছর আগে এই নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে খনন কাজের জন্য আশি লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। কিন্তু সেই বরাদ্দের টাকায় খালের পাড় পরিষ্কার করা ছাড়া আর কোন কাজ হয়নি। এক সময়ের বিশাল ধানসিঁড়ি নদী এখন মরা খাল হয়ে যাওয়ায় পর্যটকরা এখানে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

ধানসিঁড়ি পাড়ের বাসিন্দা আশি বছরের বৃদ্ধ রতন খলিফা জানান, ছোট বেলায় এই নদীতে আমরা বড় বড় স্টিমার চলতে দেখেছি, এই নদী এত বড় ছিল যে সাঁতার কেটে নদীর ওপারে যাওয়ার সাহস আমরা কখনো করিনি । আর এখন এই নদী দিয়ে ডিঙি নৌকা চলার মতোও অবস্থা নেই।

বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন নদী গবেষক খলিলুর রহমান । তিনি বলেন, ধানসিঁড়ি নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অসংখ্যবার সংবাদ প্রচার ও প্রকাশিত হলেও এই নদীর পূর্বের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই নদীর পূর্বের রূপ ফিরিয়ে আনতে খননের কোন বিকল্প নেই । শুধু নামে মাত্র খনন করলেই হবে না। ভূমি দস্যুদের হাতে দখল হওয়া নদীর সম্পত্তি উদ্ধার ও প্রশস্ত করে খনন করে কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল বরিশাল বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়কারী প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস প্রান্ত জানান, ধানসিঁড়ি নদী রক্ষার জন্য আমরা ইতিমধ্যে একাধিকবার রাজাপুর ও ঝালকাঠিতে মানববন্ধন করেছি। আমরা শিগগির ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব । আমরা চাই আগের মতো ধানসিঁড়ি নদী তার যৌবন ফিরে পাক । ধানসিঁড়ি নদীকে খনন করে পুনরায় এর গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিটি সচেষ্ট রয়েছে ।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন,ডেলটা প্ল্যানের আওতায় ধানসিঁড়ি নদী খননের জন্য ইতিমধ্যেই সবকিছু চূড়ান্ত হয়েছে । আশা করছি কবি জীবনানন্দ দাশের আগামী জন্ম বার্ষিকীতেই আমরা ধানসিঁড়ি নদী খননের কাজ শুরু করব এবং নদীর সেই পুরোনো চিরচেনা রূপ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত