সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তিনি আমার মনে কথা বলে ওঠেন

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:৪৫ এএম

চালাক ছেলেটি ঢাকা মেডিকেলের সুন্দরী ছাত্রীকে পটিয়ে ফেললো। বিয়েতে এলেন জয়নুল, জসীমউদ্দিন, মুনীর চৌধুরীর মতো মানুষ। পরে সেই লোকটিই হলেন সৈয়দ শামসুল হক। তরুণীটি আনোয়ারা সৈয়দ হক এবারের একুশে পদকজয়ী। দুজনের ভালোবাসা নিয়ে আমিনুর রহমান হৃদয়ের সঙ্গে আলাপে মেতে উঠলেন বিখ্যাত চিকিৎসক। ছবিটি মহুবার রহমানের তোলা

 

সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আনোয়ারা বেগমের পরিচয়?

তার লেখার মাধ্যমে। সৈয়দ হক সে আমলের পত্রিকায় লিখতেন। ‘সচিত্র সন্ধানী’ নামক মাসিক পত্রিকায় হঠাৎ তার একটি লেখা পড়লাম। নাম ‘তিন পয়সার জোছনা’। ছোট্ট উপন্যাস। তখন পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখা যেভাবে পড়তাম, আমাদের উত্তরবঙ্গের লেখকদের লেখা কিন্তু সেভাবে পড়তাম না। তারা ভালো লিখলেও আমাদের অজানাই ছিলেন। জসীমউদ্দিনের মতো দু-চারজন খুব ভালো লেখকের লেখা ছাড়া সেভাবে অন্যদের লেখা আমার বয়সী তরুণরা তখন পড়েনি। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হকের লেখাটি আমার কাছে নতুন ও খুব আধুনিক মনে হলো। তাই দেখা করার আকাক্সক্ষা তৈরি হলো। পড়ার পর চিন্তাও হলো, এই উপন্যাসের লেখকের সঙ্গে দেখা হলে তো ভালোই হয়। আমিও তখন লিখি, পত্রিকায় ছাপা হয়।

প্রথম দেখার কথা মনে আছে?

যাপিত জীবনের এত অস্থিরতা, এত ব্যস্ততা, টানাপড়েনের ভেতরে ওসব কথা কী মনে পড়ে? কখনো হয়তো অবসরে মনে পড়ে, কিন্তু মনে করার সেই সময়টুকুও তো এখন আর নেই। তার পরও স্মৃতি বলে, সামান্য কথাবার্তা হয়েছিল আমাদের। এখন গুলিস্তানের ‘বঙ্গবন্ধু এভিনিউ’র আগে নাম ছিল ‘জিন্নাহ এভিনিউ’। উন্নত এলাকা, সেখানে চুচিং চাও রেস্তোরাঁয় আমরা বসেছিলাম। খাওয়া-দাওয়া হলো। ‘কেমন আছেন’, ‘কবে থেকে লেখালেখি করছেন, কী ধরনের লেখা লেখেন এই জাতীয় সামান্য কথাই আমার মতো নবীন লেখককে তিনি বলেছিলেন। বাড়ির খোঁজও নিয়েছিলেন যশোরে আপনার কে আছেন? আমিও জিজ্ঞেস করেছিলাম কুড়িগ্রামে আপনার কে কে আছেন? এগুলো দৈনন্দিন জীবনের কথামালা।

তবে খেয়াল করে দেখলাম, আমাকে তিনি অনর্গলভাবে তার লেখার ভুবন, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বলে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে তিনি কী করতে চান বলছেন। একজন সুন্দরী তরুণীকে মোহিত করার জন্য যেসব কথা আরেকজন তরুণ বলে, সেগুলোই তিনি আমাকে বলছিলেন। সবই আমি বুঝেছি, কিন্তু বুঝিনি ভাব দেখিয়েছি।

ফিরে এসে কী মনে হলো?

কিছুই মনে হলো না। আমি তো আর তার সঙ্গে প্রেম করতে যাইনি। আলাপ করতে গিয়েছিলাম। তবে তার কথাগুলো ভালো লাগল। আরও খেয়াল করলাম, তিনি একদিনেই আমাকে খুশি করার চেষ্টা করলেন। তবে মনে রইল, খুব রোগা এই তরুণটির চোখগুলো খুব জ্বলজ্বলে।

মানুষটির প্রতি আগ্রহ ছিল?

এই তরুণ লেখকটির প্রতি আগ্রহ ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে ফিরে এসে তার আরও লেখা পেয়ে পড়তে লাগলাম। তিনি কোথায় কী ধরনের লেখা দিচ্ছেন সেসব খোঁজ রাখতাম। রেডিওর টকশোতে অংশ নিতেন, শুনতাম। কোনো সভা-সমাবেশে দেখিনি, বই পড়েই তাকে চিনেছি। পড়ে মনে হয়েছে, তিনি খুব ভালো ও প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। ভবিষ্যতে আরও ভালো লিখবেন।

পরে এই লেখক ও ব্যক্তি সৈয়দ শামসুল হককে কীভাবে চিনলেন?

তার দুটি সত্তাই আমার কাছে এক হয়ে গেল। তিনি তো লেখার মধ্যেই বাঁচতেন, আমিও লেখার মধ্যেই তাকে চিনে নিয়েছি। আজীবন সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন, আজীবন আমি তার লেখাগুলোই দেখেছি। সেগুলোর ভেতর দিয়েই তিনি আমার কাছে একজন পূর্ণ মানুষ হয়েছেন। আর ব্যক্তি মানুষ হিসেবে উদারমনা, চিন্তাশীল, সহানুভূতিপ্রবণ, দয়ালু ও অত্যন্ত সহৃদয় হৃদয়ের ব্যক্তিত্ব হিসেবে দিনে দিনে আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছেন। তিনি খুব দৃঢ় মানসিকতার লেখক। তিনি জানেন কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন ও কেন লিখবেন। লেখার মধ্য দিয়ে কতদূর পর্যন্ত পৌঁছাবেন সেটিও জানেন। লেখার প্রতি শতভাগ সৎ ছিলেন তিনি। কোনো দিন লেখালেখির বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করেননি। ব্যক্তিগত জীবনেও লেখার জন্য কোনো ছাড় তিনি দেননি। সে জন্য যখন যা করা প্রয়োজন করেছেন। আমিও তা করতে তাকে অনুমতি দিয়েছি, সমর্থন করেছি। প্রতিভাবান কোনো মানুষের সঙ্গে বসবাস তো চাট্টিখানি কথা নয়, তাদের যেমন অনেক গুণ থাকে, তেমনি দোষও অনেক। সব মেনে নিয়ে তাকে তার ভুবনে বাঁচতে দিতে হয়।

দুজনের প্রেম?

রেস্টুরেন্টে দেখা করে হলে ফেরার পর কয়েক দিন পর দেখি, আমার নামে খাম এসেছে। তিনি আমাকে উদ্দেশ করে কবিতা লিখে পাঠিয়েছেন। আমিও সেটি পড়ে উত্তর করলাম। আলাপ এভাবেই জমল। এরপর স্বাভাবিকভাবেই জীবনের প্রশ্নে, ভালোবাসার দাম দিতে গিয়ে দুজনের সমঝোতা হলো। এই শুরু হলো প্রেম। হওয়ার কথা ছিল, হয়েই গেল। লেখার মাধ্যমেই সৈয়দ হককে ভালোবাসলাম। সে জন্য তার লেখাপড়া, চেহারা, টাকা-পয়সা কোনো কিছুই আমার কাছে গণ্য হয়নি। মানুষটি তখন ছিল কেবল, সেটিই আগে আমার কাছে এলো।

ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়ার গল্প?

বেড়ানোর জায়গা ছিল, আবার ছিলও না। ঢাকার রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকাতে বেড়াতাম আমরা। বিশ্ববিদ্যালয় তখন ইউক্যালিপটাস গাছে ভর্তি ছিল। আমাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে বিরাট এক চত্বর ছিল, চারপাশ খোলামেলা ছিল। খেলার মাঠও ছিল। একদিকে কার্জন হল, অন্যদিকে রমনা ছিল আমাদের প্রেম করার মূল স্থান। কিন্তু সেসব তো এখন আর নেই, বিলীন হয়েছে। বাঙালির মনে থাকলেও অন্য কোথাও রোমান্টিকতা নেই। আমরা সেসব স্থানকে ছোট করতে করতে কাছিমের মতো ছোট্ট করে ফেলেছি। গল্প করতে বসে সেই আমলের তরুণ-তরুণীদের প্রধান খাদ্য বাদামই আমরা খেতাম।

বন্ধুরা আপনাদের নিয়ে কী বললেন?

নিজেরা একটিও প্রেম করতে পারেনি; সেখানে আমি প্রেম করতাম বলে তারা খুশি মনেই আমাকে সমর্থন জোগাত। সৈয়দ হকও খুব চালাক ছিলেন। তাদের খুশি করতে ভালো ভালো খাবার পাঠাতেন। সিনেমায় চিত্রনাট্য লিখে তো তখন তার অনেক রোজগার। গাড়িও ছিল। সেটি আমাদের ঘোরার জন্য দিয়েও দিতেন। তার সঙ্গে দেখা শেষে বাক্স বাক্স খাবার নিয়ে হোস্টেলে ফিরতাম। বন্ধুদের বলতাম, এই নাও খাবার।

আপনাকে কেন তার ভালো লাগত? আর আপনার?

তিনি আমার সাহসের খুব প্রশংসা করতেন, কিন্তু খুব রাগী এ কথাও বলতে ভুল করতেন না। পরে সেটিই সত্য হলো। মা-বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কোনোভাবেই মেনে নেবেন না, সেই অবস্থায় লেখাপড়াটুকুও শেষ করতে পারিনি, আহামরি সুন্দর নয়, সেই ছেলেটিকে বিয়ে করেছি! তার যে এত প্রতিভা আছে, সেটি তো আর মা-বাবার জানা ছিল না! তিনি তো আমার তুলনায় তখন কিছুই নন। তবে মায়ের ভরসায় এগিয়েছি। মা বিশ^াস করতেন, আমি কোনো ভুল করতে পারি না। তিনিই বাবাকে বোঝালেন ও রাজি করালেন। ফলে বিয়ে হলো আমাদের। এই মানুষটির সবকিছু আমার ভালো লাগত। তার হাঁটা, কথা বলা, ছেলেমানুষি সবই খুব ভালো লাগত। গোপনে গোপনে তাকে এভাবে চলতে উৎসাহিতও করতাম। জীবনে তার কোনো কিছুতেই কোনো বাধা দিইনি। কারণ মানুষটির প্রতিভা সম্পর্কে শুরু থেকেই খুব সচেতন ছিলাম। জানতাম, সংসার, সমাজ ও পরিবার বাধা দিলে প্রতিভার বিকাশ ঘটে না। তবে এতটুকু বিশ্বাস ছিল, কোনো দিন তিনি আমাকে কোথাও অপমান করবেন না। করেননি।

বিয়ে হলো কবে?

১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর। আমার বাবা-মায়ের সম্মতিতেই বিয়ে হলো। তার বাবা তো আগেই মারা গেছেন। তিনি নানা জায়গা থেকে পয়সা জোগাড় করে আমায় গা গহনায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কপালের টায়রা থেকে শুরু করে পায়ের নখ পর্যন্ত স্বর্ণ দিয়ে সাজিয়ে ছিলেন। মা-বাবাও দেখলেন, ছেলেটি যথেষ্ট সম্মান দিয়ে তাদের মেয়েকে নিয়ে গেছে। তখনকার দিনেই ১৫ হাজার টাকা দেনমোহরে আমার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পোশাক ছিল অন্যদের মতোই। অনুষ্ঠান হয়েছিল ঢাকার বিখ্যাত লেডিস ক্লাবে। বিয়েতে মুনীর চৌধুরী ভাই, জয়নুল আবেদিন ভাই, জসীমউদ্দিন ভাই, শামসুর রাহমান ভাইসহ বড় লেখক, শিল্পীরা গিয়েছিলেন।

সৈয়দ হক আপনার জীবনে অভিশাপ না আশীর্বাদ?

মেয়েরা স্বামীকে সব সময় আশীর্বাদই ভাবে, চায়ও। তবে কোনো দিন স্বামীর প্রতি নির্ভরশীল থাকিনি। কারও ওপরই আর্থিকভাবে নির্ভরশীল কোনো দিন ছিলাম না। নিজেকে মেয়ে ভাবতেও পারিনি কোনো দিন। মানুষ মনে করেছি। তবে স্বামী স্বামীই। প্রতিটি মেয়ের জীবনেই তার বিশাল ভূমিকা থাকে। নিজেকে সৌভাগ্যবান বলব, তিনি কোনো দিন আমার কোনো স্বপ্নপূরণে না করেননি। এর চেয়ে বেশি কী চাওয়ার ছিল তার কাছে?

আনোয়ারা সৈয়দ হকের লেখক সত্তায় সৈয়দ শামসুল হকের ভূমিকা?

১৩-১৪ বছর বয়স থেকে লিখি, বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়। ভালো লেখার জন্য পুরস্কারও পেয়েছি। তার লেখা আমার লেখার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ হলেও আমাদের লেখার ধরন পুরোপুরি আলাদা। আমি তার মতো করে কোনো দিন লিখতে চাইনি, লিখিওনি।

তার জীবনে আপনার প্রভাব?

অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলেও তিনি সৈয়দ শামসুল হকই হতেন। আসল কথা হলো, পথ কেটে প্রতিভা কতটুকু এগোতে পারল? সেখানে তাকে কতটুকু সাহায্য করেছি সেটি বড় কথা নয়। তবে আমি তার সংসার, তার দেখাশোনা সবই করেছি। আমরা বন্ধুর মতো ছিলাম এটিই জীবনের প্রাপ্তি।

তাকে ছাড়া কীভাবে আছেন?

আমি তাকে ছাড়া মোটেও নেই। যেখানেই যাই, যেকোনো বইয়ের দোকান, লাইব্রেরিতে গেলে দেখি, তার লেখা বইগুলো আছে। কোথাও না কোথাও তার লেখা পাঠ সব সময় হয়। খবরের কাগজগুলোও ছাপে। ফলে তাকে নিয়েই তো আমার সর্বক্ষণ বসবাস।

কোনো অসুবিধা?

একমাত্র অসুবিধা রাতে এক বিছানায় তাকে পাই না। তবে তখনো আপন মনে তার সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমার মনে কথা বলে ওঠেন। আমরা আমাদের মধ্যেই আছি। জীবন সঙ্গীকে হারানোর দুঃখ তো মৃত্যু পর্যন্ত সারাক্ষণ বয়ে বেড়াতে হবে।          

(৬ ফেব্রুয়ারি, গুলশান, ঢাকা)

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত