সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ধনী দেশের পরীক্ষার গিনিপিগ দরিদ্ররা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৩৬ পিএম

চীনের এক বিজ্ঞানী গত নভেম্বরে দুটি ভ্রুণের জিন সম্পাদনা করেন। বিজ্ঞানী হি জিয়ানকুইয়ের সম্পাদিত ওই ভ্রুণ থেকে যমজ মেয়েশিশুর জন্ম হয়। চীনের মতো কঠোর নীতিমালার দেশে এমন পরীক্ষা কীভাবে করা হয়েছে, তা নিয়ে বহির্বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার গভীওে গেলে দেখা যায়, আইনকে পাশ কাটিয়ে কঠোর নীতির চর্চাকারী দেশের মধ্যেই নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এ নিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজ্ঞানী ও গবেষকরা মূলত ধনী দেশ হতে (যেখানে আইন খুব কঠোর) আরেক দেশে (যেখানে আইন অনেকটাই শিথিল) নীতিবহির্ভূত গবেষণা চালান। কারণ ওই গবেষণা নিজের দেশে করার অনুমতি না থাকলেও অন্য দেশের আইনের ফাঁক গলে করা যায়। চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে চিন্তার বিষয়; এখানে হুমকির মুখে থাকে প্রাণ, তা মানুষেরও হতে পারে আবার কুকুর-বিড়ালেরও হতে পারে। বিশ্বে এখন সচেতন ও অসচেতনভাবে প্রাণের ওপর অনেক নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। আর এই ভ্রুণ সম্পাদনার ক্ষেত্রে গবেষক হি চীনে বসে পরীক্ষা করলেও তার প্রকল্পটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে করা।

যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রুণ সম্পাদনা করা নিষিদ্ধ। এ ধরনের পরীক্ষা চালাতে গেলে দেশটির খাদ্য ও ওষুধশিল্প প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। আর এমন অনুমতি সহজে মেলে না। অনুমতি ছাড়া কেউ এমন পরীক্ষা করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় বলে জানান স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যা সংক্রান্ত নীতিশাস্ত্রবিদ হ্যাংক গ্রিলি। এমন অপরাধের জন্য এক লাখ ডলার জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ডও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ডিম ছিলেন ড. হির পিএইচডি সুপারভাইজার। জিন সম্পাদনার কাজেও ডিম সহায়তা করেন হিকে। এই দুই গবেষক একত্রে অন্তত আটটি গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন। ‘বার্থ অব টুইনস আফটার জেনোম এডিটিং ফর এইচআইভি রেজিস্ট্যান্স’ শিরোনামের গবেষণাপত্রটি ড. হি ন্যাচার জার্নালে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয়। কারণ জার্নালটি এমন বিতর্কিত বিষয় প্রকাশের সাহস করেনি।

ভ্রুণ সম্পাদনার ক্ষেত্রে এই দুই গবেষক সিআরআইএসপিআর-সিএএস৯ নামের একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এই প্রযুক্তির ফলে জিন থেকে সিসিআর৫ নামের একটি প্রোটিন অক্ষম করে দেওয়া হয়। কোষে প্রবেশের সময় এইচআইভি ভাইরাস নিজে এই প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই বিষয়টি পরীক্ষার জন্য মানবশরীর ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে ড. ডিম কোনো মন্তব্য করেননি। কিন্তু তার আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ড. ডিম ব্যাকটেরিয়ায় সিআরআইএসপিআরের ওপর তাত্ত্বিক জায়গা থেকে কাজ করেছেন অতীতে। তিনি এ নিয়ে নিবন্ধও লিখেছেন। কিন্তু ড. ডিম এই পরীক্ষার কোনো নকশা প্রয়োগ করেননি। তিনি তার তত্ত্বীয় গবেষণা প্রয়োগের অনুমতিও দেননি।’

নিজ দেশে অনুমতি না থাকলেও আমেরিকানদের পক্ষে অন্য দেশে এই পরীক্ষা চালানো ভিন্ন ব্যাপার। এটা যুক্তরাষ্ট্রের আইনে অবৈধ নয়। ড. ডিম যদি ড. হির প্রকল্পে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া কাজ করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। যদিও বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা চালানোর বিষয়ে ‘ট্রাস্ট’ নামে একটি প্রকল্পের অধীনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গোটা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার গবেষকদের ওপর এই কমিটি কাজ করে। এই কমিটি অতীতের কিছু নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষার চিত্রও তুলে ধরে। ট্রাস্ট প্রকল্পের প্রধান ডরিস শেরোডারের মতে, ‘অনেক দেশ নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে জানে না। ফলে ওই দেশগুলোতে এ নিয়ে কোনো আইনও নেই। ওই দেশগুলোতেই মানুষ ও অন্য প্রাণের ওপর পরীক্ষা চালায় ধনী দেশের গবেষকরা।’

চায়নিজ অ্যাকাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সের জীববিদ্যাসংক্রান্ত নীতিশাস্ত্রবিদ ঝাই শিয়াওমেই বলেন, ‘চীনের দুর্বল নীতিজ্ঞানচর্চার সুযোগ নিয়ে উন্নত বিশ্ব থেকে গবেষকরা এখানে এসে অনেক নীতিবহির্ভূত পরীক্ষা চালায়।’ এমন একটি ঘটনা ইতালির নিউরোসার্জন সেগ্রেই কানাভেরার ক্ষেত্রে হয়।

২০১৫ সালে ইতালির তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক জানতেন যে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কোনো দেশে মানবশরীরের ধড়ে মাথা প্রতিস্থাপন করতে পারবেন না। তাই তিনি চীনে চলে যান। সেখানে তিনি হার্বিন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক সার্জন রেন শিয়াওপিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কুকুর, বানর ও মানুষের মরদেহের ওপর পরিকল্পনামাফিক পরীক্ষা চালান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত