মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

১৫ বছরে অন্যরকম রাজা ফেইসবুক

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:০৩ এএম

একটা সময় টেলিভিশনকে বলা হতো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ‘সদস্য’। কর্তা ঘরে ঢুকে আদরের ‘রিমোট কই কই’ বলে করতেন চিৎকার। এখন আর সেটি হয় না। এখন মোবাইলটা হাতে নিয়েই ফেইসবুকে ঢুঁ মারেন। গত ১৫ বছরে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি পৌঁছে গেছে ২৩০ কোটির বেশি মানুষের কাছে। এই যাত্রাটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। মার্ক জাকারবার্গ আর তার প্রতিষ্ঠানের কঠিন সেই যাত্রার কথা লিখেছেন অমৃত মলঙ্গী

 

অন্যদিনের মতো সেদিনও সকাল হয়েছিল। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সাধারণ সেই সকালটা অসাধারণ লাগছিল শুধু হার্ভার্ডের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ের দ্বিতীয় বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে। সেই দলে ছিলেন অ্যাডওয়ার্ডো সেভারিন, ডাস্টিন মস্কোভিজ ও ক্রিস হিউজ। আর ১৯ বছরের একজন মার্ক জাকারবার্গ। দুপুর নাগাদ ক্যাম্পাসের ডরমিটরিতে তারা এমন এক আবিষ্কারের ঘোষণা দিলেন, যা আজ অন্তর্জাল তথা ইন্টারনেট দুনিয়ায় তেজস্বী সম্রাটের মতো একক আধিপত্য বিস্তার করে আছে।

ক্লাসের বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করার জন্য সেদিন বন্ধুদের নিয়ে জাকারবার্গ ‘ঞযবঋধপবনড়ড়শ’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেন। প্রাথমিকভাবে এর সদস্য সংখ্যা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু পরে সেটি বোস্টন শহরের অন্যান্য কলেজ, আইভি লিগ এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। আরও পরে এটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, হাইস্কুল ও ১৩ বছর বা ততোধিক বয়সীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

১৯ বছরের সেই জাকারবার্গ পরে হার্ভার্ড ছেড়ে দিয়ে ফেইসবুককে আরও জনপ্রিয় করতে উঠেপড়ে লাগেন। এখন তার সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন পৃথিবীর জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ! ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্রযুক্তি, যারা ফেইসবুককে টেক্কা দিতে চেয়েছিল, হার মেনেছে অনেক আগেই। শুধু হারই মানেনি, ফেইসবুকের কাছে তাদের মালিকানাই বিক্রি হয়ে গেছে!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রযুক্তিতে ফেইসবুক কিন্তু প্রথম নয়। ফেইসবুক চালুর এক বছর আগেই ‘মাইস্পেস’ নামে একটি মাধ্যম চালু হয়। এটি এখনো সক্রিয় আছে।

ফেইসবুককে এটি আসলেই চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। কারণ ২০০৬ সালে পেজ ভিউয়ের দিক থেকে ইয়াহু ও গুগলকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বৃহত্তম ওয়েবসাইট হিসেবে পরিণত হয় মাইস্পেস। এর আগের বছরে রুপার্ট মারডকের নিউজ করপোরেশন ৫৮ কোটি ডলারে কিনে নেয় মাইস্পেস। ২০০৭ সালে মাইস্পেসের ৩০ কোটি ব্যবহারকারী হয়ে যায়। কিন্তু মালিকানা বদলের পর প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারায়। অন্যদিকে নতুন নতুন সব ফিচার যুক্ত করে ফেইসবুক তাদের ব্যবহারকারী বাড়িয়ে নেয়।

২০১০ সালে মাইস্পেসকে ছাড়িয়ে যায় ফেইসবুক। দুই বছর বাদে পাবলিক লিমিটেড প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পর ফেইসবুকের আরও উন্নতি হয়।

ফেইসবুককে সত্যিকার অর্থে টেক্কা দেয় গুগল। ২০১১ সালে তারা গুগল প্লাস নিয়ে আসে। গুগল তখন ঘোষণা দেয়, ‘গুগল প্লাসই হবে সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।’ প্রথম মাসে ১০ কোটি মানুষ ‘সাইনডআপ’ করে প্রতিষ্ঠানটিকে আশাও দেখায়।

জি-মেইল ব্যবহারকারীদের মধ্য ‘সার্কেল’ গড়ার লক্ষ্যে এবং বন্ধুদের ‘বিকল্প’ কিছু দিতে গুগল প্লাসের যাত্রা শুরু। কিন্তু ব্যবহারকারীরা পরে এটি খুব বেশি ব্যবহার করেনি। তাই ২০১৫ সালের শেষের দিকে নতুন করে এটির নকশা করা হয়।

২০১২ সালে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়িক দিক থেকে হুহু করে লাভবান হতে থাকে। কিন্তু সমস্যাও আসে ডালপালা মেলে!

অ্যাপলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। ফেইসবুকের পাশাপাশি গুগলের সঙ্গেও ঝামেলা হয় আইফোন প্রস্তুতকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের। অ্যাপলের একটি প্রোগ্রামের সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হচ্ছিল ফেইসবুক। অ্যাপল’স ডেভেলপার এন্টারপ্রাইজের সার্টিফিকেট ব্যবহার করে ফেইসবুক তাদের ব্যবহারকারীদের মধ্যে মার্কেট রিসার্চ অ্যাপ সরবরাহ করে। এই অ্যাপ দিয়ে তারা ব্যবহারকারীর ওয়েব কার্যক্রম হাতিয়ে নিচ্ছিল বলে অভিযোগ করে অ্যাপল। পরিস্থিতি ঘোলাটে হয় তখন, যখন গুগল স্বীকার করে তারাও মার্কেট রিসার্চ অ্যাপের জন্য অ্যাপলের এন্টারপ্রাইজ সার্টিফিকেট ব্যবহার করছে।

এন্টারপ্রাইজ সার্টিফিকেট মূলত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল সার্টিফিকেট। এখানে সাইনআপ না করে আইফোনে কোনো অ্যাপ রান করানো যায় না।

অ্যাপল দাবি করে, ফেইসবুক ও গুগল নিয়ম ভঙ্গ করে তাদের প্রোগ্রামের সুবিধা নিয়েছে। কারণ এটি যেকোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের কার্যক্রম নজরে রাখতে ব্যবহার করে থাকে। ফেইসবুক, গুগল তাদের সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর নজরদারি করতে এর ব্যবহার শুরু করে!

এর আগে অনাভো সিকিউরিটি অ্যাপের মাধ্যমে একই কাজ করত ফেইসবুক। বিষয়টি অ্যাপল ধরে ফেলায় হইচই শুরু হয়। পরে অ্যাপটি অ্যাপস্টোর থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ফেইসবুক।

নতুন ঝামেলা শুরু হলে চলতি বছরে জানুয়ারির শেষ দিকে অ্যাপলের তোপের মুখে আইওএস থেকে মার্কেট রিসার্চ অ্যাপও সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়ে ফেইসবুক। ফেইসবুকের নামে এর চেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ ওঠে ২০১৬ সালের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার কাছে গ্রাহকের তথ্য বিক্রি করে তারা। সেই তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্পকে নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করে বলে অভিযোগ। বিষয়টি জানাজানি হলে জাকারবার্গ বিপাকে পড়েন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয়। শুধু তা-ই নয়, গ্রাহকের তথ্যের অপব্যবহার করায় ব্রিটিশ এমপিদের কাছে ব্যাখ্যাও দিতে হয় তাকে।

সম্প্রতি পিউ রিসার্চ জানায়, একজন ব্যবহারকারী কোন কোন পেজে বেশি সময় কাটান, কী বেশি খোঁজেন, তার পছন্দের তালিকায় কী রয়েছে এসব তথ্য ফেইসবুক নিয়মিত সংগ্রহ করে। তারপর সেটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে ফেইসবুকে নিজেদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয় প্রতিষ্ঠানগুলো।

গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য পাচারের অভিযোগ তুলে ওয়াশিংটন ডিসির অ্যাটর্নি জেনারেল কার্ল রেসেইন গত ডিসেম্বরে ফেইসবুকের বিরুদ্ধে মামলাও করেন।

গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ‘গোপনে’ সংগ্রহ করে আয়ের অভিযোগ সম্প্রতি উড়িয়ে দেন জাকারবার্গ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতামত বিভাগে লেখা একটি কলামে তিনি দাবি করেন, ‘ফেইসবুক যা করে তা ব্যবহারকারীর অনুমতি নিয়েই করে।’

জাকারবার্গের এই কথা হয়তো কেউ কেউ বিশ্বাস করেছেন। কেউ কেউ হয়তো করেননি। কিন্তু আজকের দিনে সবাইকে একটা কথা মেনে নিতেই হবে, ফেইসবুক ছাড়া আধুনিক পৃথিবী কঠিন। শুধু কি কঠিন?

না; কঠিনতম!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত