মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিশুর চোখ কেন ট্যাব ও ফোনের স্ক্রিনে

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২৫ পিএম

আজকাল শহরের অনেক শিশুরই নাকের ডগায় ঝুলে থাকে চশমা। মাঝে মাঝে আশ্চর্য হই। এত অল্প বয়সে ওদের চোখে চশমা কেন? উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার এক সদ্য পাস করা ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম। সে জানাল বিস্তারিত। তার বক্তব্য, এখন বাবা-মায়েরা শিশুদের বিবেচনা ছাড়াই নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেন অথবা বিনোদনের জন্য ‘ট্যাব’ কিনে দেন। অবসর কিংবা পড়াশোনার ফাঁকে শিশুরা তাতে নানা ধরনের গেম খেলে। সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে মোবাইল বা ট্যাবের স্ক্রিনের দিকে। ফলে সে দূরের অথবা কাছের বস্তু ঝাপসা দেখে অথবা দেখতে পায় না স্পষ্টভাবে। এই রোগটাকে বলা হয় চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি সমস্যা। এই রোগের কারণে ক্লাসের পেছনে বসলে সামনের বোর্ড স্পষ্ট দেখতে পায় না শিশুরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, দিনের একটা বড় সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হয় শিশুরা। ফোনে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে, গেমস খেলে চোখের পলক না ফেলে বিরামহীনভাবে তাকিয়ে থাকার ফলে এই দৃষ্টি সমস্যা দেখা দেয়।

পত্রিকার নানা প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এক দশক আগেও ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের মধ্যে এমন অবস্থা এই হারে দেখা না গেলেও, বর্তমানে স্মার্টফোন আর ট্যাবের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশুদের এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। আমরা আমাদের শিশুদের ভালোভাবে রাখতে চাই। যেহেতু ভালো রাখতে চাই, তাই স্মার্ট ফোন, ট্যাব থেকে দূরে রাখতে হবে তাদের। যদি বেশি ভালোবেসে, আদর আহলাদ করে তাদের হাতে লাগামহীনভাবে এসব যন্ত্র দিয়ে দেন, তাহলে চোখ নষ্ট হবে আপনার সন্তানেরই। তাই এই বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকা জরুরি বাবা-মা তথা অভিভাবকদের।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিশুদের চোখে অতিরিক্ত স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি বড়দের চোখের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে। কারণ তাদের চোখ এখনো পরিপক্ব হয়ে ওঠেনি। কোমল চোখে স্ক্রিনের আলো পড়লে সেটা সহজেই চোখকে আক্রান্ত করতে পারে।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখে এই সমস্যা বেশি। এর কারণ অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার করা। দীর্ঘ সময় চোখ স্ক্রিনে রাখার ফলে স্ক্রিন থেকে আসা রশ্মি শিশুদের চোখের ক্ষতি করছে এবং চোখ স্থির হয়ে থাকার কারণে চোখ শুকনো হয়ে যায়, ফলে চোখের বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়।

আরেকটি ব্যাপার প্রায়ই লক্ষ করা যায়, সেটা হচ্ছে শিশুরা স্মার্টফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে যায়। তাদের পড়াশোনায় মন বসে না। যখন তখন ট্যাব নিয়ে বসে থাকে। ছোটবেলা থেকে স্মার্টফোন, ট্যাবে ভিডিও গেমসের আসক্তি শিশুদের চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিশুর মন ঠিক রাখতে যদি এসব থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন হয়, তবে দূরেই রাখুন।

শিশুদের যে সময় দূরের দৃষ্টি তৈরি হওয়ার কথা, সে সময়ই তারা মোবাইল ফোনের কিংবা ট্যাবের স্ক্রিনে দৃষ্টিকে আটকে রাখছে। যে কারণে দূরের দৃষ্টি প্রসারিত হতে পারছে না। ফলে তাদের দৃষ্টিশক্তি বাড়ছে না।

গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখের সমস্যাটা বেশি। কেন বেশি সেটা জানার জন্য বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। একটু ভাবলেই তা বোঝা যায়। যেখানে শিশুর দৃষ্টি দিগন্ত বিস্তৃত থাকার কথা, সেখানে আমরা আটকে রাখছি ট্যাবের স্ক্রিনে। তাহলে সমস্যা তো হবেই। এটাই স্বাভাবিক।

এসব বিষয় থেকে উত্তরণের জন্য অবিভাবকদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। শিশু যদি টিভির সামনে গিয়ে টিভি দেখে, ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখে তাহলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। দেরি করা যাবে না। এখন শহরে প্রধান যে সমস্যা, তা হলো শিশুদের খেলার জায়গা নেই। তারা কলোনির রাস্তায় খেলে। আবদ্ধ থাকে চার দেয়ালের মাঝে। ঘরে বসে বসে তারা ট্যাব, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ে।

শিশুদের মাঠের রোদে খেলতে দিন এবং ট্যাব মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। শিশুরা টেকনোলজি অবশ্যই ব্যবহার করবে তবে তা অতিরিক্ত না। এমনভাবে ব্যবহার করবে, যাতে তার কোনো ক্ষতি না হয়। আর তার জন্য সজাগ থাকতে হবে অভিভাবকদের। সন্তান আপনাদের, তাদের কীভাবে তৈরি করবেন সেটা দেখার দায়িত্ব আপনারই।

লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত