শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বলধা গার্ডেনে পানি দিচ্ছে না ওয়াসা

মরতে বসেছে দেড় শতাধিক দুর্লভ গাছ

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫২ এএম

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বলধা গার্ডেনকে নিয়মিত পানি দিচ্ছে না ওয়াসা। চুক্তি অনুযায়ী দৈনিক ১০ হাজার গ্যালনের জায়গায় পানি আসছিল দুই হাজার গ্যালনেরও কম। গত ছয় মাসে সেই দুই হাজার গ্যালন নেমে এসেছে এক-তৃতীয়াংশে। উদ্যানের একমাত্র জলাধার শঙ্খ নদও পানিশূন্য। সংস্কারের কারণে এক মাস ধরে সেখানেও কোনো পানি নেই। ফলে পানির অভাবে ভীষণ ঝুঁকির মুখে এখন এই প্রাচীন উদ্যানটি।

উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক ও ফরেস্টার অহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শতবর্ষী এই উদ্যানে ৯৫০টি দুর্লভ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিন শতাধিক গাছ খুবই বিরল। এর মধ্যে পানির অভাবে দেড় শতাধিক গাছ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এগুলো ঠিকমতো বাড়ছে না। ফুল, ফল ধরছে না। এভাবে চলতে থাকলে গাছগুলো একসময় মরে যাবে। পানির অভাবে মরতে বসা দুর্লভ গাছগুলো ঘুরে ঘুরে দেখান ১১ বছরের পুরনো বন প্রহরী রেজাউল হক এবং পুরনো দুই মালি দেলোয়ার হোসেন ও রোকন উদ্দিন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাছের প্রধান খাদ্য পানি। অথচ চাহিদার এক ভাগ পানিও পাচ্ছে না উদ্যান। সামনে ফাল্গুন-চৈত্র মাস। পানি না পেলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।

বন প্রহরী ও মালিদের সঙ্গে উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে, অর্কিড বাগানে প্রায় দুই হাজার অর্কিড আছে। অর্কিডে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। পানির অভাবে অনেক গাছ রুগ্্ণ হয়ে পড়েছে। সতেজভাব কমে গেছে। অর্কিডের মধ্যে রানিমুকুট দুর্লভ। দিনে দুবার পানি দিতে হয়। বিদেশি ক্যাকটাসগুলো ধোয়ার দরকার। নতুবা ধুলো জমে গাছগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। মাটি পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পানির অভাবে গুল্মজাতীয় মিনজুরি গাছ শুকিয়ে গেছে।

দেড়শ বছরের পুরনো তিনটি দুর্লভ ভুজপত্র গাছের অবস্থা খুবই করুণ। এই গাছের বাকলে একসময় লিখত মানুষ। সপ্তাহে একদিন পানি দিলেও হয়। গাছের গোড়ার চারপাশ ভেজা রাখতে হয়। গত দুই বছর ধরে তা হচ্ছে না। পানি না পাওয়ায় ছাল ছাড়ছে না বৃক্ষটি। এশিয়ার দুর্লভ কনকসুধা ফুলের গাছে সপ্তাহে দু-তিনবার পানি দিতে হয়। গুল্মজাতীয় গাছ হংস রাজলুপে সুন্দর ফুল হয়। পানি দিতে হয় দিনে দু-তিনবার। ঘৃত কুমারিতে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন পানি লাগে। মালিরা বললেন, পানি না পেয়ে কনকসুধা গাছের বাকল খসে পড়ছে। হংস রাজলুপে ফুল ধরছে না। ঘৃত কুমারীর গায়ে ছোপ ছোপ হলুদ রং দেখা দিয়েছে। গাছগুলো টেকে কি না সন্দেহ তাদের।

টগর, চম্পা, উদয়পদ্ম, এরিকা পাম্পসহ দুর্লভ কিছু ফুল ও ঔষধি গাছ নিয়ে চত্বরটির মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকার কথা। গাছের গায়ে ও পাতায় পানি দিতে হয়। এখন পানির অভাবে মাটিতে ফাটল ধরেছে। ধুলো উড়ছে। পাতা হলুদ বর্ণ নিয়েছে। তিন মাস আগেও ফুল ধরত। এখন ধরছে না।

শঙ্খ নদের সিঁড়ির গোড়ায় দুর্লভ ঔষধি গাছ কাটা সাইকাস। গাছের গোড়ায় গোবর সার দেওয়া হয়েছে। পানির অভাবে সে সার মাটির সঙ্গে মিশছে না। ফুল ফুটছে না গাছটিতে।

তারের বেড়ার ভেতর ক্যামেলিয়া ফুলের হাউসে সাত ধরনের ক্যামেলিয়ার অবস্থাও করুণ। গাছের পাতায় ধুলো জমেছে। মাটিতেও ধুলো। এই সময় ফুল ফোটার কথা। ঠিকমতো ফুল ধরছে না।

শাপলা হাউসে নীল হলুদ গোলাপিসহ সাত-আট ধরনের ১৩০টা শাপলা। চৌবাচ্চাগুলোয় সাত-আট ফুট পানি থাকার কথা। এখন আছে দুই ফুটের মতো। পানি না পেয়ে শাপলাগুলো বাড়ছে না। মাত্র দুটি আফ্রিকান টিউলিপ এখানে। সপ্তাহে সাতদিন পানি দিতে হয়। এখন দুই দিনও পাচ্ছে না। চার মাস ধরে ফুল ফোটা কমে গেছে। ক্যাকটাস গ্যালারির দেড় শতাধিক ক্যাকটাস পানি না পেয়ে ধূসর হয়ে গেছে।

কেন এই সংকটÑ জানতে চাইলে উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক অহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বলধা গার্ডেনের ভেতরে পানির পাম্প স্থাপনের জন্য প্রায় এক হাজার ২০০ বর্গফুট জায়গা দেওয়া হয় ঢাকা ওয়াসাকে। ১৯৮১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিতে শর্ত ছিল, গাছপালার জন্য ওয়াসা প্রতিদিন ১০ হাজার গ্যালন পানি দেবে গার্ডেনে। প্রথম কয়েক বছর ঠিকমতো পানি দিয়েছে। কিন্তু দুই বছর ধরে ঠিকমতো পানি দিচ্ছে না। ১০ হাজার গ্যালনের জায়গায় এতদিন দুই হাজার গ্যালনের মতো পানি দিলেও ছয় মাস ধরে তাও বন্ধ। একাধিকবার চিঠি দিয়ে, ফোন করেও সাড়া মিলছে না। অথচ পানির অভাবে বিরল প্রজাতিসহ নানা জাতের উদ্ভিদ শুকিয়ে যাচ্ছে।

ওয়াসার মডস জোন ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ শিহাবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পানির পাম্প পুরনো হওয়ায় ও দীর্ঘদিন এক জায়গা থেকে পানি তোলার কারণে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। ঠিকমতো পানি উঠছে না। এ কারণে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমরা নতুন পাম্প বসাতে বলধা উদ্যানের কাছে জায়গা চেয়েছি। কিন্তু তারা দিচ্ছে না।

তবে নির্বাহী প্রকৌশলীর এই তথ্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বলধা গার্ডেনের তত্ত্বাবধায়ক অহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পানি ঠিকই উঠছে। সে পানি বিক্রি করে দিচ্ছে। ওয়াসার কর্মকর্তাদের গাফিলতি রয়েছে। তারা ঠিকমতো তদারকি করেন না। এখানে বসেন না। বাইরের লোকজন পাম্প মেশিন চালাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়কের এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। গত মঙ্গল ও বুুধবার সরেজমিনে উদ্যানসংলগ্ন ওয়াসার পাম্পে গিয়ে সেখানে দায়িত্বরত অপারেটর মাসুমকে পাওয়া যায়নি। ওয়াসার কক্ষে বাইরের কয়েকজনকে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। এমনকি পাম্প হাউসের গেটে চা-সিগারেটের দোকান দিয়ে বসেছেন অপারেটর মাসুমের ভাই মামুন। তার কাছেই পাম্পের চাবি। তিনি বলেন, পানি ঠিকই যাচ্ছে। উদ্যানের লোকজন অস্বীকার করছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত