বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তামিম তাণ্ডবে শিরোপা কুমিল্লার

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫৮ এএম

বিপিএলের ফাইনাল কেমন জানা ছিল না তার। প্রথমবারের সেই ফাইনালে খেলতে নেমে যে তাণ্ডব চালালেন তামিম ইকবাল তাতে ঢাকা ডায়নামাইটসের স্বপ্ন স্রেফ খুন হয়ে গেল। মাত্র ৬১ বলে ১৪১ রানের হার না মানা ইনিংসে গতকাল শুক্রবার মিরপুরে উপভোগের পেয়ালা উপচে দিলেন বাঁহাতি ওপেনার। যেন বিপিএলে নিজের প্রথম সেঞ্চুরির জন্য পাঁচটি আসর ধরে তার এমন এক বড় উপলক্ষের অপেক্ষা ছিল। ষষ্ঠ বিপিএলের ফাইনালে ১১ ছক্কা ও ১০ চারের দানবীয় ইনিংসে তামিম চ্যাম্পিয়ন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স জিতল দ্বিতীয় বিপিএল শিরোপা। টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে হৃদয় ভাঙল সাকিব আল হাসানের ঢাকার।

এবারের আসরে নিষ্প্রভ ক্রিস গেইল ফাইনালে ছিলেন না। কিন্তু তামিমের কীর্তিতে উঠে এলেন ক্যারিবিয়ান। গেল আসরের ফাইনালে অপরাজিত ১৪৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। বিপিএল সর্বোচ্চ। ঢাকার ওপর ২০৬ রান চাপিয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রংপুর রাইডার্স।

এবারের ফাইনালে তামিম যেন গেইলের চেয়ে ধ্বংসাত্মক, গেইলের চেয়ে বিস্ফোরক। বাংলাদেশি কোনো ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন নক আগে কেউ দেখেনি কোনোদিন। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ঠাসবুননের গ্যালারি প্রথম ১০ ওভারের পর পুরোটা সময় নাচিয়ে চললেন। বিপিএলের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। যেকোনো বাংলাদেশির জন্য স্বপ্নের, সবচেয়ে বড়। এবারের আসরের ষষ্ঠ শতক। দেশিদের মধ্যে প্রথম। টি-টোয়েন্টিতে তামিমের তৃতীয় এবং অবশ্যই তার সেরা। তার বিস্ফোরণের পর ঢাকা তবু দারুণ জবাবে প্রথম ১০ ওভারে ১১০ তুলেছিল। তারপর আত্মহত্যার মিছিলে নেমে কুমিল্লার কাছে আত্মসমর্পণ করল।

টস হার তো ম্যাচের অর্ধেকটা হার। দ্বিতীয় ওভারে বিপজ্জনক ইভিন লুইস (৬) নেই। এনামুল হক বিজয়ের সঙ্গে ৮৯ রানের জুটির শেষটায় ঢাকার বোলারদের ওপর তামিম ঝড়। এমন সময় তিন বলের ব্যবধানে বিজয় (২৪) ও ইনফর্ম শামসুর রহমানকে (০) বিদায় করে কুমিল্লার ওপর রাজত্ব করার ইচ্ছে জানান সাকিবরা। কিন্তু এটা তামিমের দিন।

যদিও ব্যক্তিগত ২৪ রানে উইকেটের পেছনে একটুর জন্য বেঁচেছেন তামিম। কিন্তু জোড়া ধাক্কায় মনোযোগ হারানোর সমস্যা সামলে প্রবল রোষে ব্যাট চালান। মাহমুদুলের মাথার ওপর দিয়ে নিপুণভাবে বল উড়ে পড়ে বাইরে। তবে ঝড়টা যায় ১৫তম ওভারে রুবেলের ওপর দিয়ে। ২টি করে চার ও ছক্কা হাঁকিয়ে তামিম ঢুকে পড়েন নব্বইয়ের ঘরে। ওই ওভারে ২৩।

১০ ওভারে ১ উইকেটে ৭৩ থেকে ১৫ ওভারে ৩ উইকেটে ১৩৭। তামিম ঝড়ে পাঁচ ওভারে ৬৪। ঢাকা চাপ সামলাতে চায়। কিন্তু ৯৩ থেকে আন্দ্রে রাসেলের মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে ৯৯-এ পৌঁছান তামিম। এক বল পর বাউন্ডারিতে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বাতাসে ওড়েন বাঁহাতি ওপেনার। ৩১ বলে ফিফটি। ৫০ বলে সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের দ্রুততম। ৮ চার ও ৭টি ছক্কা তখন।

রুদ্রমূর্তির তামিম থামেন না। ওই ১৭তম ওভারে ২টি করে চার ও ছক্কা দেওয়ার স্মৃতি রাসেল মনে রাখবেন নির্ঘাত। খরচা ২২। সাকিবের পরের ওভারে ১৭। ইনিংসের শেষ ওভারেও রাসেলকে যেভাবে গ্যালারিতে পাঠান তাতে তামিমের সামর্থ্যরে প্রচণ্ড প্রকাশ। শেষ পাঁচ ওভারে ৬২। দর্শকের পয়সা উসুল এক ইনিংসে! শেষ ১০ ওভারে কুমিল্লার ১২৬-এ তামিম মূল কারিগর। ইমরুলের সঙ্গে ৭.৪ ওভারে পাক্কা ১০০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি তামিমের। অধিনায়কের অবদান যেখানে মাত্র ১৭!

জিততে রেকর্ড করতে হয়। হাল ছাড়ার উপায় নেই। ঢাকার ছুটে দ্বিতীয় বলেই রান আউট সুনিল নারিন (০)। রনি তালুকদার লঙ্কান উপুল থারাঙ্গাকে নিয়ে দাপট দেখান। ছয় ওভারে ১ উইকেটে ৭১। ২৭ বলে ৪৮-এর ঝড় তুলে স্বদেশি থিসারা পেরেরার শিকার থারাঙ্গা। ভাঙে ১০২ রানের জুটি। ২৬ বলে ততক্ষণে ফিফটি রনির। ১০ ওভারে ২ উইকেটে ১১০।

টি-টোয়েন্টির সম্ভাবনা বিচারে তখন শিরোপা ঢাকার জেতার কথা। কিন্তু চিত্র পাল্টাতে থাকে সহসা। অনেকটা দৌড়ে সাকিবের (৩) ক্যাচ দারুণভাবে নেন তামিম। একটু পর বিজয়ের থ্রোতে নন স্ট্রাইকিংয়ে থাকা রনির ৩৮ বলে ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ৬৬ রানের দুর্ধর্ষ ইনিংস শেষ। ভয়ংকর আন্দ্রে রাসেল (৪) সামুরাইয়ের মতো ব্যাট চালিয়ে ক্যাচ দেন। খানিক এগিয়ে কাইরন পোলার্ড (১৩) যে বল তোলেন আকাশে, লং অনে দৌড়ে প্রাণপণ করে ধরেন তামিম।

২ উইকেটে ১২০ থেকে ৬ উইকেটে ১৪১। ২৮ বলে ৫৯ চাই ঢাকার। তাদের অলরাউন্ডার জাদু শেষ। তাহলে? কেউ তখন ভাবে, দারুণ এক অবস্থায় থেকেও একটা দল কীভাবে শিরোপাটা এভাবে হেরে যায়?

১৭ রানের জয় নিশ্চিত হতেই ফাইনাল সেরা তামিমকে সতীর্থ একজন কাঁধে তুলে নেন। ২০১৫-এর চ্যাম্পিয়নরা শিরোপা পুনরুদ্ধার করে মাতে উৎসবে। আর সবকিছু ছাপিয়ে উচ্চারিত হয় একটি নাম ‘তামিম, তামিম।’

সংক্ষিপ্ত স্কোর

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স : ১৯৯/৩ (২০ ওভার) (তামিম ১৪১*, এনামুল ২৪, ইমরুল ১৭*, লুইস ৬; সাকিব ১/৪৫, রুবেল ১/৪৮)।

ঢাকা ডায়নামাইটস : ১৮২/৯ (২০ ওভার) (রনি ৬৬, থারাঙ্গা ৪৮, নুরুল হাসান ১৮, মাহমুদুল ১৫, পোলার্ড ১৩, সাকিব ৩, রাসেল ৪, রুবেল ৫*; ওয়াহাব রিয়াজ ৩/২৮, থিসারা পেরেরা ২/৩৫, সাইফউদ্দিন ২/৩৮)।

ফল : কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ১৭ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা : তামিম ইকবাল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত