মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাদক ব্যবসায়ীদের টার্গেট পুলিশের সোর্স

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:০৫ এএম

প্রতিটি থানা ও গোয়েন্দা ইউনিটে রয়েছে পুলিশের সোর্স। তথ্য সংগ্রহ ও অপরাধী ধরতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে কাজে লাগায় পুলিশ। সোর্সদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অপরাধমূলক কাজের অভিযোগ। আবার সোর্স হিসেবে পুলিশকে সাহায্য করতে গিয়ে অপরাধীদের টার্গেট হয়ে খুন হন তারা। এরপর পুলিশ আর তাদের সোর্স বলে স্বীকার করে না। দেওয়া হয় না কোনো ক্ষতিপূরণ। 

প্রতিটি থানায় একজন ওসির চার থেকে পাঁচজন সোর্স থাকে। কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিটের পক্ষ থেকে আবার পুলিশ সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে মৌখিকভাবে নিয়োগ দেন সোর্সদের। তারা কাজের বিনিময়ে পান ‘সোর্স মানি’। তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এই সোর্সদের জন্য বরাদ্দও থাকে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, কোনো সোর্স খুন হলেই আসে তাদের পরিচয়। এদিকে সোর্সদের ওপর ক্ষুব্ধ থাকে এলাকার মাদক ব্যবসায়ীসহ অপরাধ জগতের গডফাদাররা। তাদের অবৈধ কাজে কোনো ধরনের বাধা তৈরি করলে খুন করতে দ্বিধা করে না। খুন হওয়া পরিবারের খবরও রাখে না পুলিশের কোনো সদস্য।

তিনি আরও জানান, পুলিশের সোর্স নিয়োগের কোনো অফিশিয়াল বৈধতা নেই। তাদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। তাই কোনো সোর্স নিহত হলে তাদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আইনি বিধান নেই।

গত ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে আলমগীর হোসেন (৩০) নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আলমগীর পোশাক ব্যবসায়ী ছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। হত্যাকাণ্ডের মাসখানেক আগে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ডেভিড ও তার কয়েকজন সহযোগীকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় মাদক ব্যবসায়ীরা। তবে পুলিশের দাবি, আলমগীর নিজেই চিহ্নিত সন্ত্রাসী।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানার এসআই শাফিউল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলমগীর ক্রসফায়ারে নিহত হাসানের সহযোগী ছিল। সে অপরাধ জগতেরই লোক। পুলিশের সোর্স ছিল বলে জানা নেই। তবে অন্য এক আলমগীর ডিবির সোর্স ছিল বলে শুনেছি।’

মামলার বাদী নিহতের ভাই ফারুক দেওয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাই খুন হওয়ার পর লোকমুখে শুনেছি সে পুলিশের সোর্স ছিল। তবে আমার ভাই কোনো খারাপ কাজে জড়িত ছিল না। পুলিশ কেন তাকে খারাপ লোক বলছে তা বুঝতে পারছি না। এখনো আমরা আতঙ্কে আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিহত হওয়ার পর পুলিশ কোনো সহায়তা করছে না। পরিবারকে কোনো আর্থিক সহায়তাও দেয়নি।’

এর আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের সোর্স ইফতিখার মুশফিক জয়কে গত বছরের ১২ মার্চ রাতে হত্যা করে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীরা। হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন সায়েদ মুন্না। স্থানীয়রা জানায়, মুন্না সিদ্ধিরগঞ্জের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। মাদক ব্যবসার তথ্য পুলিশকে দেওয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয় বলে ওই সময় তার পরিবার দাবি করে।

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পুলিশের সোর্স আসলাম শিকদার হত্যা মামলার চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা পিবিআই। পূর্বপরিকল্পিতভাবে ২০১৪ সালের ৮ নভেম্বর যাত্রাবাড়ীতে আসলাম শিকদারের শোবার ঘরে ঢুকে তার মাথায় গুলি করে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যায় মাদক ব্যবসায়ীরা জড়িত বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে ভাড়াটিয়া খুনি দিয়ে হত্যা করা হয় আসলামকে। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আবু তাহেরকে ঘটনার চার বছর পর গ্রেপ্তার হয়। আবু তাহের যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী।

মামলার বাদী আসলামের স্ত্রী মোছা. নিলুফা বেগম মারা গেছেন ২০১৭ সালে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (অবসরপ্রাপ্ত) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সোর্স আসলাম হত্যার আসামিরা এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ছিল। মামলার বাদীর মৃত্যু হওয়াতে তদন্তের ক্ষেত্রে পরিবারের কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি।’

২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড় এলাকায় তৎকালীন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন। এ ঘটনায় বাবুল আক্তারের কথিত সোর্স মুসার সম্পৃক্ততার বিষয়ে অভিযোগ ওঠে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন এলাকায় কী হচ্ছে তা তাৎক্ষণিক ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করাই সোর্সদের প্রধান কাজ। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করতেরও সোর্স ব্যবহার করে থাকে পুলিশ। তবে এই সোর্সদের বেশিরভাগই অবৈধ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের সুযোগে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ে তারা। এদের বেশিরভাগই নিজেদের পরিচয় গোপন রাখে নিরাপত্তার স্বার্থে। এদিকে কোনোভাবে যদি এই সোর্সদের পরিচয় জানতে পারে সন্ত্রাসীরা, তাহলে খুনের ঘটনা ঘটে মাঝেমধ্যেই। খুন হওয়া এই সোর্সদের পরিবারকে কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় না।

পুলিশের সোর্স থাকার বিষয়টি স্বীকার করতে চান না অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। একাধিক থানার ওসি সঙ্গে কথা বললে তারা সোর্স থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। বেশিরভাগই দাবি করেন তাদের কোনো সোর্স নেই।

সোর্সের বিষয়ে রাজধানীর ভাটারা থানার ওসি কামারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার থানায় কোনো সোর্স নেই। কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে সোর্স না রাখার বিষয়ে। সাধারণ মানুষই আমাদের সোর্স।’

পুলিশের একটি গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সোর্স দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য নেওয়ার নিয়ম রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। নিয়মিত তথ্যদাতাদের সোর্স মানিও দেওয়া হয়।’

তিনি আরও জানান, ‘অনেক সময় এলাকার দাগি আসামি, মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যেই কেউ-কেউ সোর্স হন। কেননা অপরাধজগতের তথ্য অপরাধীরাই ভালো বলতে পারে। সোর্সরা কোনো বাহিনীর স্বীকৃতি কোনো সদস্য নন। বাহিনীর সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে সোর্স নিয়োগ দিয়ে থাকে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া) সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের কাজকে সহজ করার জন্য সত্যিকারের অপরাধী চিহ্নিত করতে অনেক অফিসার সোর্স ব্যবহার করে থাকেন। এই সোর্সদের সঙ্গে পুলিশের কোনো অফিশিয়াল সম্পৃক্ততা থাকে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত