রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অনুপযুক্ত যানবাহন তুলে দিন

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:২৮ পিএম

নিবন্ধনহীন ও অনুপযুক্ত যানের অবাধ চলাচল এবং প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সহীন চালকদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীসহ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রাণঘাতী অবস্থায় রয়েছে। এবার বেহাল যানবাহনে বিশৃঙ্খল সড়ক-মহাসড়কের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে খোদ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক প্রতিবেদনে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে করা এক জরিপের ভিত্তিতে বিআরটিএ ওই প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী বাস, ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ৩৩ শতাংশই ‘ফিটনেসহীন’ বা অনুপযুক্ত এবং ৫৬ শতাংশেরই গতিনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ঠিক নেই। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশই ঘটে অনুপযুক্ত যান ও বেপরোয়া চালকদের কারণে। তারা আরও বলছেন, বিআরটিএর জরিপটি ত্রুটিপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ায় ধারণা করা যায় যে, প্রকৃত পরিস্থিতি এরচেয়েও মারাত্মক।

বিআরটিএ সম্প্রতি ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ-গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ-খুলনা-বরিশালে পরিচালিত এক জরিপের ভিত্তিতে আদালতে এই প্রতিবেদন জমা দেয়। কেবল যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ওপর এই জরিপ চালানো হয়। প্রাইভেট কার বা ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট গাড়ি, মাইক্রোবাস, টেম্পো-লেগুনা-নসিমন-করিমনসহ নানা যান যেমন এই জরিপের আওতায় আসেনি, তেমনি যানবাহনের নিবন্ধনের প্রসঙ্গটিও এই জরিপে আসেনি। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স থাকা না থাকার প্রসঙ্গটিও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এই প্রতিবেদনে। বিআরটিএর এরকম জরিপের সময় আগে থেকে পাওয়া খবরের কারণে অনেক যান সড়কে নামে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে এই প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি জরিপটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চালানো হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস বা উপযুক্ততার বিষয়ে প্রথম সমস্যাটি হলো যানবাহন নির্মাণের সময় মান নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকা। বেশিরভাগ ট্রাক এবং বাসই বিদেশ থেকে আমদানি করা ইঞ্জিনের সঙ্গে স্থানীয় কারখানায় তৈরি করা বডি বা কাঠামো সংযোজনের পর সড়কে নামানো হয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ছোট ছোট কারখানায় মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সরকারের কোনো বেঁধে দেওয়া মান বা তা রক্ষায় নজরদারি আছে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এ কারণেই রাজধানীসহ সারা দেশে চলাচলকারী বাস-ট্রাকগুলোর কাঠামোর মধ্যে যেমন কোনো সামঞ্জস্য নেই, তেমনি এসবের কোনো সাধারণ মানও নেই। যানবাহনের নির্মাণ ও কাঠামো সংযোজনের বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হলে ফিটনেস বা উপযুক্ততা ঠিক রাখা সহজ হবে।

একই সঙ্গে এই প্রশ্ন তোলাটা জরুরি যে, ‘অনুপযুক্ত হওয়া’ এবং ‘গতি নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র’ বিকল থাকা সত্ত্বেও এই বিপুলসংখ্যক যান কেন ও কীভাবে সড়কগুলোতে চলতে দেওয়া হচ্ছে? সড়ক থেকে এসব যানবাহন প্রত্যাহার করে নেওয়া বা চলতে না দেওয়ার আইনটি প্রয়োগ করার দায়িত্ব তাহলে কার? বিবেচনায় আনা প্রয়োজন যানবাহন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন  কর্র্তৃপক্ষের লোকবল ও সক্ষমতার বিষয়টিও। সারা দেশে কতজন পরিদর্শক দিয়ে এবং কী পদ্ধতিতে বিআরটিএ এই কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং তা পর্যাপ্ত কি না সে আলোচনাটাও জরুরি। তবে একথা বলা যায় যে, বিআরটিএর জরিপ প্রতিবেদনে যে ৩৩ শতাংশ যানবাহন অনুপযুক্ত বলা হয়েছে, সেসব অবিলম্বে সড়ক থেকে তুলে নিলেও সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে।

প্রাসঙ্গিক কারণেই নগর-মহানগরের সিটি সার্ভিসের পাশাপাশি আন্তঃজেলা বাস-ট্রাক রুটগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী যে পাঁচটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন এখন পর্যন্ত কি সেসবের বাস্তবায়ন হয়েছে? দূরপাল্লার যাত্রায় বিকল্প চালক রাখা, টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি কোনো চালককে গাড়ি চালাতে না দেওয়া, চালক-সহকারীদের জন্য রুটগুলোতে বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা করা, রাস্তা পারাপারের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং চালকদের প্রশিক্ষণের নিশ্চয়তা বিধান করার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় শত-সহস্র মানুষের মৃত্যুর মিছিল রোধ করতে যানবাহনের মান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অবশ্যই আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত